সাজা শেষ হলেও মুক্তি মিলছে না কত বিদেশির

কারাদণ্ডের মেয়াদ অনেক আগেই শেষ হয়েছে। আদালতের দেওয়া শাস্তিও পূর্ণ করেছেন। তবু মুক্তি মিলছে না। কারণ তারা বাংলাদেশি নন। নিজ দেশ তাদের ফিরিয়ে নিতে রাজি নয়, আবার বাংলাদেশেও বৈধভাবে থাকার কোনও সুযোগ নেই। ফলে মুক্তির অপেক্ষায় দিন, মাস, এমনকি বছরের পর বছর কাটছে কারাগারের চার দেয়ালের ভেতরেই।

প্রতারণা, মাদক ব্যবসা, অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রম, এটিএম জালিয়াতিসহ বিভিন্ন অপরাধে সাজাপ্রাপ্ত বিদেশি নাগরিকদের একটি অংশ এমনই এক আইনি জটিলতার আটকা পড়েছেন যে, অপরাধের শাস্তি শেষ হলেও বন্দিজীবনের ইতি ঘটছে না।

কারা অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, গত ১৩ জুন পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন কারাগারে মোট ৩৯০ জন বিদেশি নাগরিক বন্দি রয়েছেন। তাদের মধ্যে ১৬০ জনের কারাদণ্ডের মেয়াদ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। কিন্তু প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়ায় তারা এখনও ‘রিলিজ প্রিজনার’ (আরপি) হিসেবে কারাগারেই অবস্থান করছেন।

কীভাবে জড়াচ্ছেন অপরাধে?

কারা কর্মকর্তারা বলছেন, আফ্রিকা, দক্ষিণ এশিয়া ও বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে অনেকেই বাংলাদেশে আসেন উন্নত জীবনের আশায়। কেউ পর্যটক, কেউ শিক্ষার্থী, আবার কেউ ব্যবসায়িক ভিসায় বাংলাদেশে প্রবেশ করেন। কিন্তু অনেকে ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও বাংলাদেশে থেকে যান। কেউ কেউ পরে অপরাধচক্রের সঙ্গেও জড়িয়ে পড়েন।

তাদের বিরুদ্ধে ব্যবসার নামে প্রতারণা, বিদেশে পাঠানোর প্রলোভন, ভুয়া লটারির ফাঁদ, এটিএম জালিয়াতি এবং মাদক ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশে প্রবেশের ঘটনাও রয়েছে। এসব অভিযোগে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের গ্রেফতার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠায়।

সাজা শেষ, কিন্তু মিলছে না মুক্তি

কারা মহাপরিদর্শক (আইজি প্রিজন) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো. মোতাহার হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘বিদেশি বন্দিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বন্দির সাজা ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। কিন্তু নিজ নিজ দেশ তাদেরকে নাগরিক হিসেবে গ্রহণ না করায় এই বন্দিরা এখনও বাংলাদেশে আটক অবস্থায় রয়েছেন।’’

তিনি বলেন, ‘‘পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করা হচ্ছে। তাদের নাগরিকদের ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য অনুরোধ জানানো হচ্ছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ও বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার সহায়তায় বন্দিদের পরিচয় ও ঠিকানা যাচাইয়ের চেষ্টা চলছে।’’

তার ভাষ্য, অনেক ক্ষেত্রে বন্দিদের দেওয়া ঠিকানা বা পরিচয় সংক্রান্ত তথ্য যাচাই করা যায় না। ফলে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোও তাদের নাগরিক হিসেবে গ্রহণে অনাগ্রহ দেখায়। এতে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হচ্ছে।

আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতা

আইজি প্রিজন বলেন, ‘‘কারাদণ্ডের মেয়াদ শেষ হওয়া এসব বিদেশি নাগরিককে বাংলাদেশ যেকোনও সময় মুক্তি দিতে প্রস্তুত। তারা দেশে বৈধভাবে অবস্থান করতে পারবেন না। আবার নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থাও সম্পন্ন করা যাচ্ছে না। ফলে তারা এক ধরনের আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতায় আটকে আছেন।’’

তিনি জানান, সংশ্লিষ্ট দেশ তাদের নাগরিককে গ্রহণ করলেই দ্রুত মুক্তি ও প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে।

রাষ্ট্রের ওপর বাড়তি বোঝা

এই দীর্ঘসূত্রতার কারণে রাষ্ট্রকে অতিরিক্ত আর্থিক ব্যয়ও বহন করতে হচ্ছে। কারাগারে থাকা বিদেশি বন্দিদের আবাসন, খাদ্য, চিকিৎসা এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় সেবার ব্যয় সরকারকেই বহন করতে হয়।

আইজি প্রিজন বলেন, ‘‘দীর্ঘদিন ধরে এসব বন্দিকে কারাগারে রাখতে হচ্ছে। এতে রাষ্ট্রের ব্যয় বাড়ছে। একইসঙ্গে শাস্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও কাউকে আটকে রাখা আমাদেরও কাম্য নয়।’’

নেই কোনও ডিটেনশন সেন্টার

বিদেশি নাগরিকদের আটকে রাখার আইনি-ভিত্তি সম্পর্কে আইজি প্রিজন বলেন, ‘‘বাংলাদেশে বিদেশিদের জন্য আলাদা কোনও ডিটেনশন সেন্টার বা বিশেষ আবাসন ব্যবস্থা নেই। ফলে বিদ্যমান আইন ও প্রশাসনিক কাঠামোর আওতায় তাদের কারাগারেই রাখা হচ্ছে।’’

তিনি বলেন, ‘‘বিশ্বের অনেক দেশে এ ধরনের ব্যক্তিদের জন্য পৃথক ডিটেনশন সেন্টার বা বিশেষ আশ্রয়কেন্দ্র রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে এখনও সেই ধরনের অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি।’’

মানবিক প্রশ্নও সামনে

বিদেশি এসব বন্দির অনেকেই শাস্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। কেউই জানেন না কবে তারা দেশে ফিরতে পারবেন, আদৌ কোনও দেশ তাদের গ্রহণ করবে কিনা, এমন অশ্চিয়তায় দিন কাটছে তাদের।

ফলে আইনগত জটিলতার পাশাপাশি বিষয়টি এখন মানবিক প্রশ্নও হয়ে উঠেছে। শাস্তি শেষ হওয়ার পরও কারাগারে আটকে থাকা এসব মানুষ যেন রাষ্ট্র, আইন ও কূটনৈতিক বাস্তবতার ফাঁদে আটকে আছেন।