২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে দেশে যে ‘মব সংস্কৃতি’ শুরু হয়েছিল, তা এখনও অব্যাহত রয়েছে। সবশেষ রাজধানীতে তিন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিককে ঘিরে হেনস্তার ঘটনার পর আবারও প্রশ্ন উঠেছে—এই মব সহিংসতা থামবে কবে? সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী ও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আইনের শাসন নিশ্চিত করতে হলে মব সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। সরকারের কোনও ধরনের প্রচ্ছন্ন প্রশ্রয় থাকলে এই প্রবণতা বন্ধ হবে না।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বুধবার (১৫ জুলাই) রাতে রাজধানীর তেজগাঁওয়ের ইম্পালস হাসপাতালের সামনে আল মদিনা রেস্টুরেন্টে জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক মুন্নী সাহা, জ ই মামুন ও প্রভাষ আমিনকে ঘিরে হেনস্তার ঘটনা ঘটে। পরে অন্য সাংবাদিকদের তৎপরতা এবং পুলিশের উপস্থিতিতে তারা নিরাপদে ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন। এই ঘটনার পর আবারও মব সংস্কৃতি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর শুরু হওয়া মব সংস্কৃতির শিকার হয়েছেন সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশে ‘মব জাস্টিস’ বা জনতার হাতে আইন তুলে নেওয়ার প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগও বেড়েছে।
তাদের ভাষ্য, বিভিন্ন ঘটনায় অভিযোগ বা সন্দেহের ভিত্তিতে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে তুলে দেওয়ার পরিবর্তে জনতা ঘিরে ধরে জিজ্ঞাসাবাদ, ভিডিও ধারণ এবং শারীরিক ও মানসিকভাবে হেনস্তা করছে। এতে বিচারিক প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি নিরপরাধ ব্যক্তিও হয়রানির শিকার হতে পারেন।
গণমাধ্যম-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, সাংবাদিকদের কাজের সমালোচনা বা তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকতেই পারে। তবে তার সমাধান জনতার আদালতে নয়, আইন ও আদালতের মাধ্যমেই হওয়া উচিত। অন্যথায় সংবাদপেশার স্বাধীনতা এবং ব্যক্তির মৌলিক অধিকার—উভয়ই ঝুঁকির মুখে পড়ে।
যদিও বুধবার রাতের ঘটনায় তিন সাংবাদিক নিরাপদে ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন, তবু ঘটনাটি নিয়ে সাংবাদিক সমাজে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় ও ঘটনার পেছনের কারণ সম্পর্কে আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত কিছু জানা যায়নি। তবে গণমাধ্যমকর্মীরা আশা করছেন, ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত হবে এবং ভবিষ্যতে যাতে কেউ আইন নিজের হাতে তুলে নিতে না পারে, সে বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে একাধিকবার মন্তব্য করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদ। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি দেশে ‘মব কালচার শেষ’ এবং আর এ ধরনের ঘটনা ঘটবে না বলে মন্তব্য করেছিলেন।
গত ৩০ মার্চ জাতীয় সংসদেও তিনি বলেন, সরকার বাকস্বাধীনতা ও সংগঠনের অধিকার নিশ্চিত করবে। তবে মবের মাধ্যমে দাবি আদায়ের প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। কিন্তু পরবর্তী কয়েক মাসের ঘটনা এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য সরকারি আশ্বাসের সঙ্গে বাস্তবতার ব্যবধান তুলে ধরছে।
মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) জানায়, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ২০০ হামলার ঘটনায় ৩৮৩ সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। এসব ঘটনায় আহত হয়েছেন ২৩৪ জন, লাঞ্ছনার শিকার হয়েছেন ৬০ জন এবং হুমকির মুখে পড়েছেন ৪৯ জন সাংবাদিক। একই সময়ে ১১ জন সাংবাদিককে আটক করা হয়েছে।
সংগঠনটির তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত রাজনৈতিক ও নির্বাচনী সহিংসতায় দলীয় কোন্দল ও অন্তর্কোন্দলে ৫৬ জন নিহত হয়েছেন। একই সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক সহিংসতায় আহত হয়েছেন ৫ হাজার ২৪৬ জনের বেশি নেতা-কর্মী ও সাধারণ মানুষ। এছাড়া মব সহিংসতা ও গণপিটুনির ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১৩৩ জন এবং আহত হয়েছেন ২৫৬ জন।
সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট মাসুদ কামাল বলেন, ‘সরকার যদি মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপন ও চলাফেরার নিশ্চয়তা দিতে না পারে, তাহলে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে; এ কথা বলা যাবে না ‘
তিনি বলেন, ‘সরকার শুরু থেকেই আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার কথা বলছে। কিন্তু তার বাস্তব প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।’ এর বড় উদাহরণ হিসেবে তিনি তিন সাংবাদিককে ঘিরে হেনস্তার ঘটনার কথা উল্লেখ করেন।
