রাজধানীতে ছিনতাইকারীদের দৌরাত্ম্য থামছেই না। রাতের আঁধারের পাশাপাশি এখন দিনদুপুরেও ব্যস্ত সড়কে অস্ত্র নিয়ে নেমে পড়ছে সংঘবদ্ধ ছিনতাইকারী চক্র। ব্যাংকে টাকা জমা দিতে যাওয়ার পথে কোটি টাকা ছিনতাই থেকে শুরু করে ব্যবসায়ীকে গুলি করে ডলার লুট, পথচারীর মোবাইল ছিনিয়ে নেওয়া কিংবা বাধা দিলে ধারালো অস্ত্রের আঘাত; সাম্প্রতিক একের পর এক ঘটনায় নগরবাসীর মধ্যে আতঙ্ক বাড়ছে।
গত ৯ আগস্ট সকালে উত্তরা এলাকায় ব্যাংকে টাকা জমা দিতে যাওয়ার পথে ডিএল পেট্রোল পাম্পের ১ কোটি ২১ লাখ ২৫ হাজার টাকা ছিনতাই হয়। তিনটি মোটরসাইকেলে আসা একদল দুর্বৃত্ত টাকা বহনকারী গাড়ির গতিরোধ করে ধারালো অস্ত্র দিয়ে হামলা চালিয়ে টাকার ব্যাগ নিয়ে পালিয়ে যায়। প্রধানমন্ত্রীর খালাতো ভাইয়ের ওই ফিলিং স্টেশনের টাকা ব্যাংকে জমা দিতে যাওয়ার সময় আলোচিত এ ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে।
এ ঘটনায় বিমানবন্দর থানায় মামলা দায়ের করা হয় এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক ইউনিট তদন্ত শুরু করে। পরে পুলিশ ও র্যাবের অভিযানে ছিনতাইকারীরা গ্রেফতার হলেও ঘটনাটি ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে।
এর আগে গত ২৬ জুন রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বর এলাকায় জনতা ব্যাংকের সামনে দিনেদুপুরে এক ব্যবসায়ীকে গুলি করে ১৭ হাজার ডলার ছিনতাই করা হয়। বেলা ৩টার দিকে ছিনতাইকারীদের গুলিতে মো. লোকমান নামের এক মানি এক্সচেঞ্জ ব্যবসায়ী আহত হন। পরে তাকে রাজধানীর মুগদা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
জানা যায়, দুজন ছিনতাইকারী তার ব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিল। ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে তাকে গুলি করা হয়। আশপাশে থাকা লোকজন ভয়ে দৌড়ে পালান। পরে গুলিবিদ্ধ ব্যক্তির কাছ থেকে ব্যাগ নিয়ে মোটরসাইকেলে পালিয়ে যায় ওই দুই ছিনতাইকারী।
দিনদুপুরেও অস্ত্রধারীদের দাপট
নগরবাসীর অভিযোগ, এখন শুধু রাতের আঁধারেই নয়, ভরদুপুরেও ব্যস্ত রাস্তায় নেমে আসছে অস্ত্রধারী ছিনতাইকারীরা। সিএনজি, মোটরবাইক বা প্রাইভেটকারে হঠাৎ হাজির হয়ে ক্ষণিকের মধ্যে টাকা, মোবাইল ও মূল্যবান জিনিসপত্র নিয়ে উধাও হয়ে যাচ্ছে তারা। বাধা দিলে গুলি বা ধারালো অস্ত্র দিয়ে হামলা চালানো হচ্ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে মোহাম্মদপুরের আদাবর শেখেরটেকে প্রকাশ্যে একটি বিকাশ এজেন্টের দোকানে ধারালো চাপাতি নিয়ে হামলা চালায় দুই যুবক। এতে গুরুতর আহত হন দোকান মালিক শফিকুল ইসলাম। ঘটনার পর আদাবর থানা পুলিশ মাঠে নামে। বিকালে ছিনতাইকারীদের আস্তানায় অভিযান চালাতে গেলে তারা পুলিশের ওপর হামলা চালায়। ধারালো অস্ত্রের আঘাতে আদাবর থানার ওসি মো. জাহিদুল ইসলাম জাহাঙ্গীর ও এসআই তরুণ কুমার আহত হন। পরে ঘটনাস্থল থেকে চার জনকে আটক করা হয়।
এর কয়েকদিন আগে শেরেবাংলা নগর থানাধীন জিয়া উদ্যান এলাকায় ছিনতাইকারী ধরতে গিয়ে হামলার শিকার হন দুই পুলিশ সদস্য। ১২ জুন রাতে ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে আহত হন এসআই সামসুজ্জোহা ও কনস্টেবল হৃদয় হোসেন।
সম্প্রতি সিএনজিতে অটোরিকশায় প্রেসক্লাব থেকে মিরপুরে যাওয়ার সময় শাহবাগ পার হওয়ার পর ছিনতাই-চেষ্টার শিকার হন শাহাদাৎ হোসেন নামে এক যুবক। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, সিএনজি অটোরিকশার ওপর দিয়ে চাকু দিয়ে কেটে তার ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। সতর্ক থাকায় ছিনতাইকারীরা মোবাইল ফোনটি নিতে পারেনি।
