ফেনীর সোনাগাজীর বহুল আলোচিত মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত হত্যা মামলায় আসামিদের ডেথ রেফারেন্স, আসামিদের আপিল ও জেল আপিলের রায় ঘোষণা শুরু করেছেন হাইকোর্ট। সোমবার (২৪ আগস্ট) সকাল ১০টা ৪০ মিনিট থেকে বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চে আলোচিত এ মামলার রায় ঘোষণা শুরু করেন।
আদালতে আসামিদের পক্ষে অ্যাডভোকেট এস এম শাহজাহান, ব্যারিস্টার মাসুদ হোসেন দোলন, অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির উপস্থিত আছেন। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল, ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সৈয়দ ইজাজ কবির উপস্থিত আছেন।
এর আগে গত ২০ আগস্ট মামলার আপিল ও ডেথ রেফারেন্সের ওপর শুনানি শেষে রায়ের জন্য ২৪ আগস্ট দিন নির্ধারন করেছিলেন আদালত।
নারী ও শিশু ধর্ষণ ও হত্যা সংক্রান্ত আলোচিত মামলাগুলোর ডেথ রেফারেন্স দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে গত ১০ জুন প্রধান বিচারপতি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এই বিশেষ বেঞ্চ গঠন করেন। এরই ধারাবাহিকতায় নুসরাত হত্যা মামলাটি শুনানির জন্য তালিকাভুক্ত করা হয়েছিল।
ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী বিচারিক আদালত কোনও আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিলে সেই রায় কার্যকর হওয়ার আগে উচ্চ আদালতের অনুমোদন প্রয়োজন হয়। এ কারণে ডেথ রেফারেন্স শুনানির জন্য মামলাটি হাইকোর্টে আসে। একইসঙ্গে দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা জেল আপিল ও ফৌজদারি আপিলও দায়ের করেন।
২০১৯ সালের ২৪ অক্টোবর ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মামুনুর রশিদ এ মামলার রায় ঘোষণা করেন। রায়ে প্রত্যেক আসামিকে (১৬ আসামি) মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেন। পাশাপাশি আসামিদের প্রত্যেককে ১ লাখ টাকা করে অর্থদণ্ডেও দণ্ডিত করা হয়।
একই বছরের ২৭ মার্চ সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদদৌলার বিরুদ্ধে নুসরাতকে যৌন নির্যাতনের অভিযোগে মামলা করেন তার মা শিরীন আখতার। এই মামলার জেরে অধ্যক্ষকে গ্রেফতার করে পুলিশ।
এরপর তার অনুগতরা জনমত গঠন করে সিরাজকে জেল থেকে বের করে আনার জন্য। ৩ এপ্রিল তারা সিরাজের সঙ্গে কারাগারে পরামর্শ করে এসে ৪ এপ্রিল মাদ্রাসার ছাত্রাবাসে নুসরাতকে খুন করার পরিকল্পনা করে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ৬ এপ্রিল নুসরাত মাদ্রাসায় আলিম পরীক্ষা দিতে গেলে পরিকল্পিতভাবে সাইক্লোন শেল্টারের ছাদে নিয়ে নুসরাতকে হত্যার চেষ্টা চালায় তারা।
ঘটনাস্থল থেকে নুসরাতকে উদ্ধার করে প্রথমে সোনাগাজী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। এরপর তাকে স্থানান্তর করা হয় ফেনী ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে। অবস্থা সঙ্কটাপন্ন হওয়ায় সেখান থেকে নুসরাতকে নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১০ এপ্রিল সন্ধ্যায় মারা যান নুসরাত।
এ ঘটনায় নুসরাতের ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান ৮ এপ্রিল মামলা দায়ের করেন। এই মামলায় ২৮ মে অভিযোগপত্র দাখিলের পর ২০ জুন অভিযোগ গঠন করেন নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল। পরে সাক্ষ্যগ্রহণ ও যুক্তিতর্ক শেষে ৩০ সেপ্টেম্বর আদালত রায়ের জন্য ২৪ অক্টোবর নির্ধারণ করেন। মামলাটিতে মাত্র ৬১ কার্যদিবসে ৮৭ সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ ও যুক্ততর্ক গ্রহণ করা হয়।
একই ব্ছরের ২৪ অক্টোবর রায়ে ১৬ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেন আদালত।
আসামিরা হলো– সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি ও মাদ্রাসার সাবেক সহ-সভাপতি রুহুল আমিন (৫৫), কাউন্সিলর ও সোনাগাজী পৌর আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মাকসুদ আলম ওরফে মোকসুদ কাউন্সিলর (৫০), সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার সাবেক অধ্যক্ষ এসএম সিরাজ উদ-দৌলা (৫৭), নূর উদ্দিন (২০), শাহাদাত হোসেন শামীম (২০), সাইফুর রহমান মোহাম্মদ জোবায়ের (২১), জাবেদ হোসেন ওরফে সাখাওয়াত হোসেন (১৯), হাফেজ আব্দুল কাদের (২৫), আবছার উদ্দিন (৩৩), কামরুন নাহার মনি (১৯), উম্মে সুলতানা ওরফে পপি (১৯), আব্দুর রহিম শরীফ (২০), ইফতেখার উদ্দিন রানা (২২), ইমরান হোসেন ওরফে মামুন (২২), মহিউদ্দিন শাকিল (২০) ও মোহাম্মদ শামীম (২০)।