দুবাইয়ে গ্রেফতার হওয়া পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক বেনজীর আহমেদকে দ্রুত দেশে ফেরানোর আশা দেখিয়েছিল সরকার। নির্ধারিত সময়ের আগেই পাঠানো হয়েছিল প্রয়োজনীয় নথি। কিন্তু শর্তসাপেক্ষ জামিনে তার মুক্তি সেই প্রত্যাশায় নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
বেনজীর এখন কারাগারের বাইরে। তবে পুরোপুরি মুক্ত নন। তার পাসপোর্ট আদালতের হেফাজতে রয়েছে বলে জানা গেছে। আদালতের অনুমতি ছাড়া তিনি সংযুক্ত আরব আমিরাত-ইউএই ত্যাগ করতে পারবেন না। অর্থাৎ দেশটির বিচারিক নিয়ন্ত্রণের মধ্যেই আছেন তিনি। কিন্তু সেই নিয়ন্ত্রণই তাকে বাংলাদেশে ফেরানোর নিশ্চয়তা দিচ্ছে না।
সরকারের সামনে এখন দুটি পৃথক আইনি লড়াই—একটি তার জামিন বাতিলের। অন্যটি প্রত্যর্পণের। প্রথমটিতে সাফল্য এলেও দ্বিতীয়টি নিশ্চিত হবে না। বেনজীরকে দেশে ফেরাতে তাই শুধু রাজনৈতিক সদিচ্ছা নয়, ইউএই আদালতে শক্ত প্রমাণ, গ্রহণযোগ্য নথি এবং দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের প্রস্তুতিও প্রয়োজন।
বেনজীরের জামিন বাতিলের জন্য ইউএইতে একটি স্থানীয় ল ফার্ম নিয়োগ করেছে সরকার। এরইমধ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। প্রতিষ্ঠানটিকে দুবাই আদালতে জামিন বাতিলের আবেদন অনুসরণ করার নির্দেশও দিয়েছেন তিনি। তবে কোন ল ফার্মকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তা প্রকাশ করা হয়নি। প্রতিষ্ঠানটি কী প্রক্রিয়ায় বাছাই করা হয়েছে, চুক্তির মেয়াদ কতদিন এবং কত টাকা ফি দিতে হবে—এসব তথ্যও জানা যায়নি।
চুক্তিটি শুধু জামিন বাতিলের জন্য কিনা—উচ্চতর আদালতে আপিল, নথির আরবি অনুবাদ এবং ইউএই কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আইনি যোগাযোগের দায়িত্ব একই প্রতিষ্ঠান পালন করবে কিনা—তারও কোনও তথ্য পাওয়া যায়নি। বিদেশি ল ফার্মের ফি কোন মন্ত্রণালয় বহন করবে এবং মোট ব্যয়ের পরিমাণ কত, তাও জানা যায়নি।
আদেশ না পেয়েই বাতিলের উদ্যোগ
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, বেনজীরের জামিনের খবর তিনি প্রথমে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানতে পারেন। এরপর স্বরাষ্ট্র সচিবকে ইউএইতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে কথা বলতে বলেন। জামিন আদেশের প্রত্যয়িত অনুলিপি সংগ্রহের নির্দেশও দেন।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, “কয়েক দিন আগেই আমরা ল ফার্ম নিয়োগ করেছি, শুধু এই বিষয়টার জন্য। তাকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, বেইল ক্যানসেলেশনের জন্য সে পার্সিউ করবে।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা আশা করছি বেইল ক্যানসেল করতে এবং দ্রুত সময়ের মধ্যে তাকে ফেরত নিতে পারবো।”
কিন্তু জামিন আদেশের প্রত্যয়িত কপি হাতে না থাকায় আদালত ঠিক কোন বিবেচনায় তাকে মুক্তি দিয়েছে, তা এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে জানা যায়নি। জামিনের সব শর্তও নিশ্চিত নয়। ফলে কোন আইনি যুক্তিতে জামিন বাতিল চাওয়া হবে, সেটিও পরিষ্কার করেনি সরকার।
কেন গ্রেফতার হলেন বেনজীর
গত ১২ জুন দুবাই পুলিশ বেনজীর আহমেদকে গ্রেফতার করে। একই দিন ইউএইর ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো-এনসিবি আবুধাবি ই-মেইলে বাংলাদেশকে বিষয়টি জানায়।
বাংলাদেশের অনুরোধে ইন্টারপোল ২০২৫ সালের ১১ এপ্রিল তার বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারি করেছিল। ঢাকার আদালতের গ্রেফতারি পরোয়ানা এবং দুদকের করা মামলার তথ্যের ভিত্তিতে ওই নোটিশ দেওয়া হয়। পরে রেড নোটিশের ভিত্তিতে ইউএই কর্তৃপক্ষ তাকে আটক করে।
রেড নোটিশে বেনজীরকে বিচার মোকাবিলার জন্য পলাতক ব্যক্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়। সেখানে তার বিরুদ্ধে ২ কোটি ৬২ লাখ টাকার সম্পদের তথ্য গোপন এবং পরিচিত আয়ের উৎসের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ ৯ কোটি ৪৪ লাখ টাকার সম্পদ অর্জনের অভিযোগের কথা বলা হয়।
