যেভাবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ধুলো দিতো গাড়ি চুরির চক্রটি

বিভিন্ন জায়গা থেকে গাড়ি চুরি বা ছিনতাই করে সেগুলোতে পুরনো গাড়ির নম্বর ও চেসিস নম্বর ব্যবহার করে বিক্রি করে আসছিল একটি চক্র। সেই চক্রের ছয় সদস্যকে গ্রেফতার করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) মিরপুর গোয়েন্দা বিভাগ। শনিবার (৫ জুন) দুপুরে ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলন তাদের বিষয়ে বিস্তারিত জানান অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) এ কে এম হাফিজ আক্তার।

গ্রেফতারকৃতরা হলেন - মীর মিজান মিয়া, মো. হাবিব মিয়া, মো. ফারুক, মো. কামাল মিয়া, আল আমিন এবং মোবারক। শুক্রবার (৪ জুন) নরসিংদী ও কুমিল্লার বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেফতার করা হয়। এসময় তাদের কাছ থেকে একটি মাইক্রোবাস উদ্ধার করা হয়।

অতিরিক্ত কমিশনার হাফিজ আক্তার জানান, গেল এপ্রিলে রাজধানীর উত্তরা পূর্ব থানা এলাকায় একটি গাড়ি ছিনতাইয়ের ঘটনায় এই ছয়জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গ্রেফতারকৃতদের উত্তরা পূর্ব থানার মামলায় আদালতে পাঠানো করা হয়েছে।

ওই মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, গত ২২ এপ্রিল এক ব্যক্তি তার বিদেশ ফেরত আত্মীয়কে ঢাকা বিমানবন্দর থেকে নিয়ে যাওয়ার জন্য কিশোরগঞ্জ থেকে একটি মাইক্রোবাস নিয়ে ঢাকায় রওনা দেন। পথিমধ্যে মাইক্রোবাসের চালক মো. আবুল বাশার করিমগঞ্জ এলাকা থেকে আরো চার জন লোককে মাইক্রোবাসে তোলেন। মাইক্রোবাসটি ঢাকার আব্দুল্লাহপুরে পৌঁছালে যাত্রীবেশে অপরাধীরা মাইক্রোবাসটি ছিনতাই করে নিয়ে যায়। এ ঘটনায় মাইক্রোবাসের মালিক মো. আজহারুল ইসলামের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৭ এপ্রিল উত্তরা পূর্ব থানায় মামলাটি রুজু হয়।

সংবাদ সম্মেলনে অতিরিক্ত কমিশনার জানান, আত্মীয়কে নিতে আসা ওই লোকই হলেন হাবিব। তিনিই মূলত করিমগঞ্জ থানা এলাকা থেকে যাত্রীবেশে চারজন লোককে মাইক্রোবাসে তোলেন। তাদের বহনকৃত মাইক্রোবাসটি ঢাকার আব্দুল্লাহপুরে আসলে গ্রেফতারকৃতরা লুঙ্গি, গামছা ও দড়ি দিয়ে মাইক্রোবাস চালক মো. আবুল বাশারের হাত-পা বেঁধে ফেলে মাইক্রোবাসের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেন।

তিনি বলেন, গ্রেফতারকৃত ফারুক মাইক্রোবাসটি চালিয়ে নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জ থানার গাউছিয়া দরিকান্দী রোডে নিয়ে মাইক্রোবাসের চালককে চলন্ত গাড়ি থেকে ফেলে দেন। পরবর্তী সময়ে গ্রেফতারকৃত হাবিব গাড়িটি চালিয়ে কুমিল্লা জেলার চান্দিনা বাসস্ট্যান্ড এলাকায় নিয়ে যান। মাইক্রোবাসটি গ্রেফতারকৃত মিজানের কাছে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকায় বিক্রি করেন। গ্রেফতারকৃত মিজান ভুয়া নম্বর প্লেট ও কাগজপত্র সংগ্রহ করে কুমিল্লা জেলার দেবিদ্বার থানার বিভিন্ন এলাকায় ভাড়ার বিনিময়ে গাড়িটি চালাতেন।

ছিনতাইকারী চক্রের গ্রেফতারকৃত ছয় সদস্য

এই চক্রটি প্রায়শই গাড়ি চুরি কিংবা ছিনতাই করে পুরনো গাড়ির রেজিস্ট্রেশন নম্বর ব্লু-বুক ও চেসিস নম্বর ব্যবহার করতো। তবে তারা ইঞ্জিনের নম্বর পরিবর্তন করতে পারে না বলে জানান অতিরিক্ত কমিশনার। সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, গ্রেফতারকৃত মিজান মিয়া গাড়ির নম্বর প্লেট ও চেসিস নম্বর পরিবর্তনের কাজটি করতো। তিনি বিভিন্ন পুরনো গাড়ি থেকে ব্লু বুক ও চেসিস নম্বর সংগ্রহ করতেন। এ ছাড়া গ্রেফতারকৃত আসামিদের মধ্যে, হাবিব মিয়া এরই মধ্যে গাড়ি চুরি ও ছিনতাইয়ের অভিযোগে গ্রেফতার হয়ে কারাগারে ছিলেন। তিনি জামিনে বের হয়ে আবার একই ধরনের কাজে লিপ্ত হয়েছেন। কী কারণে তারা বার বার একই ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন, এ বিষয়টি আমরা খতিয়ে দেখছি। তাদের বিরুদ্ধে এ অভিযোগের সত্যতা পেলে আমরা জামিন বাতিলের আবেদন করব। আমরা আরও বেশ কিছু বিষয় মাথায় রেখে তাদের রিমান্ডে এনে আরো জিজ্ঞাসাবাদ করবো, তারা আর কী ধরনের অপরাধের সাথে তারা জড়িত সে বিষয়টি খতিয়ে দেখছি।

পুরনো গাড়ি কেনার সময় সতর্ক থাকার পরামর্শ
ক্রেতা কিংবা বিক্রেতাকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়ে ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার হাফিজ আক্তার বলেন, পুরাতন গাড়ি কিনতে গেলে গাড়ির রঙ, ধরন, নম্বর প্লেট- সবকিছুই বিআরটিএ থেকে চেক করে নিতে হবে। সব ঠিকঠাক থাকলে তবে গাড়ি কিনুন। না হলে যে কোন ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিতে পড়তে পারেন আপনি। গাড়ি কেনার আগের অপরাধের দায়ে আপনাকেও আইনের আওতায় আনা হতে পারে।

অন্যের নামের সিম ব্যবহার করতো চক্রটি
এই চক্রটি অন্যের নামে নিবন্ধিত সিম ব্যবহার করতো বলে জানান হাফিজ আক্তার। মূলত তারা গ্রামগঞ্জ থেকে অন্যের ব্যবহৃত সিম সংগ্রহ করতো। যেহেতু অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর মোবাইল নম্বর ট্র্যাকিং করে অপরাধী শনাক্ত করা হয়, এ বিষয়টিকে এড়ানোর জন্য তারা অন্যের সিম ব্যবহার করতো। সেকারণে নিজের নামের নিবন্ধনকৃত সিম অন্যকে ব্যবহারের সুযোগ না দেয়ারও আহ্বান জানান এই পুলিশ কর্মকর্তা। কেউ সিম নিয়ে অপরাধ করলে তার দায়ভার কিন্তু রেজিস্ট্রেশনে থাকা ব্যক্তির উপরই বর্তাবে বলেও সতর্ক করেন তিনি।