দুই চালানে ১০০ কোটি টাকার স্বর্ণ উদ্ধার, নেপথ্যে কারা?

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তিন মাসের ব্যবধানে দুই চালানে প্রায় ১০০ কোটি টাকার স্বর্ণ উদ্ধারের ঘটনায় নড়েচড়ে বসেছেন সংশ্লিষ্টরা। দুটি ঘটনাতেই বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ফ্লাইট ব্যবহার হওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে, পতাকাবাহী রাষ্ট্রীয় এয়ারলাইনসকে ব্যবহার করে কারা কোটি কোটি টাকার স্বর্ণ দেশে আনছে। ইতোমধ্যে দুই ঘটনায় বিমানবন্দর থানায় মামলা হয়েছে, চলছে তদন্ত।

বিমানবন্দর থানার ওসি কামরুল ইসলাম তালুকদার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দুটি ঘটনার তদন্ত চলছে। ইতোমধ্যে প্রথম মামলার তদন্তে অনেক অগ্রগতি হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘মামলার তদন্তের স্বার্থে অনেক কিছুই বলা যাচ্ছে না। যেহেতু মামলার সন্দেহভাজনরা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে কর্মরত, সেহেতু শতভাগ নিশ্চিত না হয়ে আমরা কিছু বলছি না।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘মামলার এজাহারে কোনও আসামির নাম উল্লেখ নেই। দুটি ঘটনাই বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ফ্লাইটে ঘটেছে। যেসব স্থান থেকে স্বর্ণ উদ্ধার হয়েছে, সেগুলো খুবই স্পর্শকাতর। সুতরাং এসব স্থান কারা ব্যবহার করতে পারে, তা সবাই জানে। আমরা শতভাগ নিশ্চিত হতে আরও কিছু সময় নিতে চাই। এই সময়ের মধ্যে নিশ্চিত হয়ে ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় আনবো।’

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত ২৮ মার্চ দিবাগত রাতে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে প্রায় ১৮ কেজি স্বর্ণ জব্দ করা হয়। দুবাই থেকে আসা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বিজি-৩৪৮ ফ্লাইটের কার্গো কম্পার্টমেন্টের টয়লেটের প্যানেলের ভেতরে সাদা কাপড়ে মোড়ানো অবস্থায় স্বর্ণগুলো পাওয়া যায়। সেখানে ১৫৩টি স্বর্ণের বার ছিল, যার মোট ওজন ১৭ কেজি ৯০১ গ্রাম। ২৪ ক্যারেটের এসব স্বর্ণের আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ৪৬ কোটি টাকা।

এ ঘটনায় সংস্থাটির সাত কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন তদন্তকারীরা। কয়েকজনের মোবাইল ফোনে স্বর্ণ চোরাকারবারিদের ব্যবহৃত সাংকেতিক চিহ্ন বা কোড পাওয়া যায়। পরবর্তীতে ঘটনাটির অধিকতর তদন্তের সিদ্ধান্ত হওয়ায় এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেফতার করা হয়নি।

জানা গেছে, ২৮ মার্চের স্বর্ণ উদ্ধারের ঘটনায় সন্দেহভাজনদের সর্বোচ্চ নজরদারিতে রাখা হয়েছে। তারা যেন দেশ ছেড়ে পালাতে বা আত্মগোপনে যেতে না পারে, সে জন্য নেওয়া হয়েছে বিশেষ ব্যবস্থা।

এদিকে ঘটনার তিন মাস পর, গত ২ জুলাই (বৃহস্পতিবার) একই ধরনের আরেকটি চালান ধরা পড়ে। দুবাই থেকে আসা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইট থেকে উদ্ধার করা হয় ১৮ কেজি ৭২০ গ্রাম স্বর্ণ। এই স্বর্ণেরও বাজারমূল্য প্রায় ৪৫ কোটি টাকা। এ ঘটনাতেও মামলা হয়েছে। তবে মামলায় কারও নাম উল্লেখ করে আসামি করা হয়নি।

তদন্তকারীরা বলছেন, পরপর দুটি ঘটনার মধ্যে অনেক মিল রয়েছে। স্বর্ণের পরিমাণ প্রায় একই। একই এয়ারলাইনসও ব্যবহার করা হয়েছে।

তাদের ভাষ্য, তদন্তে নিশ্চিত হওয়া গেছে, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পৃক্ততা রয়েছে। তাদের সঙ্গে নেপথ্যে কারা রয়েছে, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

তদন্তকারীরা জানান, খুব শিগগিরই স্বর্ণ চোরাকারবারির সঙ্গে জড়িত বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আইনের আওতায় আনা হবে।

বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক এস এম রাগিব সামাদ বলেন, ‘বিমানবন্দরকে চোরাকারবারীমুক্ত রাখতে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। আমাদের চেষ্টার কারণেই স্বর্ণের চালান ধরা পড়ছে।’

তিনি বলেন, ‘তদন্তে যাদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যাবে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের আইনের আওতায় আনবে। এখানে একবিন্দুও ছাড় দেওয়া হবে না।’

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের মুখপাত্র বোসরা ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ব্যক্তির অপরাধের দায় প্রতিষ্ঠান নেবে না। দুটি ঘটনায় থানায় মামলা হয়েছে। তদন্ত করছে পুলিশ। যাদের বিরুদ্ধে অপরাধের প্রমাণ পাওয়া যাবে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

তিনি বলেন, ‘বিমানের কোনও কর্মীর সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিমান কোনও অপরাধীকে ছাড় দেয় না।’

অন্যদিকে প্রশ্ন উঠেছে, কারা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করে চোরাচালান করছে। এর আগেও বিমানকে ব্যবহার করা হয়েছে। বারবার এ ধরনের কর্মকাণ্ড নানা প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে।

চোরাকারবারিদের সঙ্গে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের কর্মচারীদের সংশ্লিষ্টতার বিষয়ও উঠে আসছে। এ কারণে দোষীদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন সাধারণ মানুষ।