দুদকের মামলায় আরও অভিযোগ করা হয়, ক্ষমতা ও প্রভাব ব্যবহার করে তিনি অবৈধ সম্পদ অর্জন ও অর্থপাচার করেছেন। এ মামলাটির বিচার চলমান রয়েছে।
বেনজীরের বিরুদ্ধে পৃথক পাসপোর্ট জালিয়াতির মামলা আছে। অভিযোগ, সরকারি কর্মকর্তা থাকাকালে তিনি পাসপোর্টের আবেদনে নিজেকে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী হিসেবে পরিচয় দেন। প্রয়োজনীয় বিভাগীয় অনাপত্তিপত্র ছাড়াই একাধিক পাসপোর্ট গ্রহণ করেন।
তিন দিনের মধ্যে নথি
বেনজীরকে গ্রেফতারের পর ইউএই কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ আবেদন পাঠানোর জন্য ৩০ দিন সময় দিয়েছিল। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, সরকার মাত্র তিন দিনের মধ্যেই প্রয়োজনীয় নথি পাঠিয়ে দিয়েছে।
গত ১৬ জুলাই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন, বেনজীরকে ফেরাতে আইনে প্রয়োজনীয় সব কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। বাংলাদেশ এখন ইউএই সরকারের জবাবের অপেক্ষায় রয়েছে।
কিন্তু প্রত্যর্পণ নথির ওপর উভয়পক্ষের বক্তব্য শোনার পর ২৭ জুলাই দুবাইয়ের একটি আদালত বেনজীরকে শর্তসাপেক্ষ জামিন দেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা গেছে। প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে ৩০ জুলাই তিনি কারাগার থেকে মুক্তি পান।
যেসব শর্তে জামিন
সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, বেনজীরের পাসপোর্ট আদালতের হেফাজতে থাকবে। আদালতের পূর্বানুমতি ছাড়া তিনি ইউএই ত্যাগ করতে পারবেন না। তার বিদেশযাত্রার ওপরও নিষেধাজ্ঞা বহাল রয়েছে।
তবে দুবাই আদালত বা ইউএই কর্তৃপক্ষ জামিনের বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনও আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেয়নি। এ কারণে বাংলাদেশ সরকারের কাছেও এ বিষয়ে পরিষ্কার কোনও তথ্য নেই। ফলে পাসপোর্ট জমা ও দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞার বাইরে অন্য কোনও শর্ত রয়েছে কিনা, তা নিশ্চিত নয়।
দুদকও জেনেছে গণমাধ্যমে
বেনজীরের মুক্তির খবর দুদকও প্রথমে গণমাধ্যম থেকে জানতে পারে। সংস্থাটির মহাপরিচালক মীর মোহাম্মদ জয়নুল আবেদীন শিবলী সাংবাদিকদের বলেন, “আপনারা যেভাবে মিডিয়ার, পত্রপত্রিকার মাধ্যমে জেনেছেন, আমরাও জেনেছি। আইনি যে পদক্ষেপ নেওয়া দরকার, সংশ্লিষ্ট বিভাগ নেবে।”
দুদকের কোনও গাফিলতি ছিল কিনা—এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, “আমার মনে হয় না। আমাদের এখান থেকে যা যা করা দরকার, যা পাঠানো দরকার, আমরা সব করেছি।”
তার ভাষ্য অনুযায়ী, আন্তদেশীয় আইনি সহায়তার ক্ষেত্রে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ। দুদক প্রয়োজনীয় নথি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে। সেখান থেকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে তা ইউএইতে গেছে। তবে কী কারণে বেনজীরকে জামিন দেওয়া হয়েছে, তা না জেনে মন্তব্য করতে অপারগতা জানান তিনি।
জামিন বাতিল হলেই ফেরত নয়
বেনজীরের জামিন বাতিল হলে তাকে আবারও হেফাজতে নেওয়া হতে পারে। এতে তার অবস্থান ও চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হবে। কিন্তু তাতেই তাকে দেশে ফেরানো নিশ্চিত হবে না।
জামিন ও দেশে ফিরিয়ে আনা দুটি আলাদা বিচারিক বিষয়। বেনজীরকে ফিরিয়ে আনতে হলে ইউএই আদালতে সরকারের পাঠানো অভিযোগ, গ্রেফতারি পরোয়ানা ও সাক্ষ্যপ্রমাণের গ্রহণযোগ্যতা বাংলাদেশকেই প্রতিষ্ঠা করতে হবে। বেনজীরের আইনজীবীরা তাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর প্রশ্নে বিরোধিতা করতে পারবেন। প্রতিকূল সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে উচ্চতর আদালতেও যেতে পারবেন। ফলে আইনি প্রক্রিয়া কতদিন চলবে, তা এখনই বলা কঠিন। তবে সরকার আশাবাদী।