পরিবারের অভিযোগ

কিশোরকে গাড়ির নিচে ফেলে হত্যার পর উল্টো ছিনতাই মামলা

রাজধানীর চকবাজারে জয় নামে এক কিশোরকে গাড়ি চাপা দিয়ে হত্যার পর তার নামে উল্টো ছিনতাই মামলা করেছে বলে অভিযোগ করেছে পরিবার। এমনকি নিহত কিশোরের বন্ধুদের ছিনতাই মামলায় গ্রেফতার করে স্বীকারোক্তিও আদায় করেছে পুলিশ। তবে একটি সিসি ক্যামেরার ফুটেজ উদ্ধারের পর নড়েচড়ে বসেছে পুলিশ।

শনিবার (১৪ আগস্ট) দুপুরে বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স এসোসিয়েশন (ক্র্যাব) মিলনায়তনে এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান নিহতের পরিবারের সদস্যরা। এতে উপস্থিত ছিলেন নিহতের বাবা সামসুদ্দিন জুম্মন, বড় খালা শীলা বেগম, ছোট খালা বেলী বেগম, ফুপু রুবি বেগমসহ অন্যান্যরা।

সংবাদ সম্মেলনে নিহত জয়ের বাবা সামসুদ্দিন জুম্মন অভিযোগ করেন, কথিত পুলিশ সোর্স রিয়াজ তার ছেলেকে পরিকল্পিতভাবে ভ্যানের নিচে ফেলে হত্যা করে। এরপর উল্টো তারাই চকবাজার থানায় ছিনতাই মামলা দিয়েছে।

তিনি প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন ও জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানান।

গত ৭ আগস্ট রাত ৮টা ৪০ মিনিটে উর্দু রোডে গাড়ির নিচে পড়ে নিহত হয় জয়। পরেরদিন রিয়াজ উদ্দিন নামে এক ব্যক্তি চকবাজার থানায় একটি ছিনতাই মামলা করেন। মামলায় তিনি অভিযোগ করেন, তিনি গত ৭ আগস্ট রাতে উর্দু রোডে বসে টাকা গুনছিলেন। তখন ছিনতাইকারী জয়, হাসিব হোসেন আকিব, আরাফাত হোসেন পিয়াস, তাসিন, রজ্জব ও জিহাদসহ আরও কয়েকজন অজ্ঞাত ব্যক্তি তার টাকা ছিনিয়ে নিতে আসে। এসময় তার মাথায় আঘাত করেন। এতে তিনি গুরুতর আহত হন। টহল পুলিশ তাকে উদ্ধার করেন এবং ঘটনাস্থল থেকে ছিনতাইকারী পিয়াস ও আকিবকে গ্রেফতার করে। জয় গাড়ির সঙ্গে ধাক্কা লাগলে গুরুতর আহত হন। তাকে হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। এছাড়া রিয়াজ নিজেও ছিনতাইকারীদের ছুরিকাঘাতে আহত হন। তার মাথায় মিডফোর্ট হাসপাতালের চিকিৎসকরা পাঁচটি সেলাই দেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করেছেন।

মামলার পর পুলিশ এজাহার নামীয় পাঁচজনকেই গ্রেফতার করে। এদের মধ্যে আকিব আদালতে ছিনতাইয়ের কথা স্বীকার করে স্বীকারোক্তি জবানবন্দিও দিয়েছে।

তবে উর্দু সড়কের একটি সিসি ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজ উদ্ধারের পর রিয়াজ উদ্দিনের করা মামলার মোড় অন্যদিকে ঘুরে যেতে থাকে। নিহত জয়ের পরিবারের কাছে পুলিশের উদ্ধার করা সিসি ক্যামেরার ফুটেজ এসে পৌঁছায়। তাতে দেখা যায়, রিয়াজ উদ্দিন জয়কে ধরে নিয়ে একটি পিকআপ ভ্যানের চাকার নিচে ফেলেন। এতে গুরুতর আহত হয় সে।

এই ভিডিও ফুটেজ নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে জয়ের বাবা অভিযোগ করেন, রিয়াজ উদ্দিন থানা পুলিশের সোর্স ও তার সহযোগী রাব্বি এলাকায় চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, মাদক ব্যবসা করে। তাদের এমন অনৈতিক কর্মকাণ্ডে সহযোগিতা না করায় রিয়াজের সঙ্গে জয়ের শত্রুতার সৃষ্টি হয়। তাকে গাড়ির নিচে ফেলে হত্যা করে সে।

