জুলাইয়ে মব সহিংসতায় প্রাণ গেলো ১৭ জনের, রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত ৬

জুলাই মাসে দেশে রাজনৈতিক সহিংসতার ৪৫টি ঘটনায় ৬ জন নিহত এবং অন্তত ১৬৪ জন আহত হয়েছেন। একই সময়ে মব সহিংসতা ও গণপিটুনির ৪৯টি ঘটনায় নিহত হয়েছেন আরও ১৭ জন এবং আহত হয়েছেন ৫১ জন। এছাড়া নারী ও শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ২৫৮ জন এবং নির্যাতন, হয়রানি ও মামলার মুখে পড়েছেন অন্তত ৫৫ জন সাংবাদিক।  

সোমবার (৩ আগস্ট) মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) প্রকাশিত জুলাই মাসের মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।  

সংগঠনটি জানায়, দেশের ১৬টি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত সংবাদ, তাদের নিজস্ব তথ্য সংগ্রহ এবং স্থানীয় প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।  

প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুন মাসের তুলনায় জুলাইয়ে রাজনৈতিক সহিংসতায় হতাহতের সংখ্যা কমেছে। জুনে ৫৮টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় ৯ জন নিহত ও ৩৪৬ জন আহত হলেও জুলাইয়ে ৪৫টি ঘটনায় নিহত হন ৬ জন এবং আহত হন ১৬৪ জন।  

রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনাগুলোর মধ্যে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলে ১৪টি ঘটনায় ২ জন নিহত ও ৪৮ জন আহত হন। বিএনপি-জামায়াত সংঘর্ষের ৬টি ঘটনায় আহত হন ৪৪ জন। বিএনপি-আওয়ামী লীগ সংঘর্ষের ৩টি ঘটনায় আহত হন ১৩ জন এবং বিএনপি-এনসিপি সংঘর্ষের ৫টি ঘটনায় আহত হন ৩৮ জন। এছাড়া বিএনপি ও অন্যান্য দলের মধ্যে ১৪টি সংঘর্ষে আহত হন ১৬ জন। বিভিন্ন দলের মধ্যে ৩টি পৃথক ঘটনায় নিহত হন ৩ জন এবং আহত হন ৫ জন।  

এছাড়া রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের ওপর দুষ্কৃতকারীদের হামলার অন্তত ৭টি ঘটনায় ৫ জন নিহত ও ২ জন আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে আওয়ামী লীগের একজন এবং বিএনপির চারজন রয়েছেন। একই মাসে অন্তত ১৫ জন রাজনৈতিক নেতা-কর্মী গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনাও উল্লেখ করা হয়েছে।  

প্রতিবেদনে বলা হয়, আধিপত্য বিস্তার, দখলদারিত্ব, রাজনৈতিক সংঘাত ও চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে ৯টি ঘটনায় অন্তত ৪০টি বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও দলীয় কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে।  

রাজনৈতিক মামলার বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জুলাইয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ৪১টির বেশি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় ৮৮৭ জনের নাম উল্লেখ করে এবং আরও প্রায় ৫ হাজার ১৯ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে। একই সময়ে রাজনৈতিক ও অন্যান্য মামলায় মোট ১৯৩টি ঘটনায় অন্তত ৯ হাজার ১৫৭ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। 

গ্রেফতার হওয়াদের মধ্যে আওয়ামী লীগের অন্তত ৩১৮ জন, বিএনপির ২৮ জন, এনসিপির ৭ জন এবং জামায়াতে ইসলামীর একজন রয়েছেন। এছাড়া যৌথ বাহিনীর বিশেষ অভিযানে ৮ হাজার ৭৯৫ জনের বেশি ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, এদের অধিকাংশই আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের নেতাকর্মী, মাদক কারবারি, সন্ত্রাসী এবং বিভিন্ন উগ্রপন্থী সংগঠনের সদস্য।  

মব সহিংসতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, আধিপত্য বিস্তার, বাকবিতণ্ডা ও ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগকে কেন্দ্র করে ৪৯টি মব সহিংসতা ও গণপিটুনির ঘটনায় ১৭ জন নিহত এবং ৫১ জন আহত হয়েছেন।  

সাংবাদিক নির্যাতনের বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জুলাইয়ে ৩৬টি ঘটনায় ৫৫ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ২১ জন আহত, ৯ জন লাঞ্ছিত এবং ৮ জন হুমকির মুখে পড়েন। তিনজন সাংবাদিককে আটক করা হয় এবং ৮টি মামলায় ১৪ জন সাংবাদিককে আসামি করা হয়।  

সভা-সমাবেশ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রেও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এইচআরএসএস। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জুলাইয়ে ৯টি সভা-সমাবেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সরাসরি বা পরোক্ষভাবে বাধা দেয়, যাতে অন্তত ২০ জন আহত হন। মতপ্রকাশকে কেন্দ্র করে ৮টি ঘটনায় ৮ জনকে আটক করা হয় এবং ৮টি মামলা দায়ের করা হয়। এসব মামলায় অন্তত ২৫ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫-এর আওতায় পৃথক তিনটি মামলায় ১৭ জনকে অভিযুক্ত এবং তিনজনকে আটক করা হয়েছে।  

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে জুলাইয়ে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে পুলিশ হেফাজতে দুজন এবং ডিবি হেফাজতে একজন মারা যান। একই সময়ে দেশের বিভিন্ন কারাগারে অন্তত ১০ জন বন্দির মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে দুইজন দণ্ডপ্রাপ্ত কয়েদি এবং আটজন হাজতি ছিলেন। 

শ্রমিকদের পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়েছে, জুলাইয়ে শ্রমিক নির্যাতনের ৭৯টি ঘটনায় ২৩ জন নিহত এবং ৭২ জন আহত হয়েছেন। এছাড়া অস্বাস্থ্যকর কর্মপরিবেশ ও নিরাপত্তা সরঞ্জামের অভাবে কর্মস্থলে দুর্ঘটনায় আরও ৫৫ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে।  

নারী ও শিশু নির্যাতনের তথ্য তুলে ধরে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জুলাইয়ে মোট ২৫৮ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৯৫ জন ধর্ষণের শিকার, যার ৬১ জনই ১৮ বছরের কম বয়সী। এছাড়া ১১ জন গণধর্ষণ এবং ৭৮ জন যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। যৌতুকের কারণে একজন নিহত ও ছয়জন আহত হন। পারিবারিক সহিংসতায় ৪৫ জন নারী নিহত, ১০ জন আহত এবং ২৩ জন আত্মহত্যা করেছেন।  

শিশু নির্যাতনের ঘটনায় প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জুলাইয়ে ১৮০ জন শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে। তাদের মধ্যে ৩৪ জন নিহত এবং ১৪৬ জন শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে। 

প্রতিবেদনের বিষয়ে এইচআরএসএসের নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেন, “জুলাই মাসজুড়ে রাজনৈতিক সহিংসতা, মব সহিংসতা, সাংবাদিক নির্যাতন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ, নারী ও শিশু নির্যাতন, সীমান্ত সহিংসতা এবং শ্রমিক নির্যাতনের ধারাবাহিকতা অব্যাহত ছিল। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মত প্রকাশকে কেন্দ্র করে গ্রেফতার, হয়রানি ও আইনি পদক্ষেপের ঘটনা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।”  

তিনি বলেন, “এসব বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ না নিলে দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যেতে পারে।” একই সঙ্গে মানবাধিকার সুরক্ষায় সরকারের আরও জবাবদিহিমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ এবং নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান তিনি।