জাপানি সেই নারীর দুই সন্তান এখন পুলিশ হেফাজতে

জাপানিজ-বাংলাদেশি এক দম্পতির দুই সন্তানকে নিজের কাছে রাখার আইনি লড়াইয়ের মধ্যেই তাদের উদ্ধার করে ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে হেফাজতে রেখেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ-সিআইডি। তবে দুই সন্তানের বাবা ইমরান শরীফ দাবি করেছেন, আদালতের নির্দেশ অমান্য করে পুলিশ তার দুই সন্তানকে জোর করে বাসা থেকে তুলে নিয়ে এসেছে। তবে সিআইডির কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী ৩১ আগস্ট দুই সন্তানকে তাদের বাবা আদালতে হাজির না করে আত্মগোপনে যাওয়ার তথ্য ছিল তাদের কাছে। এ জন্য তারা দুই সন্তানকে উদ্ধার করে ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে রেখেছেন। সোমবার (২৩ আগস্ট) তাদের উচ্চ আদালতে হাজির করা হবে।

সম্প্রতি জাপান থেকে ঢাকায় এসে নাকানো এরিকো নামে এক নারী অভিযোগ করেন, তার সাবেক স্বামী কৌশলে তার দুই সন্তানকে ঢাকায় এনে আটকে রেখেছে। দুই সন্তানকে নিজের কাছে নেওয়ার জন্য তিনি গত ১৯ আগস্ট উচ্চ আদালতে একটি রিট আবেদন করেন। রিটের প্রাথমিক শুনানিতে বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত ভার্চুয়াল বেঞ্চ আগামী ৩১ আগস্ট দুই শিশুকে আদালতে হাজির করার নির্দেশ দেন। গুলশান ও আদাবর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে শিশুদের আদালতে উপস্থিতি নিশ্চিত করতে নির্দেশ দেওয়া হয়। একইসঙ্গে দুই সন্তানকে নিয়ে তাদের বাবা যেন দেশ ত্যাগ করতে না পারেন, এ জন্য এক মাসের দেশ ত্যাগের নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়।

সিআইডির কর্মকর্তারা দাবি করেন, বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমে খবর দেখে এ সম্পর্কে খোঁজ-খবর করতে শুরু করেন সিআইডির সদস্যরা। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী দুই সন্তানকে হাজির করা নাও হতে পারে এ রকম তথ্যের ভিত্তিতে সিআইডির একটি টিম রবিবার (২২ আগস্ট) রাতে বারিধারার বাসায় অভিযান চালিয়ে দুই শিশুকে নিজেদের হেফাজতে নেয়। এ সময় দুই শিশুর বাবা ইমরান শরীফও তাদের সঙ্গে ছিলেন।

ইমরান শরীফ অভিযোগ করেন, উচ্চ আদালত আগামী ৩১ আগস্ট দুই সন্তানকে আদালতে হাজির করতে বলেছেন। এ জন্য তিনি প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। কিন্তু তার আগেই সিআইডি পুলিশ তাদের বাসা থেকে জোর করে তুলে নিয়ে আসে। ইমরান শরীফ বলেন, স্ত্রীকে তিনি ডিভোর্স দেননি। স্ত্রী এরিকোই তাকে ডিভোর্স দিয়েছে। বিয়ের সময় এরিকো মুসলিম ধর্ম গ্রহণ করলেও সম্প্রতি সে (এরিকো) হিন্দু ধর্ম গ্রহণ করেন বলে দাবি করেন ইমরান।

এদিকে রবিবার রাত ১২টার দিকে দুই সন্তানসহ যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের দ্বৈত নাগরিক ইমরান শরীফকে যখন সিইডি কার্যালয়ে আনা হয়, তখন দুই সন্তান তাকে জড়িয়ে ধরে রেখেছিল। গণমাধ্যমকর্মীদের সামনে তিনি দুই সন্তানকে কার কাছে থাকবে জিজ্ঞাসা করলে দুই সন্তান চিৎকার করে বাবার কাছেই থাকতে চান। দুই সন্তান তাদের মাকে নিয়ে বিষেদাগার বক্তব্যও দেন।

