সংযুক্ত আরব আমিরাতে গ্রেফতার পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদ জামিনে মুক্তি পেয়েছেন— এমন খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলেও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনও তথ্য পায়নি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তবে তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার আইনি প্রক্রিয়ায় দুদকের কোনও গাফিলতি ছিল না বলেও দাবি করেছে সংস্থাটি।
রবিবার (২ আগস্ট) বিকালে দুদক কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে সংস্থাটির মহাপরিচালক মীর মো. জয়নুল আবেদীন শিবলী এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, ‘‘বেনজীর আহমেদের মুক্তির বিষয়টি আমরা পত্রপত্রিকার মাধ্যমে জেনেছি। আনুষ্ঠানিকভাবে এখনও কোনও তথ্য পাইনি। আইনগতভাবে যা যা করা প্রয়োজন, দুদক তা করবে।’’
বেনজীরকে বাংলাদেশে ফেরানোর প্রক্রিয়ায় বিলম্ব বা গাফিলতি ছিল কিনা— এমন প্রশ্নের জবাবে দুদকের মহাপরিচালক বলেন, ‘‘এ-সংক্রান্ত কাজে সংস্থাটির কোনও গাফিলতি ছিল না।’’
গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত ২৭ জুলাই সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি আদালত বেনজীর আহমেদের জামিন আবেদন মঞ্জুর করেন। প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া শেষে ৩০ জুলাই তিনি কারামুক্ত হন। তবে তার মুক্তির বিষয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাত কিংবা সংশ্লিষ্ট কোনও কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে দুদক আনুষ্ঠানিক বার্তা পায়নি বলে জানিয়েছে।
৩০ দিনের মধ্যে আমিরাতে আবেদন পাঠিয়েছিল ঢাকা
দুর্নীতির মামলায় অভিযুক্ত বেনজীর আহমেদ সংযুক্ত আরব আমিরাতে গ্রেফতার হওয়ার বিষয়টি বাংলাদেশের ইন্টারপোলের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরোকে (এনসিবি) জানায় আবুধাবির এনসিবি। গত ১২ জুন এ-সংক্রান্ত একটি চিঠি বাংলাদেশে পাঠানো হয়।
চিঠিতে জানানো হয়, সংযুক্ত আরব আমিরাতের ‘ফৌজদারি বিষয়ে আন্তর্জাতিক বিচারিক সহযোগিতা-সংক্রান্ত’ ফেডারেল আইন নং ৩৯/২০০৬-এর ১১ ধারা অনুযায়ী, বেনজীরকে প্রত্যর্পণের জন্য বাংলাদেশকে ৩০ দিনের মধ্যে কূটনৈতিক চ্যানেলে আনুষ্ঠানিক লিখিত আবেদন জানাতে হবে।
এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ জুন বেনজীরকে দেশে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে ইংরেজি ও আরবি ভাষায় দুটি প্রত্যর্পণ প্রস্তাব স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠায় দুদক।
প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, বিদেশে কোনও আসামি গ্রেফতার হওয়ার পর তাকে দেশে ফেরাতে তদন্তকারী সংস্থা বা সংশ্লিষ্ট আদালত প্রত্যর্পণ প্রস্তাব প্রস্তুত করে। ওই প্রস্তাবের সঙ্গে গ্রেফতারি পরোয়ানা, মামলার এজাহার, অভিযোগপত্র এবং অপরাধের বিস্তারিত বিবরণ যুক্ত করা হয়।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের পর প্রস্তাবটি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট দেশে পাঠানোর কথা। ইন্টারপোলের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরোও এ প্রক্রিয়ায় সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করে।
২০২৫ সালে রেড নোটিশ
বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে ২০২৫ সালের ১০ এপ্রিল রেড নোটিশ জারি করে ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল পুলিশ অর্গানাইজেশন-ইন্টারপোল।
দুদকের তদন্তাধীন দুর্নীতির দুটি মামলায় আদালতের নির্দেশে বেনজীরের বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। আদালতের গ্রেফতারি পরোয়ানার ভিত্তিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ইন্টারপোলের কাছে আবেদন পাঠানো হয়।
বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাগুলোর মধ্যে ২০২৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর ১২ কোটি টাকার বেশি অবৈধ সম্পদ অর্জন ও সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগে একটি মামলা করে দুদক। তদন্ত শেষে ওই মামলায় আদালতে অভিযোগপত্রও জমা দেওয়া হয়েছে।
