মানবাধিকার কমিশন ও গুম প্রতিরোধ আইন নিয়ে টিআইবির উদ্বেগ

অংশীজনদের পর্যবেক্ষণ ও সুপারিশের মৌলিক বিষয়গুলো উপেক্ষা করে খসড়া জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন এবং খসড়া গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন নীতিগতভাবে অনুমোদিত হওয়ায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।

পতিত কর্তৃত্ববাদী শাসনামলে গুম-খুনসহ বহুমুখী মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিজ্ঞতা থেকে সরকার ও ক্ষমতাসীন দল এ বিষয়ে মৌলিকভাবে কী শিক্ষা নিয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে সংস্থাটি।

বুধবার (১২ আগস্ট) গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে টিআইবি বলেছে, মন্ত্রিপরিষদ অনুমোদিত দুই খসড়া আইনে বেশ কিছু ইতিবাচক বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তবে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইনের খসড়ায় কমিশনের স্বাধীন ও কার্যকরভাবে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে—অংশীজনদের এমন সতর্কতা সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট বিধানগুলো বহাল রাখা হয়েছে।

একইভাবে, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনের অনুমোদিত খসড়ায়ও অংশীজনদের মতামত উপেক্ষা করে এমন কিছু ধারা রাখা হয়েছে, যা কর্তৃত্ববাদী আমলে এ অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠা বিভিন্ন সংস্থার সদস্যদের দায়মুক্তির সুযোগ তৈরি করতে পারে বলে মনে করে টিআইবি।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় ‘শৃঙ্খলাবাহিনী’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত সংস্থাগুলোর বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া যায়। অথচ মন্ত্রিপরিষদ অনুমোদিত মানবাধিকার কমিশন আইনে ২০০৯ সালের আইনের ১৮ ধারা প্রায় হুবহু রেখে শৃঙ্খলাবাহিনীর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় কমিশনকে সরকার বা বাহিনীপ্রধানের প্রতিবেদনের ওপর নির্ভরশীল করা হয়েছে।

তিনি বলেন, ২০০৯ সালের আইনের এই দুর্বলতার কারণেই মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় জবাবদিহি নিশ্চিত করা বা তা প্রতিরোধে কমিশন কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। একই কারণে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন কখনো ‘এ’ ক্যাটাগরির মর্যাদা অর্জন করতে পারেনি।

কমিশনে সরকারের নিয়ন্ত্রণের ঝুঁকি

ইফতেখারুজ্জামান বলেন, চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগের বাছাই কমিটিতে স্পিকার, আইনমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, সরকারদলীয় একজন সংসদ সদস্য ও মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে রাখা হয়েছে। এর বাইরে আরও তিনজন সদস্য রাখার বিধান থাকলেও বাস্তবে তাদের মধ্যে অন্তত দুজনের মনোনয়ন সরকারের হাতে থাকায় জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের নিয়োগে সরকারের নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য প্রতিষ্ঠার গুরুতর ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

এ ছাড়া কমিশনের পাঁচ সদস্যের মধ্যে একজন নারী রাখার বিধান থাকলেও বাছাই কমিটিতে নারী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার কোনো বাধ্যবাধকতা রাখা হয়নি। টিআইবি এটিকে পুরুষতান্ত্রিক ও বৈষম্যমূলক বলে মনে করছে।

কমিশনে সংখ্যালঘু ও অন্যান্য সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বের বিষয়েও কোনো বাধ্যবাধকতা রাখা হয়নি বলে অভিযোগ করেছে সংস্থাটি। অথচ আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী মানবাধিকার সুরক্ষা ও প্রসারে নাগরিক সমাজের বহুত্ববাদী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা প্রয়োজন বলে মনে করে টিআইবি।

ইফতেখারুজ্জামান বলেন, অনুমোদিত খসড়ায় কমিশনকে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান হিসেবে উল্লেখ করা হলেও এটি সরকারের কোনো মন্ত্রণালয় বা বিভাগের আওতায় থাকবে না—বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়নি। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক-আমলাতান্ত্রিক সংস্কৃতির বিবেচনায় এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মন্তব্য করেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, ঢাকার বাইরে কার্যালয় স্থাপন ও কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগে সাংগঠনিক কাঠামো নির্ধারণে সরকারের পূর্বানুমোদনের বাধ্যবাধকতা, ৩০ শতাংশ পর্যন্ত প্রেষণে সরকারি কর্মচারী নিয়োগ এবং সরকারি কর্মচারী হিসেবে কর্মরত অবস্থায় কাউকে প্রেষণে কমিশনার হিসেবে নিয়োগের বিধান কমিশনকে কার্যত একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে পারে।

“এমন মানবাধিকার কমিশন কী রক্তক্ষয়ী জুলাই অভ্যুত্থানের অভীষ্ট? কিংবা সরকারি দলের ৩১-দফা বা নির্বাচনী ইশতেহারের সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী নয়?”—প্রশ্ন করেন তিনি।

আয়নাঘর পরিদর্শন থেকে বাদ দেওয়ার কারণ কী?’