তিনি বলেন, গত ৭ আগস্ট রাত ৮টা ৪০ মিনিটে উর্দু রোডের জনতা ব্যাংকের সামনের রাস্তা দিয়ে জয় যাওয়ার সময় ওত পেতে থাকা রিয়াজ ও রাব্বিসহ আরও ৫-৬ জন সন্ত্রাসী তার পথরোধ করে গলা চেপে ধরে মারধর করে। তারা জোরপূর্বক চলন্ত কাভার্ড ভ্যানের নিচে জয়কে ধাক্কা মেরে ফেলে দেয়। এসময়ও সন্ত্রাসীরা তার ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালায় এবং ঘটনাস্থলেই জয়ের মৃত্যু হয়।

তিনি আরও জানান, জয়কে নির্যাতন করার দৃশ্য দূর থেকে দেখে মো. হাসিব হোসেন ওরফে আকিব তাকে রক্ষা করতে দৌড়ে এসে রাস্তা থেকে তাকে টেনে তোলার চেষ্টা করে। এসময় হত্যাকারীরা তাকেও মারধর করে।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, হত্যাকাণ্ডের ঘটনাকে আড়াল করতে চকবাজার থানায় রিয়াজ নিজে বাদী হয়ে একটি মিথ্যা ছিনতাই মামলা করে। মামলায় নিহত জয় ও তাকে রক্ষা করতে আসা আকিবসহ আরও কয়েকজন কিশোরকে আসামি করা হয় বলেও জানান তিনি।

গাড়ির নিচে ফেলে হত্যার অভিযোগের বিষয়ে রিয়াজ উদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমার কাছ থেকে টাকা ছিনিয়ে নিতে তারা ছিনতাই করে। আমার মাথায় চাকু দিয়ে আঘাত করে। তারা পালানোর সময় জয় গাড়ির নিচে পরে মারা যায়। আমি কাউকে গাড়ির নিচে ফেলে হত্যা করিনি। আমি নিজেই রাস্তায় পড়েছিলাম। লোকজন ও পুলিশ এসে আমাকে উদ্ধার করে।’

ফুটেজে তাকে জয়কে ধরে আনতে দেখা যাচ্ছে জানালে তিনি বলেন, ‘ওটা আমি না, অন্য কেউ।’

পুলিশের হাতে এই ভিডিও ফুটেজ রয়েছে। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘জয়ের পরিবার ভিডিওটির অংশ বিশেষ দেখিয়েছে। তবে ফুটেজটি শুরু থেকে দেখলে দেখা যাবে জয়, আকিব ও পিয়াস রিয়াজ উদ্দ্দিনকে ধরে গলির ভেতরে নিয়ে যায়। সেখান থেকে ধস্তাধস্তি করে রিয়াজ উদ্দিন বের হয়। এরপর ওই কাভার্ড ভ্যানের নিচে পড়ে জয়।’

তিনি বলেন, সেদিন জয়সহ অন্যরা ছিনতাই করে পালানোর সময় গাড়ির নিচে পড়ে।

তবে জয়ের পরিবারের কাছে থাকা ভিডিও ফুটেজের বর্ণনা করে তার বাবা বলেন, জয়কে যে ব্যক্তি ধরে গাড়ির চাকার নিচে চেপে ধরে সে রিয়াজ।

ভিডিওতে দেখা যায়, এক ব্যক্তি জয়কে সড়কে চেপে ধরছে। সঙ্গে সঙ্গে একটি কাভার্ড ভ্যান তার উপর দিয়ে চলে যায়। অস্পষ্ট ভিডিওতে জয়কে এই চেপে ধরা ব্যক্তিই রিয়াজ উদ্দিন বলে শনাক্ত করেছেন জয়ের পরিবার।

ভিডিওতে এমন দেখা গেলেও এসআই জাহিদুল বলেন, ধস্তাধস্তির সময় গাড়ির নিচে পড়ে নিহত হয় জয়। এই ঘটনায় সড়ক পরিবহন আইনে একটি দুর্ঘটনাজনিত মামলা করেছি আমি।