সেনাবাহিনী থেকে বরখাস্ত হওয়া মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানের নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে জলসিঁড়ি আবাসন প্রকল্পে থাকা নয় তলা বাড়ির ভেতরের সম্পদের তালিকা তৈরি শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ভবনটির অষ্টম ও নবম তলা নিয়ে তৈরি করা হয়েছে ডুপ্লেক্স ইউনিট।
জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে করা মামলায় আদালতের আদেশে বাড়িটি আগেই জব্দ করা হয়েছিল। সোমবার (২০ জুলাই) দুদকের একটি দল সেখানে গিয়ে আসবাব, সরঞ্জাম ও অন্যান্য সম্পদের ইনভেন্টরি বা বিস্তারিত তালিকা তৈরির কাজ শুরু করে।
দুদকের সহকারী পরিচালক (জনসংযোগ) তানজির আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “দুদকের উপপরিচালক মো. হাফিজুল ইসলামের নেতৃত্বে একটি দল জলসিঁড়িতে জিয়াউল আহসানের নয়তলা বাড়িতে সম্পদের তালিকা তৈরি করছে।”
তবে বাড়িটির ভেতরে কী ধরনের সম্পদ পাওয়া গেছে, সেগুলোর আনুমানিক মূল্য কত কিংবা তালিকা তৈরির কাজ শেষ হতে কত সময় লাগবে— এসব বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত জানায়নি দুদক।
৩৯ সম্পত্তির মূল্য প্রায় ১৬ কোটি টাকা
আদালতের নথি অনুযায়ী, জিয়াউল আহসান ও তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নামে থাকা ৩৯টি স্থাবর সম্পত্তি ২০২৫ সালের ২৪ এপ্রিল জব্দ করা হয়। জলসিঁড়ি আবাসন প্রকল্পের নয়তলা বাড়িটিও ওই তালিকায় রয়েছে।
দুদকের তদন্ত কর্মকর্তার দেওয়া তফসিলে ৩৯টি স্থাবর সম্পত্তির মোট মূল্য ১৫ কোটি ৭৭ লাখ ৬৫ হাজার ৪৭৭ টাকা দেখানো হয়েছে।
জব্দ সম্পদের মধ্যে ঢাকার দক্ষিণখান, পল্লবী, মিরপুর ডিওএইচএস ও আশুলিয়ার জমি এবং ফ্ল্যাট রয়েছে। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের জলসিঁড়ি, কায়েতপাড়া ও নাওড়া এলাকায় রয়েছে বাড়ি, প্লট ও কৃষিজমি।
এছাড়া বরিশাল সদর ও বাকেরগঞ্জে বাড়ি, বাগানবাড়ি ও জমি; ঝালকাঠিতে বাড়ি, পুকুর ও কৃষিজমি; পটুয়াখালীর কুয়াকাটায় জমি এবং মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখানে কৃষিজমি রয়েছে জব্দের তালিকায়।
দুদকের অনুসন্ধান অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে জিয়াউল আহসান এসব সম্পদ অর্জন করেন। তার সম্পদের মধ্যে পাঁচটি বাড়ি, তিনটি ফ্ল্যাট এবং ৩ হাজার ৩৩৩ দশমিক ৫১ শতাংশ কৃষি ও অকৃষি জমির তথ্য পেয়েছে সংস্থাটি।
সম্পদ বেহাত হওয়ার আশঙ্কায় রিসিভার নিয়োগ
জব্দ সম্পত্তি দেখভালের জন্য রিসিভার বা তত্ত্বাবধায়ক না থাকায় সেগুলো বেহাত কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কার কথা জানিয়ে আদালতে আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও দুদকের উপপরিচালক মো. হাফিজুল ইসলাম।
ওই আবেদনের পর ২০২৬ সালের ২৭ জানুয়ারি ঢাকার মহানগর সিনিয়র স্পেশাল জজ মো. সাব্বির ফয়েজ সম্পত্তিগুলোর নিয়ন্ত্রণ, ব্যবস্থাপনা, তদারকি ও রক্ষণাবেক্ষণে তত্ত্বাবধায়ক নিয়োগের আদেশ দেন।
জলসিঁড়ির নয় তলা বাড়িসহ কয়েকটি সম্পত্তির রিসিভার হিসেবে গণপূর্ত অধিদফতরের প্রধান প্রকৌশলীকে নিয়োগ দেওয়া হয়। তাকে অধীন সংশ্লিষ্ট জেলার নির্বাহী প্রকৌশলীদের দায়িত্ব দেওয়ার অনুমতিও দেন আদালত।
