‘দুই সন্তান হত্যার পর বিষক্রিয়ার নাটক সাজান মা’

মায়ের সঙ্গে অরনী ও আলভীসন্তানদের ক্যারিয়ার নিয়ে দুশ্চিন্তা ও অস্থিরতা থেকেই নিজের দুই সন্তানকে হত্যা করেন মা মাহফুজা মালেক জেসমিন। প্রথমে বড় সন্তান নুসরাত আমান অরনীকে (১২) গলায় নিজের ওড়না পেঁচিয়ে হত্যা করেন। এ সময় খাটের ওপর ধস্তাধস্তি হয় ও অরনী নিচে পড়ে যায়। মেঝেতে বসে তার মৃত্যু নিশ্চিত করেন মা। পরে ছোট সন্তান আলভী আমানকে (৬) একইভাবে হত্যা করেন তিনি।
র‌্যাবের গণমাধ্যম শাখার পরিচালক মুফতি মাহমুদ খান বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে এই তথ্য জানান। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে মাহফুজা মালেক জেসমিন এসব কথা স্বীকার করেছেন বলে জানান মাহমুদ।
তিনি বলেন, ‘দুই গৃহশিক্ষিকা ওই দুই শিশুকে বিকালে দুই সময়ে পড়াতেন। তারা বাসা থেকে চলে যাওয়ার পর ২৯ ফেব্রুয়ারি আনুমানিক সাড়ে ৫টার দিকে মেয়েকে বিশ্রামের জন্য নিজের কক্ষে ডাকেন জেসমিন। মেয়েকে ঘুম পাড়ানোর চেষ্টা করেন। এ সময় ছেলে তার সঙ্গেই ঘুমিয়ে ছিল। এরপর মেয়ের গলায় নিজের ওড়না পেঁচিয়ে প্রথমে খাটের ওপর হত্যা করার চেষ্টা করেন। তখন মা-মেয়ের ধস্তাধস্তিতে মেয়েটি খাট থেকে পড়ে যায়। মেঝেতেই মা তার মৃত্যু নিশ্চিত করেন। এরপর ছেলেকেও একই কায়দায় তিনি হত্যা করেন।’
আপাতত এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে আর কারও সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি বলেও জানান তিনি। হত্যাকাণ্ডের সময় শিশুদের বাবা আমানুল্লাহ উত্তরায় নিজের কর্মস্থলে ছিলেন বলেও জানান তিনি।

মুফতি মাহমুদ বলেন, ‘সন্তানদের হত্যার পর তাদের অসুস্থ হয়ে পড়ার কথা বলে জেসমিন তার স্বামী আমানউল্লাহ এবং বোন আফরোজা লিমাকে ফোন দেন। এই খবর শুনে আমানউল্লাহ তার এক বন্ধুকে বাসায় যেতে বলেন। ওই বন্ধু ও লিমা বাসায় গিয়ে তাদের একটি হাসপাতালে নিয়ে যায়। তারা লাশের ময়নাতদন্ত করতে চায়নি। ময়নাতদন্ত ছাড়াই লাশ বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিল। এতে আমাদের আরও সন্দেহ হয়।’

শুধু কি সন্তানদের ক্যারিয়ারের কারণে এমন হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে? সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে র‌্যাবের মুখপাত্র বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে আমাদের কাছে এই করাণটিই তিনি ব্যাখা করেছেন। অন্য কোনও কারণ বলেননি। এ সময় জেসমিন স্বাভাবিক ও সুস্থ ছিল। জেসমিন ম্যানেজমেন্টে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেছেন। তিনি শিক্ষিত, তাই সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত ছিলেন।’

এই হত্যাকাণ্ডে আর কেউ জড়িত কি না? এমন প্রশ্নের জবাবে মুফতি মাহমুদ বলেন, ‘আমরা এখন পর্যন্ত অন্য কারো সম্পৃক্ততা পাইনি। এখন আরও তদন্ত করা হবে। আজ সকাল ৯টায় আমরা তাকে জিজ্ঞাসাবাদ শেষ করেছি। এ বিষয়ে আরও কিছু পেলে বিস্তারিত পরে জানানো হবে।’

বাবা হত্যাকাণ্ডের ঘটনা লুকাতে চেয়েছিলেন কেন? এই প্রশ্নের জবাবে র‌্যাবের মুখপাত্র বলেন, ‘গত ১৪ ফেব্রুয়ারি জেসমিন ও আমানউল্লাহর বিবাহবার্ষিকী ছিল। ওই দিন আমানউল্লাহ চায়নিজ থেকে খাবার নিয়ে এসেছিলেন। হত্যাকাণ্ডের পর মা জেসমিন বারবার ওই খাবারের বিষক্রিয়ার কথা বলেছিলেন। তাই বাবাও ছিলেন ভয়ে। জেসমিন হত্যার সঙ্গে খাবারের লিংকআপ করার চেষ্টা করেছেন। হয়তো এ কারণে বাবা বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন।’

ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী নুসরাত আমান অরনী ও হলি ক্রিসেন্ট স্কুলের নার্সারির ছাত্র আলভী আমানকে সোমবার মৃত ঘোষণা করেন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসকরা। তাদের শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে বলে ময়তাদন্তের পর জানান তারা। তবে দুই শিশুর স্বজনরা দাবি করছিলেন একটি চাইনিজ রেস্টুরেন্ট থেকে আনা খাবার খেয়ে বিষক্রিয়ায় তারা মারা গেছে। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের বাবা আমানুল্লাহ, মা মাহফুজা মালেক জেসমিন ও খালা মিলাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। বুধবার জামালপুর থেকে শিশু দুটির মা-বাবাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ঢাকায় আনে র‌্যাব। বুধবার রাতভর তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে মা জেসমিন বেগম হত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকার করেন।

মুফতি মাহমুদ বলেন, ‘শিশু দুটির মা সবসময় তার সন্তানদের স্কুলের পরীক্ষার ফলাফল ও ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তাযুক্ত থাকতেন। বেগম জেসমিনের ধারণা ছিল, তার সন্তানেরা বড় হয়ে কিছুই করতে পারবে না। এ থেকেই এই হত্যাকাণ্ড ঘটায়।’

ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পুলিশের হাতে:
এদিকে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগ রামপুরা পুলিশের কাছে ময়নাতদন্তের রিপোর্ট হস্তান্তর করেছে। ঢামেক হাসপাতালের ফরেনসিক ও মেডিসিন বিভাগের চিকিৎসক প্রদীপ কুমার বিশ্বাস এই তথ্য জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে আমরা আগে যে বক্তব্য দিয়েছি তাই সঠিক। এর বেশি বলতে পারব না।’

এর আগে চিকিৎসকরা জানিয়েছিলেন, ‘দুই শিশুকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে।’ তবে এ বিষয়ে পুলিশ এখনও কোনও মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।

/এআরআর/এজে/