তার ভাষায়, ‘উনারা সেখানে গিয়েছিলেন খেতে অথবা অন্য কিছু করতে। সেখানে বিএনপির নামধারী বিএনপির নাম নিয়ে যে সমস্ত লোক তাদের ওপর চড়াও হয়েছে, তাদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেছে, তাদেরকে ধরে নিয়ে থানায় যেতে চেয়েছে—এগুলোর কোনও অধিকার অন্য কোনও নাগরিকের নেই, বিএনপির লোকেরও নেই।’
তিনি বলেন, ‘যারা এ ঘটনা ঘটিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত ছিল। যদি তা না নেওয়া হয়, তাহলে বলতে হবে সরকারও এক ধরনের মবকে প্রশ্রয় দিচ্ছে।’
মাসুদ কামাল আরও বলেন, ‘যারা স্বাভাবিক জীবনযাপন করছে, নিরীহ জীবনযাপন করছে, তাদের ওপরও চড়াও হওয়া কোনও বিবেচনাতেই গ্রহণযোগ্য নয়। ওখানে সিসিটিভি ফুটেজ আছে। দেখে প্রত্যেককে আইনের আওতায় আনতে হবে। কেউ অপরাধ করে থাকলে তার বিরুদ্ধে মামলা হবে, বিচার হবে, সাজা হলে সাজা পাবে, না হলে পাবে না—এটাই স্বাভাবিক।’
তার ভাষায়, ‘ইচ্ছা করলে একজনের বিরুদ্ধে বলবেন যে ফ্যাসিস্টের দোসর, বলেই তার ওপর চড়াও হবেন, আর রাষ্ট্র ও প্রশাসন কিছু বলবে না; এটা সরকারের বড় দুর্বলতার পরিচয়। সরকারের উচিত এ বিষয়ে অবশ্যই সিরিয়াসলি ব্যবস্থা নেওয়া।’
সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা বলেন, ‘মব উচ্ছৃঙ্খলতা কেবল কিছু মানুষের হঠকারী আচরণ নয়; এটি আইনের শাসন ও সভ্য সমাজের ভিত্তির ওপর সরাসরি আঘাত।’
তার ভাষায়, জনতা যখন আইন নিজের হাতে তুলে নেয়, তখন রাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থার বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ হয় এবং সংবিধানের মৌলিক চেতনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যুক্তি ও প্রমাণের বদলে আবেগ, গুজব কিংবা উসকানি প্রাধান্য পেলে নিরপরাধ মানুষও সহিংসতার শিকার হতে পারেন। এতে সমাজে নিরাপত্তাহীনতা ও পারস্পরিক অবিশ্বাস বাড়ে।
তিনি বলেন, ‘এর প্রভাব শুধু সামাজিক নয়, অর্থনৈতিকও। মব সহিংসতায় সম্পদের ক্ষতি হয়, ব্যবসা-বাণিজ্য ব্যাহত হয় এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমে যায়। দীর্ঘমেয়াদে এটি একটি সমাজকে ন্যায়বিচার ও আইনের পথ থেকে সরিয়ে প্রতিশোধনির্ভর, মধ্যযুগীয় মানসিকতার দিকে ঠেলে দেয়। তাই মব উচ্ছৃঙ্খলতা রোধে কার্যকর আইন প্রয়োগ, বিচারব্যবস্থার প্রতি জনআস্থা বৃদ্ধি এবং সামাজিক সচেতনতার সমন্বিত উদ্যোগ অপরিহার্য।’
ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হাসান সোহেল বলেন, ‘সাধারণ মানুষ সব ধরনের মব সংস্কৃতির বিপক্ষে। দেশে বিদ্যমান আইন অনুযায়ী যে কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তাই আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া কিংবা মব সৃষ্টির কোনও সুযোগ নেই।’
তিনি বলেন, ‘মব করা একটি বেআইনি কাজ। এ ধরনের ঘটনার বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর অবস্থান নেওয়া প্রয়োজন।’
তিন সাংবাদিককে ঘিরে মব সৃষ্টির চেষ্টার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, সাংবাদিকদের সব সময় সচেতন থেকে পেশাগত দায়িত্ব পালন করা উচিত। বিশেষ করে বিভিন্ন অ্যাক্টিভিস্ট বা জনসমাগমপূর্ণ পরিবেশে কাজ করার সময় নিজেদের নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা জরুরি।
তার ভাষায়, কোনও সাংবাদিক যদি মব সন্ত্রাসের লক্ষ্যবস্তু হন, তাহলে সহকর্মীদেরও সেখানে যাওয়ার ক্ষেত্রে নিরাপত্তার বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে। পেশাগত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি নিজের সুরক্ষা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
মাইনুল হাসান সোহেল বলেন, ‘যারা মব সৃষ্টির চেষ্টা করে বা মব সংস্কৃতিকে উসকে দেয়, তাদের পক্ষে কোনও শান্তিপ্রিয় মানুষ থাকতে পারে না।’ তিনি সবাইকে মব সংস্কৃতির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান।
হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেন, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রতিটি নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তা মৌলিক অধিকার। এ ধরনের বর্বর ঘটনা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও মানবাধিকার পরিস্থিতিকে গুরুতর ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে।
তিনি বলেন, মব সহিংসতা রোধে সরকারকে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্যথায় পরিস্থিতি আরও অবনতি হতে পারে।
পুলিশ সদর দফতরের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘জনগণের মধ্যে আইন নিজ হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা না কমলে মব সহিংসতা বন্ধ করা কঠিন হবে।’
তিনি বলেন, ‘মব ভায়োলেন্স তখনই বন্ধ হবে, যখন জনগণ সচেতন হবে এবং আইন মেনে চলবে। আইন না মানার প্রবণতার কারণে এটি বন্ধ করা কঠিন হচ্ছে। তবে পুলিশ এ বিষয়ে কাজ করছে।’
তিনি আরও বলেন, এমন ঘটনা ঘটলে পুলিশ তাৎক্ষণিক অভিযান চালাচ্ছে, তদন্ত করছে এবং জড়িতদের গ্রেফতার করছে। পুলিশের এ কার্যক্রম চলতে থাকলে একসময় মব কালচার বন্ধ হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।