এছাড়া সম্পত্তির অবস্থান অনুযায়ী ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, বরিশাল, পটুয়াখালী, ঝালকাঠি ও মুন্সিগঞ্জের জেলা প্রশাসকদের বিভিন্ন সম্পত্তির তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
আদালতের আদেশে ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার এবং সংশ্লিষ্ট জেলাগুলোর পুলিশ সুপারদের তত্ত্বাবধায়কদের প্রয়োজনীয় আইনগত ও প্রশাসনিক সহযোগিতা দিতে বলা হয়েছে।
আয়-ব্যয়ের হিসাব দিতে হবে আদালতে
তত্ত্বাবধায়কদের দায়িত্ব নেওয়ার দুই মাসের মধ্যে সম্পত্তিগুলোর আয়-ব্যয়ের হিসাব আদালতে দাখিল করতে হবে। সম্পত্তি থেকে কোনও আয় হলে সার্ভিস চার্জ বাদ দিয়ে অবশিষ্ট অর্থ তফসিলি ব্যাংকে জমা দেওয়ার নির্দেশ রয়েছে।
দুর্নীতি দমন কমিশন বিধিমালা, ২০০৭-এর বিধি ১৮(গ)(২) অনুযায়ী, আদায় করা অর্থের আয়-ব্যয়সহ সম্পত্তির সব তথ্য প্রতি ছয় মাস অন্তর দুদকের মাধ্যমে লিখিতভাবে আদালতকে জানাতে হবে।
তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনে বলা হয়, জিয়াউল আহসান তার মালিকানাধীন ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি হস্তান্তরের চেষ্টা করছেন— এমন তথ্য তদন্তকালে পাওয়া যায়। এরপর দুদকের আবেদনে আদালত তার স্থাবর সম্পত্তি জব্দ এবং অস্থাবর সম্পত্তি অবরুদ্ধ করার আদেশ দেন।
দুই মামলায় প্রায় ৪১ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের অভিযোগ
প্রায় ৪০ কোটি ৮৭ লাখ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন এবং ব্যাংক হিসাবে প্রায় ৩৪২ কোটি টাকার অস্বাভাবিক লেনদেনের অভিযোগে ২০২৫ সালের ২৩ জানুয়ারি জিয়াউল আহসান ও তার স্ত্রী নুসরাত জাহানের বিরুদ্ধে পৃথক দুটি মামলা করে দুদক।
এক মামলায় জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়ের উৎসের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ ২২ কোটি ২৭ লাখ ৭৮ হাজার ১৪২ টাকার সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আনা হয়। অনুমোদিত সীমার বেশি ৫৫ হাজার মার্কিন ডলার নিজের হিসাবে রাখার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
দুদক জানায়, জিয়াউল আহসানের নামে থাকা আটটি সক্রিয় ব্যাংক হিসাবে প্রায় ১২০ কোটি টাকার অস্বাভাবিক লেনদেন হয়েছে। স্ত্রী নুসরাত জাহানের সহযোগিতা ও যোগসাজশে ওই অর্থ বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামে স্থানান্তর, হস্তান্তর ও রূপান্তর করা হয়েছে বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়।
অন্য মামলায় নুসরাত জাহানের বিরুদ্ধে ১৮ কোটি ৫৯ লাখ ৩১ হাজার ৩৫৮ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আনা হয়েছে। তার চারটি সক্রিয় ব্যাংক হিসাবে প্রায় ২২২ কোটি ৫০ লাখ টাকার অস্বাভাবিক লেনদেনের তথ্য পাওয়ার কথাও জানিয়েছে দুদক।
জিয়াউল আহসান জাতীয় টেলিযোগাযোগ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের (এনটিএমসি) মহাপরিচালক ছিলেন। ২০২৪ সালের আগস্টে তাকে সেনাবাহিনীর চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়। পরে রাজধানীর নিউ মার্কেট থানায় করা একটি হত্যা মামলায় তাকে গ্রেফতার করা হয়। বর্তমানে তিনি কারাগারে রয়েছেন।