সাবেক মন্ত্রীর ফ্ল্যাটের তালা খুলে দেড় হাজারের বেশি দামি জিনিস পেলো দুদক

বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট 
২০ জুলাই ২০২৬, ২০:২২আপডেট : ২০ জুলাই ২০২৬, ২০:৪৭

একটি কালো স্যুটকেসের ভেতরে ১০২টি টাই। একই ফ্ল্যাটের আলমারি ও ওয়ার্ডরোবে আরও ২৭৬টি। পাশের ফ্ল্যাটে পাওয়া গেছে আরও ১৫৪টি টাই। দুই ফ্ল্যাট মিলিয়ে শুধু টাইয়ের সংখ্যাই ৫৩২। সঙ্গে রয়েছে ১৯৩টি স্যুট, পাঁচটি ওভারকোট, ৫৩টি প্যান্ট, ৯১টি শার্ট, ১৩টি পাঞ্জাবি এবং ১০০টি ব্যবহৃত সালোয়ার-কামিজ।  

সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদের রাজধানীর গুলশানের দুটি ফ্ল্যাটে দুই দিন ধরে তালিকা তৈরির কার্যক্রম চালিয়ে এসব পোশাকসহ দেড় হাজারের বেশি বিলাসবহুল ও গৃহস্থালি সামগ্রী তালিকাভুক্ত করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। আদালতের নির্দেশে ফ্ল্যাট দুটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর সেখানে থাকা প্রতিটি কক্ষের মালামালের ধরন, সংখ্যা ও বিবরণ নথিভুক্ত করা হয়েছে।  

দুদকের প্রাথমিক হিসাবে, গুলশান-২-এর ৬৬ নম্বর সড়কের নর্থওয়েস্ট (বি) ব্লকের ১১ নম্বর প্লটে অবস্থিত এ-৭ ও বি-৭ নম্বর ফ্ল্যাটে ২৬৯ ধরনের পণ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে এ-৭ নম্বর ফ্ল্যাটে প্রায় ১ হাজার ১৩৫টি এবং বি-৭ নম্বর ফ্ল্যাটে প্রায় ৪০০টি সামগ্রী রয়েছে। সব মিলিয়ে সংখ্যা ১ হাজার ৫৩৫।  

কক্ষভিত্তিক তালিকার নথিতে দুই ফ্ল্যাটের মালামাল ২৬০টি ক্রমিক এন্ট্রিতে তোলা হয়েছে। তবে অনেক এন্ট্রিতে একাধিক ধরনের এবং বিপুল সংখ্যক পণ্য রয়েছে। প্রতিটি কক্ষের প্রথম পণ্যটির সঙ্গে আলোকচিত্র সংযুক্ত থাকার কথাও নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে। 

রবিবার ও সোমবার (১৯ ও ২০ জুলাই) দুদকের উপপরিচালক মো. মশিউর রহমানের নেতৃত্বে অনুসন্ধানী দলটি ফ্ল্যাট দুটিতে তালিকা তৈরির কার্যক্রম পরিচালনা করে। দুদকের কর্মকর্তা, সম্পদ ব্যবস্থাপনা ইউনিটের প্রতিনিধি, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, গুলশান থানার পুলিশ, ভবনের ব্যবস্থাপক ও নিরাপত্তারক্ষীদের উপস্থিতিতে এই তালিকা তৈরি করা হয়। 

দুদকের সহকারী পরিচালক (জনসংযোগ) তানজির আহমেদ সোমবার জানান, আদালতের নির্দেশনা অনুসারে দুই দিন ধরে ফ্ল্যাট দুটির মালামালের তালিকা তৈরি করা হয়েছে। সেখানে বিপুল পরিমাণ মালামাল পাওয়া গেছে এবং প্রাথমিকভাবে ২৬৯ ধরনের পণ্য নথিভুক্ত হয়েছে। 