বর্তমান সরকারের সময়ে প্রণীত প্রথম খসড়া মানবাধিকার কমিশন আইনে ‘মানবাধিকার লঙ্ঘনে অজুহাত অগ্রহণযোগ্য’ শীর্ষক একটি বিধান থাকলেও মন্ত্রিপরিষদ অনুমোদিত খসড়ায় সেটি বাদ দেওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে টিআইবি।

ইফতেখারুজ্জামান বলেন, আইন মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত প্রথম খসড়ার ১৪ ধারায় ‘কেবল সরকারি বা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আদেশ বা নির্দেশ মোতাবেক’ মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাকে অজুহাত হিসেবে গ্রহণ না করার বিধান ছিল। অনুমোদিত খসড়ায় সেটি বাদ দেওয়া হয়েছে।

একইসঙ্গে ব্যক্তি স্বাধীনতা হরণ বা সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে—এমন স্থান নিয়মিত ও পূর্ব ঘোষণা ছাড়া পরিদর্শনের ক্ষেত্রে কমিশনের দায়িত্ব ও এখতিয়ার থেকে ‘সামরিক আটক কেন্দ্র’ বাদ দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।

“এর কারণ কী? তাহলে কী আমরা ধরে নেব, আয়নাঘর বহাল রাখার ক্ষেত্রে সরকারের সমর্থন রয়েছে?”—প্রশ্ন করেন ইফতেখারুজ্জামান।

গুমের তদন্ত পুলিশের হাতে রাখলে জবাবদিহি নিশ্চিত হবে কীভাবে?’

অনুমোদিত গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনের খসড়া নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে টিআইবি।

ইফতেখারুজ্জামান বলেন, গুমের মতো স্পর্শকাতর ও গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের তদন্তের দায়িত্ব সম্পূর্ণভাবে মানবাধিকার কমিশনের আওতার বাইরে রেখে এককভাবে পুলিশের হাতে দেওয়া হয়েছে। অথচ গুমের অধিকাংশ ঘটনায় যাদের জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে, তারা শৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্য।

তিনি বলেন, ঊর্ধ্বতন কোনও কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গুমে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠলে অধস্তন একজন তদন্ত কর্মকর্তাকে ‘অন্তর্বর্তীকালীন প্রতিবেদন’ প্রস্তুত ও দাখিলের বিধান রাখা হয়েছে। সেই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সন্তোষজনক সাক্ষ্যপ্রমাণ না পাওয়া গেলে এখতিয়ারসম্পন্ন ম্যাজিস্ট্রেট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে কার্যধারা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার আদেশ দিতে পারবেন—এমন বিধানও রাখা হয়েছে।

ইফতেখারুজ্জামান প্রশ্ন করেন, এই প্রক্রিয়া প্রভাবমুক্ত থাকবে—এমন আশা কতটা বাস্তবসম্মত? এই বিধান গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকারে সহায়ক হবে, নাকি বাস্তবে গুমের অপরাধের বিচারহীনতা নিশ্চিত করবে?

টিআইবি আরও বলেছে, অনুমোদিত খসড়ায় গুমের সংজ্ঞায় জনপ্রতিনিধি, মন্ত্রী বা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। ফলে বাংলাদেশের বাস্তব অভিজ্ঞতা ও সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক সনদের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে গুমের সংজ্ঞায়ন হয়নি।

এ ছাড়া অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে প্রণীত গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ, ২০২৫-এ মানবাধিকার কমিশনের দায়িত্বের অংশ হিসেবে আটক-সংক্রান্ত রক্ষাকবচের বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ, কারাগার, হাজতখানা ও আটককেন্দ্রসহ বিভিন্ন স্থাপনা পরিদর্শন এবং গোপন আটককেন্দ্র শনাক্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার মতো ক্ষমতার কথা বলা হয়েছিল। মন্ত্রিপরিষদ অনুমোদিত খসড়ায় এসব গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি বলেও জানিয়েছে টিআইবি।

সবশেষে টিআইবি বলেছে, স্বাধীন ও কার্যকর মানবাধিকার কমিশনের অভাব এবং গুম প্রতিরোধে কার্যকর আইনি রক্ষাকবচ না থাকায় দেশের মানুষ ভয়াবহ পরিস্থিতির শিকার হয়েছে। তাই জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনায় মানবাধিকার, জবাবদিহি ও ন্যায়বিচারভিত্তিক রাষ্ট্রসংস্কারের লক্ষ্য এবং ক্ষমতাসীন দলের ৩১-দফা ও নির্বাচনী অঙ্গীকারের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে সংসদে উত্থাপনের আগে খসড়া আইন দুটি ভুক্তভোগী ও অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে পুনর্বিবেচনা করে ঢেলে সাজানোর দাবি জানিয়েছে সংস্থাটি।