দুই মেয়েকে ধরে আছে বাবা ইমরান শরীফদুই সন্তানকে উদ্ধারের বিষয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের আনুূষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনের জন্য ডাকা হলেও শেষে সংবাদ সম্মেলন করেননি সিআইডির কর্মকর্তারা। তবে অনানুষ্ঠিকভাবে সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুুপার মুক্তা ধর গণমাধ্যমকর্মীদের বলেন, ‘আমাদের কাছে সুনির্দিষ্ট তথ্য ছিল আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী দুই সন্তানকে নিয়ে তাদের বাবা ৩১ আগস্ট আদালতে হাজির হবেন না। এ জন্য আমরা তাদের উদ্ধার করে ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে পাঠিয়েছি। সোমবার তাদের আদালতে হাজির করা হবে। দুই সন্তান কার কাছে থাকবে সেই সিদ্ধান্ত আদালতই দেবেন।’

আদালতের ঘোষিত তারিখের আগেই কেন তাদের উদ্ধার করা হলো এমন প্রশ্নের জবাবে বিশেষ পুলিশ সুপার মুক্তা ধর বলেন, ‘আমাদের কাছে তথ্য ছিল তারা আদালতে হাজির হবেন না। হাজির না হলে তাদের আবার খোঁজ করতে হতো। এ জন্য আগে থেকেই তাদের উদ্ধার করেছি।’ দুই সন্তানকে উদ্ধারের বিষয়ে জাপানিজ দূতাবাসের কোনও চাপ ছিল কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘না, কেউ আমাদের চাপ বা অনুরোধও করেনি।’ সিআইডি এখানে অতি উৎসসাহী কোনও ভূমিকা পালন করছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘দুই সন্তানকে তো আমরা কারো কাছে হস্তান্তর করছি না। আমরা আদালতে হাজির করবো। আদালতই নির্ধারণ করে দেবেন তারা কার জিম্মায় থাকবেন।’

এদিকে সিআইডি কার্যালয়ে দুই সন্তানকে উদ্ধারের পর তাদের মা নাকানো এরিকোসহ কয়েকজন জাপানিজ নাগরিককে কার্যালয়ে প্রবেশ করতে দেখা গেছে। তবে তাদের কেউ গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে কথা বলতে চাননি। তবে দুই সন্তানের বাবা ইমরান শরীফের বোন সুরমা অভিযোগ করে বলেন, তার ভাইয়ের স্ত্রী এরিকো প্রতারণা করে আড়াই মিলিয়ন ডলারের একটি বাড়ি লিখে নিয়েছে। এখন আরো টাকা চাচ্ছে। সে এখন সন্তানদের নিজের কাছে নিয়ে তার ভাইকে ছুঁড়ে ফেলে দিতে চাইছে। আমরা আদালতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। পুরো বিষয়টি আমরা আদালতে তুলে ধরবো। কিন্তু আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী নির্দিষ্ট তারিখের আগেই অদৃশ্য কারণে সিআইডি তাদের বাসা থেকে তুলে নিয়ে এলো। সন্তান যেমন মায়ের, তেমনি বাবাও তো। আশা করছি আমরা আদালতে সুবিচার পাবো।’

আদালত সূত্রে জানা গেছে, জাপানি আইন অনুসারে নাকানো এরিকো (৪৬) ও বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক শরীফ ইমরান (৫৮) ২০০৮ সালের ১১ জুলাই বিয়ে করেন। এরপর তাঁরা টোকিওতে বসবাস শুরু করেন। এক যুগের দাম্পত্য জীবনে তাদের তিন কন্যাসন্তানের জন্ম হয়। বর্তমানে তাদের বয়স যথাক্রমে ১১, ১০ ও ৭ বছর। তিন মেয়ে টোকিওর একটি স্কুলে পড়ছিল। চলতি বছরের শুরুর দিকে তাদের বিয়ে বিচ্ছেদ হয়। এরপর ইমরান শরীফ এ বছরের ২১ ফেব্রুয়ারিতে বড় দুই মেয়েকে (১১ ও ১০) নিয়ে ঢাকায় চলে আসেন।

আরও পড়ুন...

জাপানি নারীর দুই সন্তানকে হাইকোর্টে হাজিরের নির্দেশ, বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা