শাহজালালে ১৮ কেজি স্বর্ণ জব্দ: নজরদারিতে বিমানের ৪ কর্মী

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ১৮ কেজিরও বেশি স্বর্ণ উদ্ধারের ঘটনায় তদন্তে বড় ধরনের অগ্রগতি হয়েছে। তদন্ত সংশ্লিষ্টদের দাবি, স্বর্ণের চালান খালাসের দায়িত্বে ছিলেন বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের প্রকৌশল বিভাগের চার কর্মী। তাদের পূর্ণ গোয়েন্দা নজরদারিতে রাখা হয়েছে এবং যেকোনও সময় গ্রেফতার করা হতে পারে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। তবে তদন্তের স্বার্থে সংশ্লিষ্টদের নাম প্রকাশ করা হয়নি।

তদন্তকারীদের ভাষ্য, দুবাই থেকে আসা ফ্লাইটটি হ্যাঙ্গারে নেওয়ার পর সুবিধাজনক সময়ে স্বর্ণগুলো খালাস করার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু তার আগেই গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে যৌথ অভিযান চালিয়ে চালানটি জব্দ করা হয়।

গত ২ জুলাই হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দুবাই থেকে আসা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটের কার্গো হোল্ড থেকে যৌথ বাহিনীর অভিযানে ১৮ কেজি ৭২০ গ্রাম স্বর্ণ উদ্ধার করা হয়।

গোপন সংবাদের ভিত্তিতে বিমানবন্দরের ডিজিএফআই, এভিয়েশন সিকিউরিটি, কাস্টমস এবং বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের নিরাপত্তা বিভাগ যৌথভাবে অভিযান পরিচালনা করে।

প্রাথমিক তল্লাশিতে প্রায় ১৫ কেজি স্বর্ণ উদ্ধার হলেও পরে বিস্তারিত অনুসন্ধানে মোট ১৮ কেজি ৭২০ গ্রাম স্বর্ণ জব্দ করা হয়।

এর আগে গত মার্চেও একই কায়দায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইট থেকে প্রায় ১৮ কেজি স্বর্ণ উদ্ধার হয়েছিল। পরপর দুটি ঘটনায় একই ধরনের কৌশল ব্যবহার হওয়ায় তদন্তকারীদের ধারণা, একই চক্র একই রুট ব্যবহার করে বড় চালান পাচারের চেষ্টা করছে।

বিমানবন্দর সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দুটি ঘটনার মধ্যে যোগসূত্র খুঁজে বের করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো কাজ করছে।

তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানান, ইতোমধ্যে চক্রটির সদস্যদের শনাক্ত করা হয়েছে। বিমানবন্দরে দায়িত্বে থাকা বিমানের প্রকৌশল বিভাগের কয়েকজন কর্মী স্বর্ণ খালাসে সহায়তা করতেন। তাদের পরিচয়ও তদন্তে উঠে এসেছে। এখন আরও প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা হচ্ছে।

তাদের দাবি, খুব শিগগিরই গ্রেফতার অভিযান চালানো হবে। স্বর্ণ খালাসে সহায়তাকারী চার কর্মীকে নিবিড় নজরদারিতে রাখা হয়েছে, যাতে তারা পালিয়ে যেতে না পারেন।

এর আগে সোমবার স্বর্ণ উদ্ধারের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ফ্লাইট পরিচালনায় দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের তালিকা চেয়ে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সকে চিঠি দেয় পুলিশ। একই সঙ্গে ফ্লাইটটি সরেজমিন পরিদর্শনের অনুমতিও চাওয়া হয়।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বিমানবন্দর থানার পরিদর্শক (অপারেশনস) শরিফ হোসেন বলেন, ‘তদন্ত চলমান রয়েছে। এ মুহূর্তে সবকিছু বলা সম্ভব নয়। তবে আশা করছি, খুব শিগগিরই মামলার বড় ধরনের অগ্রগতি হবে।’

তিনি বলেন, ‘সংশ্লিষ্ট ফ্লাইট পরিচালনায় দায়িত্বে থাকা ইঞ্জিনিয়ারিং সেকশন, ক্লিনিং সেকশন, কেবিন ক্রু ও পাইলটদের তালিকা চাওয়া হয়েছে। তদন্তের স্বার্থে সবার সঙ্গে কথা বলা হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী এই এয়ারলাইন্সকে ব্যবহার করে যারা স্বর্ণ চোরাচালান করছে, তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।’

ভেতরের লোক জড়িত থাকার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে শরিফ হোসেন বলেন, ‘যেভাবে স্বর্ণ আনা হয়েছে, তাতে অভ্যন্তরীণ সহযোগিতার সন্দেহ রয়েছে। তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কারও নাম বলা সমীচীন হবে না।’

তিনি জানান, সংশ্লিষ্টদের তালিকা হাতে পেলেই জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করা হবে।

বিমানবন্দর থানা সূত্র জানায়, ২০১৬ সাল থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত সাড়ে ১০ বছরে স্বর্ণ চোরাচালানসংক্রান্ত ৬৯৭টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই হয়েছে ২৭টি মামলা। মোট ৬৪৭টি মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে। বাকি ৫০টির মধ্যে ৪২টি তদন্ত করছে থানা পুলিশ এবং ৮টি তদন্ত করছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।

কাস্টমস সূত্র জানায়, গত সাড়ে পাঁচ বছরে ৩ হাজার ৭২৮ কোটি টাকা মূল্যের ৯০২ কেজি স্বর্ণ জব্দ করা হয়েছে। নিয়মিত স্বর্ণ জব্দ হলেও রহস্যজনক কারণে চোরাচালানের চালান বন্ধ হচ্ছে না বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মন্তব্য।