দুদকের উপপরিচালক মোহাম্মদ জয়নাল আবেদীনের করা ওই মামলায় আদালত বেনজীরের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে। এর ধারাবাহিকতায় তার বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের রেড নোটিশ জারির প্রক্রিয়া শুরু হয়।
সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগ
দুদক সূত্র জানায়, অনুসন্ধানের একপর্যায়ে বেনজীর আহমেদকে সম্পদ বিবরণী জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। তিনি আইনজীবীর মাধ্যমে ২০২৪ সালের ২৭ আগস্ট দুদকে সম্পদের বিবরণী জমা দেন।
দাখিল করা বিবরণীতে বেনজীর ৫ কোটি ৬৭ লাখ ৩৭ হাজার ৩৬৫ টাকার স্থাবর এবং ৫ কোটি ৭৪ লাখ ৮৯ হাজার ৯৬৬ টাকার অস্থাবর সম্পদের তথ্য দেন।
তবে দুদকের তদন্তে দাবি করা হয়, ঘোষিত সম্পদের বাইরে তিনি ২ কোটি ৬২ লাখ ৮৯ হাজার ৬০ টাকার সম্পদের তথ্য গোপন করেছেন। পাশাপাশি ৯ কোটি ৪৪ লাখ ৬৪ হাজার ৭৫১ টাকার সম্পদের বৈধ উৎস দেখাতে পারেননি।
দুদকের ভাষ্য, এসব সম্পদ তার জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ। এ কারণে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর ২৬(২) ও ২৭(১) ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।
পাসপোর্টে পেশাগত পরিচয় গোপনের মামলা
পরিচয় গোপন করে পাসপোর্ট গ্রহণ ও জালিয়াতির অভিযোগে ২০২৪ সালের ১৪ অক্টোবর বেনজীর আহমেদসহ পাঁচ জনের বিরুদ্ধে আরও একটি মামলা করে দুদক। ওই মামলাতেও তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা রয়েছে।
মামলার অন্য আসামিরা হলেন—পাসপোর্ট অধিদফতরের সাবেক পরিচালক ফজলুল হক, মুন্সী মুয়ীদ ইকরাম, টেকনিক্যাল ম্যানেজার সাহেনা হক এবং বিভাগীয় পরিচালক আবদুল্লাহ আল মামুন।
মামলার এজাহারে অভিযোগ করা হয়, ২০১০ সালের ১১ অক্টোবর ডিআইজি হিসেবে কর্মরত অবস্থায় বেনজীর হাতে লেখা পাসপোর্ট সমর্পণ করে বিভাগীয় অনাপত্তিপত্র ছাড়াই অফিসিয়াল মেশিন রিডেবল পাসপোর্টের জন্য আবেদন করেন।
আবেদনপত্রে পাসপোর্টের ধরন ‘অফিসিয়াল’ হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও পেশার ঘরে সরকারি চাকরিজীবীর পরিবর্তে ‘প্রাইভেট সার্ভিস’ উল্লেখ করা হয় বলে এজাহারে দাবি করা হয়েছে।
পরবর্তী সময়ে র্যাবের মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালেও পাসপোর্টের আবেদনপত্রে একইভাবে ‘প্রাইভেট সার্ভিস’ উল্লেখ করার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। বিভাগীয় অনাপত্তিপত্র ছাড়াই একাধিকবার এমআরপি ও ই-পাসপোর্টের জন্য আবেদন করার অভিযোগও এনেছে দুদক।
পাসপোর্ট অধিদফতরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বেনজীরের সরকারি পরিচয় সম্পর্কে জানার পরও বিভাগীয় অনাপত্তিপত্র সংগ্রহ বা যাচাই না করে তার নামে সাধারণ পাসপোর্ট ও ই-পাসপোর্ট ইস্যুর অনুমোদন দিয়েছিলেন বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে।
পরিবারের বিরুদ্ধে ৭৪ কোটি টাকার সম্পদের অভিযোগ
দুদকের অনুসন্ধানে বেনজীর আহমেদ ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিপুল পরিমাণ সম্পদের তথ্য পাওয়ার দাবি করা হয়েছে।
ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর ও বান্দরবানসহ বিভিন্ন জেলায় তাদের নামে প্রায় ৩৪৫ বিঘা জমিসহ বাড়ি, ফ্ল্যাট, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং অন্যান্য সম্পদের সন্ধান পাওয়ার কথা জানিয়েছে দুদক।
বেনজীর ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে ৭৪ কোটি টাকার বেশি অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে চারটি মামলা রয়েছে। এর বাইরে পাসপোর্ট জালিয়াতি ও অর্থপাচারের অভিযোগ মিলিয়ে বেনজীরের বিরুদ্ধে মোট ছয়টি মামলার তদন্ত চলছে।
এদিকে রবিবার দুদকের নতুন সচিব হিসেবে যোগ দিয়েছেন মো. সাইদুর রহমান খান। দায়িত্ব গ্রহণের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে দুর্নীতিকে নির্বাসনে পাঠাতে হবে।বেন








