থামছে না পিটিয়ে হত্যা, ছয় মাসে প্রাণ গেলো শতাধিক মানুষের

সুজন কৈরী
১৬ জুলাই ২০২৬, ২২:৫২ আপডেট : ১৭ জুলাই ২০২৬, ২২:১৪

দেশে গণপিটুনি ও মব সহিংসতা থামছেই না। সরকারের পক্ষ থেকে একাধিকবার ‘মব কালচার’ বন্ধের ঘোষণা এলেও চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে এ ধরনের ঘটনায় শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য বলছে, এক বছরের ব্যবধানে মব সহিংসতার ঘটনা ও প্রাণহানি প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।

সবশেষ বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) সকালে চট্টগ্রামের একটি গ্যারেজ থেকে ৭০ বছর বয়সী দারোয়ান মো. সিদ্দিকের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। শরীরজুড়ে ছিল আঘাতের চিহ্ন। পুলিশের ধারণা, চুরি যাওয়া ব্যাটারি ফেরত দিতে চাপ দেওয়ায় আগের রাতে তাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। 

এর এক দিন আগে নরসিংদীর রায়পুরায় ২২ বছর বয়সী বেকারি শ্রমিক নাসির মিয়াকে একটি গুদামঘরে আটকে বেধড়ক মারধর করা হয়। হাসপাতালে নেওয়ার আগেই তার মৃত্যু হয়। এরও কয়েক দিন আগে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় ছিনতাইকারী সন্দেহে সিজান নামে এক যুবকের হাত-পা বেঁধে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ ওঠে স্থানীয় কয়েকজনের বিরুদ্ধে।

তিনটি ঘটনার স্থান ও প্রেক্ষাপট ভিন্ন হলেও পরিণতি একই—অভিযোগ যাচাই, গ্রেফতার বা বিচার শুরুর আগেই জনতার হাতে মৃত্যু।

ছয় মাসে নিহত ১৩৩

হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত দেশে মব সহিংসতা ও গণপিটুনির ২৬১টি ঘটনায় অন্তত ১৩৩ জন নিহত এবং ২৫৬ জন আহত হয়েছেন। ২০২৫ সালের একই সময়ে ১৪১টি ঘটনায় নিহত হয়েছিলেন ৬৭ জন এবং আহত হন ১১৯ জন। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ঘটনা ও প্রাণহানি প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।

অন্যদিকে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসাবে, একই সময়ে মব সহিংসতায় নিহত হয়েছেন ১১৩ জন। গত বছরের একই সময়ে নিহতের সংখ্যা ছিল ৮৯। তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতিতে পার্থক্য থাকলেও দুটি প্রতিষ্ঠানের পরিসংখ্যানেই সহিংসতা বৃদ্ধির প্রবণতা স্পষ্ট।

অভিযোগই হয়ে উঠছে তাৎক্ষণিক রায়

মানবাধিকারকর্মী ও অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, গণপিটুনির ঘটনা এখন শুধু চুরি বা ছিনতাইয়ের সন্দেহে সীমাবদ্ধ নেই। ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগ, ব্যক্তিগত বিরোধ, রাজনৈতিক উত্তেজনা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব, স্থানীয় আধিপত্য এবং পূর্বশত্রুতাও সংঘবদ্ধ হামলার কারণ হয়ে উঠছে।

অনেক ক্ষেত্রে অভিযোগ যাচাই না করেই সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে ঘিরে ধরে মারধর শুরু হয়। পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই গুরুতর আহত বা নিহত হন ভুক্তভোগী। কোথাও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী উপস্থিত থাকলেও উত্তেজিত জনতাকে নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খেতে হয়।

চট্টগ্রামের মনসুরাবাদে নিহত সিদ্দিক একটি গ্যারেজে দারোয়ানের কাজ করতেন। কয়েক দিন আগে সেখান থেকে ব্যাটারি চুরি হওয়ার পর তিনি সেটি ফেরত দিতে চাপ দিচ্ছিলেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।

ডবলমুরিং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শাহীনূর আলম জানান, বুধবার রাতে তাকে মারধর করে গ্যারেজে ফেলে রাখা হয় বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ ঘটনায় একজনকে আটক করা হয়েছে। অন্যদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে।

নরসিংদীর রায়পুরায় নিহত নাসির মিয়াকে জংলী শিবপুর বাজারের একটি গুদামঘরে আটকে মারধর করা হয়েছিল। রায়পুরা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা জান্নাতুল নাঈম জানান, তাকে মৃত অবস্থায় হাসপাতালে আনা হয়। শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন ছিল।

নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় সিজানকে ছিনতাইকারী সন্দেহে হাত-পা বেঁধে মারধরের অভিযোগ পাওয়া গেছে। পুলিশ ও স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, একটি স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের কয়েকজন ওই মারধরে অংশ নেন।

সরকারি দাবি, বাস্তবতা ভিন্ন

ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে একাধিকবার মন্তব্য করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদ। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি দেশে ‘মব কালচার শেষ’ এবং আর এ ধরনের ঘটনা ঘটবে না বলে মন্তব্য করেছিলেন।

গত ৩০ মার্চ জাতীয় সংসদেও তিনি বলেন, সরকার বাকস্বাধীনতা ও সংগঠনের অধিকার নিশ্চিত করবে। তবে মবের মাধ্যমে দাবি আদায়ের প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

কিন্তু পরবর্তী কয়েক মাসের ঘটনা এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য সরকারি আশ্বাসের সঙ্গে বাস্তবতার ব্যবধান তুলে ধরছে।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ঢাকা বিভাগে ৩৮টি, চট্টগ্রামে ২৭টি, খুলনায় ১৫টি, রাজশাহীতে ১২টি, বরিশালে ১০টি, ময়মনসিংহে সাতটি এবং রংপুরে চারটি মব সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে।

দায় কি শুধু জনগণের?