স্যুটকেসেও ১০২ টাই 

তালিকার সবচেয়ে নজরকাড়া অংশ হচ্ছে পোশাক ও ব্যক্তিগত ব্যবহার্য সামগ্রী। এ-৭ নম্বর ফ্ল্যাটের একটি কক্ষে থাকা কালো রঙের স্যুটকেসের মধ্যে ১০২টি টাই পাওয়া যায়। একই কক্ষের আলমারি ও অন্যান্য স্থানে তালিকাভুক্ত হয়েছে আরও ২৭৬টি টাই। 

এ-৭ ফ্ল্যাটে আরও পাওয়া গেছে ৫৩টি স্যুট, ৫৩টি প্যান্ট, ৯১টি শার্ট, ১৩টি পাঞ্জাবি, ১২টি ঢিলেঢালা প্যান্ট, তিনটি পুরুষদের ও দুটি নারীদের ওভারকোট। আরেকটি কক্ষে ছিল ৪০টি ব্যবহৃত সালোয়ার-কামিজ। 

অপরদিকে বি-৭ নম্বর ফ্ল্যাটের একটি শয়নকক্ষের দুটি ওয়াল কেবিনেটে ১৪০টি স্যুট সংরক্ষিত ছিল। একই কক্ষে পাওয়া যায় ১৫৪টি টাই। সে হিসাবে দুই ফ্ল্যাটে টাইয়ের মোট সংখ্যা ৫৩২ এবং স্যুট ১৯৩টি।  

ঘড়ির বাক্সে রোলেক্স থেকে ব্রেগে 

এ-৭ ফ্ল্যাটের তালিকায় বিশ্বের একাধিক বিলাসবহুল ঘড়ির ব্র্যান্ডের বাক্সের উল্লেখ রয়েছে। কক্ষভিত্তিক তালিকা অনুযায়ী, অডেমার পিগের একটি খালি বাক্স, ভ্যাশেরন কনস্টান্টিনের একটি বাক্স, রোলেক্সের চারটি খালি বাক্স এবং আরেকটি রোলেক্স বাক্সে একটি অব্যবহৃত ঘড়ি পাওয়া গেছে। 

এছাড়া এলইউসির একটি, পারমিজিয়ানি ফ্লুরিয়েরের একটি, জ্যাগার-লেকুলত্রের দুটি এবং ব্রেগের একটি খালি ঘড়ির বাক্স নথিভুক্ত হয়েছে। সব মিলিয়ে পৃথকভাবে অন্তত ১২টি ঘড়ির বাক্স বা খালি বাক্সের হিসাব পাওয়া যায়। তবে এসব বাক্সের অধিকাংশের সঙ্গে ঘড়ি পাওয়া যায়নি।  

তালিকায় ঘড়ির ওয়ারেন্টি কার্ড ও ম্যানুয়ালেরও উল্লেখ রয়েছে। দুদক সূত্র জানিয়েছে, পাওয়া ক্রয়রসিদ ও নথি অনুযায়ী রোলেক্সের সংশ্লিষ্ট মডেলগুলোর প্রতিটির মূল্য ১৪ হাজার থেকে ১৭ হাজার ৫০০ মার্কিন ডলার পর্যন্ত হতে পারে। তবে বাক্স পাওয়া গেলেই সংশ্লিষ্ট ঘড়ি ফ্ল্যাটে ছিল— এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। পণ্য, ক্রয়রসিদ, মডেল ও সিরিয়াল নম্বর মিলিয়ে দেখা হবে।  

প্রথম দিনের প্রাথমিক ব্রিফিংয়ে তিন শতাধিক কোট, শতাধিক কামিজ এবং আটটি ঘড়ির বাক্সে চারটি রোলেক্স ঘড়ির কথা বলা হয়েছিল। তবে দুই দিনের শেষে প্রস্তুত বিস্তারিত নথিতে ১৯৩টি স্যুট, পাঁচটি ওভারকোট, ৪০টি ব্যবহৃত সালোয়ার-কামিজ এবং বিভিন্ন ব্র্যান্ডের অন্তত ১২টি ঘড়ির বাক্সের উল্লেখ রয়েছে। 

মুক্তার মালা, ডিজাইনার পণ্য ও বিলাসী সাজসজ্জা 

তালিকায় তিনটি মুক্তার মালা, ‘বোর্নিও পার্লস’ লেখা সামগ্রী এবং আলেকজান্ডার ম্যাককুইন ব্র্যান্ডের জুতা পাওয়া গেছে। রয়েছে ভার্সাচের শপিং ব্যাগ, ডিজাইনার পোশাক ও বিভিন্ন ব্র্যান্ডের খালি প্যাকেট ও বাক্স।  

ফ্ল্যাট দুটির বিভিন্ন কক্ষে বড় আকারের টেলিভিশন, শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র, ফ্রিজ, মাইক্রোওয়েভ ওভেন, ওয়াশিং মেশিন, ট্রেডমিল, সাউন্ড সিস্টেম, স্পিকার, সিলিং ফ্যান ও ইলেকট্রনিকস সামগ্রী পাওয়া গেছে। 

আসবাবের মধ্যে রয়েছে ইতালিয়ান বেডরুম সেট, একাধিক খাট, সোফা, ডাইনিং টেবিল, কনসোল টেবিল, চেয়ার, আলমারি, ওয়ার্ডরোব ও দেয়াল আয়না। এছাড়া ঝাড়বাতি, দেয়ালচিত্র, ভাস্কর্য, শোপিস, গলফ স্টিক, লাগেজ এবং বিপুল পরিমাণ রান্নাঘরের বাসন-কোসনও তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। 

দুদক এখনও এসব সামগ্রীর মোট বাজারমূল্য নির্ধারণ করেনি। মূল্যায়নের পর পণ্যের মালিকানা, ক্রয়কাল, অর্থের উৎস এবং চলমান মামলার অভিযোগের সঙ্গে এগুলোর কোনও সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা যাচাই করা হবে। ইনভেন্টরিতে কোনও পণ্য তালিকাভুক্ত হওয়া মাত্রই সেটি অবৈধ সম্পদ হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে— এমনটি নয়। এ বিষয়ে তদন্ত এবং আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। 

যেভাবে ফ্ল্যাটে প্রবেশের পথ খুললো  

এ-৭ নম্বর ফ্ল্যাটটির আয়তন ৩ হাজার ৭৪৭ বর্গফুট এবং বি-৭ নম্বর ফ্ল্যাটের আয়তন ৩ হাজার ৮৩২ বর্গফুট। দুই ফ্ল্যাটের মোট আয়তন ৭ হাজার ৫৭৯ বর্গফুট। ২০২৫ সালের ১৮ নভেম্বর ঢাকা মহানগর জ্যেষ্ঠ বিশেষ জজ আদালত ফ্ল্যাট দুটি ক্রোকের আদেশ দেন।  

ফ্ল্যাট দুটি তালাবদ্ধ থাকায় সেখানে থাকা মালামাল নথিভুক্ত করা সম্ভব হচ্ছিল না। পরে দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৬ সালের ২৯ এপ্রিল আদালত রিসিভারকে ফ্ল্যাটে প্রবেশ এবং মালামালের ইনভেন্টরি তৈরির জন্য একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগের নির্দেশ দেন। 

ফ্ল্যাট দুটির নিয়ন্ত্রণ, ব্যবস্থাপনা, তদারকি ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য দুদকের সম্পদ ব্যবস্থাপনা ইউনিটের পরিচালককে রিসিভার বা তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। ইনভেন্টরি কার্যক্রমে দায়িত্ব পালনের জন্য গুলশান রাজস্ব সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. নিলয় রহমানকে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট করা হয়। ২ জুলাই দুদকের স্মারক জারির ধারাবাহিকতায় ১৯ জুলাই ফ্ল্যাটে প্রবেশ করে তালিকা তৈরির কাজ শুরু হয়। 

বিদেশে সম্পদ নিয়ে একাধিক আদেশ 

সাইফুজ্জামান চৌধুরীর সম্পদ ও আর্থিক লেনদেন নিয়ে দুদকের একাধিক অনুসন্ধান ও মামলার তদন্ত চলছে। এসব মামলার কয়েকটিতে তার স্ত্রী ও ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান রুকমিলা জামান, তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী এবং ইউসিবির একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীকে আসামি করা হয়েছে। অভিযোগগুলো এখনও বিচারাধীন। 

গত ২৬ ফেব্রুয়ারি আদালত সাইফুজ্জামানের নামে যুক্তরাজ্যে থাকা ৫১৮টি ফ্ল্যাট ও অ্যাপার্টমেন্ট ক্রোকের নির্দেশ দেন। এর আগে ১৩ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ আট দেশে থাকা ৩৩০টি বাড়ি, ফ্ল্যাট ও অ্যাপার্টমেন্ট জব্দ এবং যুক্তরাষ্ট্রে তার নামে থাকা দুটি কোম্পানির বিনিয়োগ অবরুদ্ধ করার আদেশ দেওয়া হয়। আদালতে উপস্থাপিত দুদকের হিসাবে এসব সম্পদ ও বিনিয়োগের মোট মূল্য প্রায় ২ হাজার ৩২০ কোটি ৯২ লাখ টাকা। 

/জেইউ/এসটি/এমওএফ/
সম্পর্কিত
দেড় মাসে জলে গেলো ৫২৭ কোটি, কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন
কাজে আসেনি ৪০ কোটি টাকা, চুরি হয়ে গেছে সরকারের কোটি টাকার যন্ত্রপাতি
জিয়াউল আহসানের জলসিঁড়ির নয় তলা বাড়িতে কী আছে, তালিকা করছে দুদক 
সর্বশেষ খবর
কুয়েত ও বাহরাইনে মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের দফায় দফায় হামলা, সামরিক সরঞ্জাম ধ্বংসের দাবি
কুয়েত ও বাহরাইনে মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের দফায় দফায় হামলা, সামরিক সরঞ্জাম ধ্বংসের দাবি
দাদি-নানিদের শখে ফিরছে তরুণ প্রজন্ম
দাদি-নানিদের শখে ফিরছে তরুণ প্রজন্ম
অডিওবুক শুনুন, বইয়ের জগতে ফিরে আসুন
অডিওবুক শুনুন, বইয়ের জগতে ফিরে আসুন
একজনকে বাঁচাতে গিয়ে মারা গেলেন মা-মেয়েসহ ৩ জন
একজনকে বাঁচাতে গিয়ে মারা গেলেন মা-মেয়েসহ ৩ জন
সর্বাধিক পঠিত
পরবর্তী ২০৩০ ফিফা বিশ্বকাপের আয়োজক কারা, জেনে নিন সূচি ও নতুন ফরম্যাট
পরবর্তী ২০৩০ ফিফা বিশ্বকাপের আয়োজক কারা, জেনে নিন সূচি ও নতুন ফরম্যাট
সাবান-আইসক্রিমসহ চার প্রতিষ্ঠানের ৮ পণ্য বাজার থেকে প্রত্যাহারের নির্দেশ 
সাবান-আইসক্রিমসহ চার প্রতিষ্ঠানের ৮ পণ্য বাজার থেকে প্রত্যাহারের নির্দেশ 
মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানো ৪৯ রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স প্রত্যাহার
মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানো ৪৯ রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স প্রত্যাহার
মিত্রদের নিয়ে সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রীর নৈশভোজ: কারা যাচ্ছেন, কারা যাচ্ছেন না
মিত্রদের নিয়ে সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রীর নৈশভোজ: কারা যাচ্ছেন, কারা যাচ্ছেন না
ছাত্রনেতা থেকে যেভাবে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খাঁন
ছাত্রনেতা থেকে যেভাবে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খাঁন