রাজধানীর মতিঝিল মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে ছাতার ভেতরে বিশেষ কায়দায় লুকানো অবস্থায় একটি পাইপ বোমা (আইইডি) উদ্ধারের ঘটনায় নাশকতার আশঙ্কা দেখছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তাদের ধারণা, সনাতন ধর্মাবলম্বীদের উল্টোরথের শোভাযাত্রাকে লক্ষ্য করে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি ও বড় ধরনের নাশকতার উদ্দেশ্যে পূর্বপরিকল্পিতভাবে বিস্ফোরকটি সেখানে রাখা হয়েছিল। আনসার সদস্যদের সতর্কতায় ডিভাইসটি আগেই শনাক্ত হওয়ায় সম্ভাব্য বড় দুর্ঘটনা এড়ানো গেছে।
তবে কে বা বোমাটি কারা রেখেছে, তা এখনও নিশ্চিত হতে পারেনি পুলিশ। ঘটনাস্থল ও আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে সন্দেহভাজনদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে।
আতঙ্ক এড়াতে বলা হয় ‘শর্ট সার্কিট’
শুক্রবার (২৪ জুলাই) সন্ধ্যায় ঢাকেশ্বরী মন্দির থেকে শুরু হওয়া উল্টোরথের শোভাযাত্রা মতিঝিলের শাপলা চত্বর হয়ে স্বামীবাগ আশ্রমে যাওয়ার কথা ছিল। শোভাযাত্রা ঘটনাস্থলের কাছাকাছি পৌঁছানোর আগেই মতিঝিল মেট্রোরেল স্টেশনের গ্রাউন্ড ফ্লোরে দায়িত্বরত আনসার প্লাটুন কমান্ডার (এপিসি) মো. রোকনুজ্জামান জেনারেটর কক্ষের পাশে রাখা একটি ছাতার ভেতরে বোমাসদৃশ বস্তু দেখতে পান। তিনি স্টেশন কন্ট্রোলারকে জানান, ছাতার ভেতর থেকে মিটমিট করে আলো জ্বলছিল।
খবর পেয়ে মতিঝিল থানা-পুলিশ, মেট্রোরেল পুলিশ ও আনসার সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থল ঘিরে ফেলেন। এরই মধ্যে উল্টোরথের শোভাযাত্রা ঘটনাস্থলের কাছে পৌঁছে যায়। শোভাযাত্রায় অংশ নেওয়া মানুষের মধ্যে আতঙ্ক এড়াতে পুলিশ বোমার বিষয়টি গোপন রেখে সেখানে ‘শর্ট সার্কিট’ হয়েছে বলে জানায় এবং অংশগ্রহণকারীদের স্থানটি পাশ কাটিয়ে যেতে বলে।
পুলিশের নির্দেশনায় শোভাযাত্রা শাপলা চত্বর হয়ে স্বামীবাগ আশ্রমের দিকে চলে যাওয়ার পর ডিএমপির বোমা নিষ্ক্রিয়করণ দল ডিভাইসটি পরীক্ষা করে নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণের মাধ্যমে সেটি নিষ্ক্রিয় করে।
ছাতা খুললেই হতো বিস্ফোরণ
ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের বোমা নিষ্ক্রিয়করণ দলের এক কর্মকর্তা জানান, ছাতার ভেতরে রাখা বস্তুটি ছিল একটি পাইপ বোমা বা ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস (আইইডি)।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, ডিভাইসটির ভেতরে প্রায় দেড় কেজি সালফারজাতীয় বিস্ফোরক উপাদান ছিল। এর সঙ্গে তারকাঁটা, বেয়ারিং বল ও ধারালো লোহার টুকরো রাখা হয়। ব্যাটারি ও বৈদ্যুতিক সার্কিটের সঙ্গে ছাতার বোতাম সংযুক্ত করা ছিল। কেউ ছাতাটি খোলার জন্য বোতাম চাপলেই ডিভাইসটি বিস্ফোরিত হতো। বিস্ফোরণের পর বেয়ারিং বল, তারকাঁটা ও লোহার টুকরো স্প্লিন্টার হিসেবে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে আশপাশে থাকা মানুষের প্রাণহানির বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারতো।
ঘটনাস্থল থেকে জিআই পাইপের খণ্ডিত অংশ, ব্যাটারি, বেয়ারিং বল এবং বৈদ্যুতিক সার্কিটের বিভিন্ন অংশ উদ্ধার করে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে।
আহত পথচারী হাসপাতালে
বোমাটি নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণের মাধ্যমে নিষ্ক্রিয় করার সময় মিরাজ আহমেদ (৬৬) নামে এক পথচারী আহত হন। তিনি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মচারী।
পুলিশ জানায়, বিস্ফোরণের একটি স্প্লিন্টার তার বাম চোখে লাগে। প্রথমে তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য আগারগাঁওয়ের জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে পাঠানো হয়।
নাশকতার পরিকল্পনার অভিযোগে মামলা
ঘটনার পর মতিঝিল থানায় বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামি করে একটি মামলা করা হয়েছে। থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মির্জা মোহাম্মদ মুক্তা মামলাটির বাদী।
মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, ঘটনার দিন তিনি উল্টোরথের নিরাপত্তায় ‘হোন্ডা মোবাইল’ কল সাইনে দায়িত্ব পালন করছিলেন। সন্ধ্যায় ট্রাফিক বিভাগ থেকে ডিএমপির নিয়ন্ত্রণকক্ষে মতিঝিল মেট্রোস্টেশনের নিচে বোমাসদৃশ বস্তু পড়ে থাকার খবর আসে।
ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশে সন্ধ্যা ৬টা ২০ মিনিটের দিকে তিনি ও তার সহকর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে ছাতার ভেতরে রাখা বস্তুটির চারপাশে নিরাপত্তাবেষ্টনী তৈরি করেন।
এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে, সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা, জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি এবং মানুষের জীবন বিপন্ন করার উদ্দেশ্যে পূর্বপরিকল্পিতভাবে বোমাটি সেখানে রাখা হয়েছিল।
তবে বোমাটি কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা সংগঠন রেখেছে কি না, সে বিষয়ে এজাহারে সুনির্দিষ্ট তথ্য উল্লেখ করা হয়নি।
‘মোটামুটি শক্তিশালী’ ছিল ডিভাইসটি
সিটিটিসির বোমা নিষ্ক্রিয়করণ দলের উপকমিশনার মো. জাহেদ পারভেজ চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা আলামত পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। পরীক্ষা শেষ হলে ডিভাইসটির প্রকৃতি, বিস্ফোরক উপাদান ও সক্ষমতা সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে বলা যাবে। তবে প্রাথমিকভাবে এটি মোটামুটি শক্তিশালী ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, কারা বোমাটি তৈরি করেছে এবং ঘটনাস্থলে রেখে গেছে, তা জানতে তদন্ত চলছে। এ জন্য ঘটনাস্থল ও আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে সন্দেহভাজনদের গতিবিধি বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।
মেট্রোস্টেশনের বাইরে এমআরটি পুলিশের ক্যামেরা নেই
মেট্রোরেল পুলিশের ডিআইজি সিদ্দিকী তানজিলুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, প্রাথমিকভাবে বোমাটি নাশকতার উদ্দেশ্যেই রাখা হয়েছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ঘটনার মূল তদন্ত করছে ডিএমপি ও সিটিটিসি।
তিনি বলেন, মেট্রোস্টেশনের গেটের বাইরের অংশে এমআরটি পুলিশের কোনো কার্যক্রম বা সিসিটিভি ক্যামেরা নেই। ওই এলাকার নিরাপত্তা ও সিসিটিভি ব্যবস্থাপনা ডিএমপির অধীনে। এমআরটি পুলিশের ক্যামেরা রয়েছে মেট্রোস্টেশনের দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলায়।
ফলে বোমাটি কে বা কারা সেখানে রেখে গেছে, তা শনাক্ত করতে আশপাশের ভবন, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও সড়কের সিসিটিভি ফুটেজের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে তদন্তকারীদের।
এখনও শনাক্ত হয়নি জড়িতরা
ডিএমপির মতিঝিল বিভাগের উপকমিশনার মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, বোমা উদ্ধারের ঘটনায় মামলা হয়েছে। থানা-পুলিশের পাশাপাশি সিটিটিসিসহ সংশ্লিষ্ট ইউনিটগুলো তদন্ত করছে।
তিনি বলেন, ‘ঘটনাস্থল ও আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। কারা বোমাটি সেখানে রেখে গেছে, তা শনাক্তের চেষ্টা চলছে।’
ঘটনার সঙ্গে কোনো উগ্রবাদী সংগঠন, রাজনৈতিক গোষ্ঠী কিংবা ব্যক্তিবিশেষ জড়িত কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এখনই সুনির্দিষ্টভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না। তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কারও সম্পৃক্ততার বিষয়ে মন্তব্য করা ঠিক হবে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘সিটিটিসি বোমার আলামত পরীক্ষা করছে। আলামতের ফরেনসিক বিশ্লেষণ এবং সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা শেষে ঘটনার বিস্তারিত জানা সম্ভব হবে।’
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, জনসমাগমের মধ্যে ডিভাইসটি বিস্ফোরিত হলে ব্যাপক হতাহতের আশঙ্কা ছিল। বিশেষ করে উল্টোরথের শোভাযাত্রা ঘটনাস্থল অতিক্রম করার সময় বিস্ফোরণ ঘটলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারত।
তাদের মতে, আনসার সদস্যদের সতর্কতা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দ্রুত পদক্ষেপে সম্ভাব্য বড় বিপর্যয় এড়ানো গেলেও রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ ও জনবহুল এলাকায় এমন বিস্ফোরক ডিভাইস কীভাবে রাখা হলো, তা দ্রুত খতিয়ে দেখা জরুরি।