পুলিশ সদর দফতরের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘জনগণের মধ্যে আইন নিজ হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা না কমলে মব সহিংসতা বন্ধ করা কঠিন হবে।’

তিনি বলেন, ‘মব ভায়োলেন্স তখনই বন্ধ হবে, যখন জনগণ সচেতন হবে এবং আইন মেনে চলবে। আইন না মানার প্রবণতার কারণে এটি বন্ধ করা কঠিন হচ্ছে। তবে পুলিশ এ বিষয়ে কাজ করছে।’

তিনি আরও বলেন, এমন ঘটনা ঘটলে পুলিশ তাৎক্ষণিক অভিযান চালাচ্ছে, তদন্ত করছে এবং জড়িতদের গ্রেফতার করছে। পুলিশের এ কার্যক্রম চলতে থাকলে একসময় মব কালচার বন্ধ হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

তবে মানবাধিকারকর্মীরা মনে করেন, শুধু জনগণের অসচেতনতার ওপর দায় চাপালে রাষ্ট্রের দায়িত্ব আড়ালে পড়ে যায়। প্রতিটি ঘটনায় দ্রুত মামলা, ডিজিটাল প্রমাণ সংগ্রহ, অভিযুক্তদের শনাক্ত ও গ্রেফতার এবং দৃশ্যমান বিচার নিশ্চিত না হলে অপরাধীরা আরও উৎসাহিত হতে পারে।

হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রতিটি নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তা মৌলিক অধিকার। মব সহিংসতা মানবাধিকার পরিস্থিতি ও সামাজিক সম্প্রীতিকে গুরুতর ঝুঁকিতে ফেলছে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মব ভায়োলেন্স কোনওভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। প্রতিটি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও কঠোর ব্যবস্থা নিশ্চিত না হলে এ ধরনের সহিংসতা আরও বাড়বে।’

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিচারহীনতার ধারণা, রাজনৈতিক ও সামাজিক মেরুকরণ, অসহিষ্ণুতা এবং অনলাইন গুজব—এই চারটি বিষয় মব সহিংসতা বৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি। দ্রুত পুলিশি সাড়া, দৃশ্যমান বিচার, গুজব প্রতিরোধ এবং রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ আইন প্রয়োগ নিশ্চিত না হলে পিটিয়ে হত্যা বিচ্ছিন্ন ঘটনা হয়ে থাকবে না; বরং তা আইনের শাসনের বিপরীতে স্থায়ী সহিংস সংস্কৃতিতে পরিণত হতে পারে।

/জেইউ/ইউএস/
সম্পর্কিত
নাটোরে সড়ক দুর্ঘটনায় ১০ জনের পরিচয় শনাক্ত, তদন্ত কমিটি গঠন
ওভারটেকিং করতে গিয়ে মুখোমুখি সংঘর্ষ, বাসের ভেতরের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা জানালেন যাত্রী
পিরোজপুরে ট্রলারডুবি: বাবার চোখের সামনে প্রাণ গেলো মেয়ের, নিখোঁজ মা
সর্বশেষ খবর
জামায়াত জুলাইকে ধারণ করে না, বিএনপির এমন অভিযোগ হাস্যকর: গোলাম পরওয়ার
জামায়াত জুলাইকে ধারণ করে না, বিএনপির এমন অভিযোগ হাস্যকর: গোলাম পরওয়ার
রংপুরের রাধা গোবিন্দ ধর্মসভা মন্দিরের পূজামণ্ডপে প্রধানমন্ত্রী, ভক্তদের উচ্ছ্বাস
রংপুরের রাধা গোবিন্দ ধর্মসভা মন্দিরের পূজামণ্ডপে প্রধানমন্ত্রী, ভক্তদের উচ্ছ্বাস
‘লুপাস’ রোগে ভুগছেন সেলেনা গোমেজ, বদলে গেছে কণ্ঠ
‘লুপাস’ রোগে ভুগছেন সেলেনা গোমেজ, বদলে গেছে কণ্ঠ
সরকার চায় ঐক্য, কিন্তু একটি মহল ছড়াচ্ছে বিভ্রান্তি : প্রধানমন্ত্রী
সরকার চায় ঐক্য, কিন্তু একটি মহল ছড়াচ্ছে বিভ্রান্তি : প্রধানমন্ত্রী
সর্বাধিক পঠিত
ইশরাকের পদত্যাগের পরই ‘ক্ষমতা’ নিয়ে স্ত্রীর বার্তা
ইশরাকের পদত্যাগের পরই ‘ক্ষমতা’ নিয়ে স্ত্রীর বার্তা
‘পাপের লাশ বাংলাদেশে আসুক তা চাই না’ মন্তব্যের জন্য ক্ষমা চাইলেন এমপি রতন
‘পাপের লাশ বাংলাদেশে আসুক তা চাই না’ মন্তব্যের জন্য ক্ষমা চাইলেন এমপি রতন
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর প্রসঙ্গে যা বললেন জামায়াত আমির
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর প্রসঙ্গে যা বললেন জামায়াত আমির
বাবার চোখ এড়াতে ঢোলা জামা, আড়ালে চলতো শিশুর ওপর নির্যাতন
বাবার চোখ এড়াতে ঢোলা জামা, আড়ালে চলতো শিশুর ওপর নির্যাতন
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড: যা বললেন প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড: যা বললেন প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির