করোনা টেস্ট জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত আরও একটি প্রতিষ্ঠানের তিন কর্মীকে গ্রেফতার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। রিজেন্ট গ্রুপ ও জেকেজি’র পর ‘টিকেএস’ নামে এই প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে করোনা টেস্ট জালিয়াতির অভিযোগ পাওয়া গেছে। এই চক্রটি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও সচিবের সই জালসহ প্রতারণা করে আসছিল বলে পুলিশের অভিযোগ।
বুধবার (১ সেপ্টেম্বর) দুপুর ২টায় ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে এ তথ্য জানান ডিএমপির যুগ্ম পুলিশ কমিশনার (সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম ও ডিবি-উত্তর) মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ।
গ্রেফতারকৃতরা হলো— টিকেএস গ্রুপের ম্যানেজিং ডিরেক্টর (এমডি) আব্দুল্লাহ আল আমিন, চেয়ারম্যান আবুল হাসান তুষার ও মার্কেটিং ম্যানেজার মোহাম্মদ শাহিন মিয়া।
এ সময় তাদের কাছ থেকে প্রতারণার কাজে ব্যবহৃত কম্পিউটার, আইডি কার্ড, ভিজিটিং কার্ড, ট্যাক্স সার্টিফিকেটসহ বিভিন্ন ধরনের জাল নিয়োগপত্র উদ্ধার করা হয়।
ডিবি জানায়, মঙ্গলবার (৩১ আগস্ট) রাজধানীর তেজগাঁও এলাকা ও ঝালকাঠি থেকে তাদেরকে গ্রেফতার করা হয়।
ডিএমপির যুগ্ম পুলিশ কমিশনার বলেন, ‘শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম সরণিতে আল-রাজি কমপ্লেক্সের দ্বিতীয় ফ্লোরকে নিজেদের কার্যালয় সাজিয়ে গত ১১ জুলাই একটি প্রতারক চক্র ‘টিকেএস গ্রুপ’ এর একটি অঙ্গ প্রতিষ্ঠান ‘টিকেএস হেলথকেয়ার সার্ভিস’ নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠান বানিয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী বরাবর একটি আবেদন করে। ওই আবেদন পত্রে তারা জানায়, দেশের ৮টি বিভাগ, ৬৪টি জেলা, ৪৯২টি উপজেলা এবং ৪ হাজার ৫৬২টি ইউনিয়নে বিনামূল্যে করোনার টেস্টের ব্যবস্থা করতে তাদের ৫ হাজার ১২৬ জন সম্মুখ যোদ্ধা প্রস্তুত আছেন।’
ডিবির কর্মকর্তা বলেন, ‘ভুঁইফোড় এই প্রতিষ্ঠানের বৈধ কোনও অস্তিত্ব না থাকায় স্বাস্থ্য ও পরিবার মন্ত্রণালয় থেকে কোভিড টেস্ট, লোক নিয়োগ, ক্যাম্প স্থাপনের কোনও অনুমতি তারা পায়নি। এরপর তারা জালিয়াতি শুরু করে।’
এছাড়া তারা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উপসচিব জাকিয়া পারভীনের সই ও সিল জাল করে নিজেরাই বুথ স্থাপন, স্যাম্পল কালেকশন, লোক নিয়োগ এবং ক্যাম্পাস স্থাপনের অনুমতি দিয়ে দেয়। এই ভুয়া অনুমতি পত্রের মাধ্যমে গ্রেফতারকৃতরা ঢাকা এবং ঝালকাঠি জেলার উপজেলা কো-অর্ডিনেটর এবং ইউনিয়নের ফিল্ড অফিসার পদে বিভিন্ন জনকে নিয়োগ দিয়ে অর্থ হাতিয়ে নেয় বলেও জানান তিনি।
ডিএমপির যুগ্ম পুলিশ কমিশনার জানান, স্বাস্থ্যসেবা সংক্রান্ত কোনও রকম সনদ এবং অভিজ্ঞতা না থাকার পরেও শুধু অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার জন্য এই চক্রটি প্রতারণা করে আসছিল।
তিনি জানান, এই চক্রের হোতা আদুল্লাহ আল আমিন কেয়ারগিভার্স ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের মার্কেটিং ম্যানেজার এবং আবুল হোসেন তুষার আল ফালাহ ইসলামী ব্যাংকের সাবেক পাবলিক রিলেশনশিপ ম্যানেজার হিসেবে কাজ করতো।
হারুন অর রশীদ আরও বলেন, ‘আব্দুল্লাহ আল আমিন এবং আবুল হাসান তুষার প্রাথমিকভাবে কোম্পানির প্রোফাইল বানানোর জন্য এক হাজার টাকা, বিভিন্ন লোগো সংবলিত আবেদনপত্র প্রিন্ট করা বাবদ এক হাজার টাকা এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়ার জন্য ৫শ’ টাকা, অর্থাৎ মোট আড়াই হাজার টাকা বিনিয়োগ করে সমগ্র দেশে ১০০টি ক্যাম্প স্থাপন করে। প্রতিটি ক্যাম্পের ডিলারশিপ দেওয়ার জন্য তারা কমপক্ষে ২ লাখ টাকা করে মোট ২ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অপচেষ্টা করছিল।
একইসঙ্গে ২০১৩, ২০১৪ ও ২০১৫ শিক্ষাবর্ষে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ কয়েক লাখ ছাত্র-যুবকের কাছ থেকে ১০০ টাকা করে রেজিস্ট্রেশন ফি’র নামে আরও কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার স্বপ্ন দেখছিল তারা।
নাগরিকদের উদ্দেশে পুলিশের এ কর্মকর্তা বলেন, ‘কোভিড-১৯ টেস্ট করিয়ে সেবার নামে জালিয়াতি সম্পর্কে সবাই সতর্ক থাকবেন। ফ্রি কোভিড-১৯ টেস্টের নামে কেউ কোথাও ক্যাম্প স্থাপন করলে পুলিশকে অবগত করুন, পুলিশ ব্যবস্থা নেবে।’
গ্রেফতারকৃতদের বিরুদ্ধে শাহবাগ থানায় একটি নিয়মিত মামলা হয়েছে। মামলার তদন্ত অব্যাহত রয়েছে বলেও জানান তিনি।
এর আগে করোনা টেস্ট নিয়ে জালিয়াতি চক্রের হোতা রিজেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. সাহেদকে র্যাব এবং জেকেজি’র চেয়ারম্যান ও এমডিকে গত বছর গ্রেফতার করেছিল তেজগাঁও থানা পুলিশ।