তিনি বলেন, ‘রাস্তায় টহল পুলিশের স্বল্পতার কারণে ছিনতাইকারীরা বেপরোয়া। টহল পার্টি বাড়ানোর পাশাপাশি তিনি অভিযান আরও জোরদার করার দাবি জানান।’
একই পরিস্থিতির শিকার হন আরমান আহমেদ। তেজগাঁওয়ের সাতরাস্তা দিয়ে প্রাইভেটকারে যাওয়ার সময় তার মোবাইল টান দেওয়ার ঘটনা ঘটে। তবে সতর্ক থাকায় ছিনতাইকারীরা মোবাইল নিতে পারেনি। তিনি বলেন, ‘এই রাস্তায় মাঝে মাঝে এমন ঘটনা ঘটে।’ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সড়কে টহল বৃদ্ধির দাবি জানান তিনি।
ছিনতাইকারীর হামলায় প্রাণ গেছে দুই নারীর
৭ জুন রাজধানীতে ছিনতাইকারীর হামলায় সোহেলি ইসলাম নামে এক নারীর মৃত্যু হয়। গাবতলী থেকে বাসে নেমে ধানমন্ডির বাসার যাওয়ার পথে দুই ছিনতাইকারীর হামলার শিকার হন তিনি। দুর্বৃত্তরা তার হাতে প্যাঁচানো ভ্যানিটি ব্যাগ ধরে টান দিলে সড়কে ছিটকে পড়েন তিনি। চার দিন পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান সোহেলি। এ ঘটনায় এখনও কাউকে শনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ।
এর আগে মার্চে একইভাবে প্রাণ যায় গৃহবধূ মুক্তা আক্তারের (২১)। ১৯ মার্চ উত্তরায় ঈদের কেনাকাটার জন্য বাসা থেকে বের হলে ছিনতাইকারীরা তার ব্যাগ ধরে টান দেয়। পরে আহত অবস্থায় হাসপাতালে মারা যান তিনি।
সাত মাসে ১৭৮ মামলা
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত সাত মাসে রাজধানীর বিভিন্ন থানায় অন্তত ১৭৮টি ছিনতাইয়ের মামলা হয়েছে। ডিএমপির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ছিনতাইয়ের ঘটনায় এসব মামলা হয়। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ২৯টি, ফেব্রুয়ারিতে ২২টি, মার্চে ২৫টি, এপ্রিলে ২৫টি, মে মাসে ৩৩টি, জুনে ২৪টি এবং জুলাইয়ে ২০টি মামলা হয়েছে। সাত মাসের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মামলা হয়েছে মে মাসে।
তবে বাস্তব চিত্র এর চেয়েও ভয়াবহ বলে মনে করছেন অপরাধ বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, ঝামেলা এড়াতে কিংবা খোয়া যাওয়া মালামাল উদ্ধারের আশা না থাকায় অনেক ভুক্তভোগী সাধারণ ডায়েরি করেন অথবা কোনও আইনি পদক্ষেপই নেন না। ফলে প্রকৃত ছিনতাইয়ের ঘটনা এই পরিসংখ্যানের চেয়ে অনেক বেশি।
ঢাকায় ছিনতাইয়ের হটস্পট
গত বছরই ঢাকায় ছিনতাইয়ের ৩৪২টি হটস্পট চিহ্নিত করেছিল পুলিশ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তা বলছেন, এসব স্পটে ছিনতাইয়ে সক্রিয় রয়েছে প্রায় ১২০০ অপরাধী। এরমধ্যে তেজগাঁও বিভাগের মোহাম্মদপুর ও আদাবর এলাকায় রয়েছে ১০৮টি স্পট। শেরেবাংলা নগর, তেজগাঁও, শিল্পাঞ্চল ও হাতিরঝিল থানা এলাকায় ২৫টি, বৃহত্তর মিরপুর এলাকায় ৯৫টি, গুলশান ও উত্তরা বিভাগে ৯৪টি, মতিঝিল বিভাগে ৩০টি, ওয়ারীতে ৩৫টি এবং রমনা ও লালবাগ বিভাগে ৪৫টি হটস্পট রয়েছে।
এসব এলাকায় সক্রিয় অপরাধীদের মধ্যে মতিঝিল বিভাগ ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় ২১২ জন, মিরপুর ও তেজগাঁও বিভাগে ৩৮৬, রমনা ও লালবাগ বিভাগে ২১৭, উত্তরা ও গুলশান বিভাগে ১৫৪ এবং মোহাম্মদপুর থানার আওতাধীন এলাকায় ২০৫ জন ছিনতাইকারী সক্রিয়ভাবে জড়িত।
পুলিশের একটি সূত্র জানায়, বর্তমানে ডিএমপির আট বিভাগে তালিকাভুক্ত ১ হাজার ৩৮৭ ছিনতাইকারী তৎপর রয়েছেন। এর মধ্যে রমনা বিভাগে ১৫২, লালবাগে ১৫৯, ওয়ারীতে ৩০৮, মতিঝিলে ১৬৮, তেজগাঁওয়ে ২৪০, মিরপুরে ৫৩, গুলশানে ৬৭ ও উত্তরায় ২৪০ জন দুর্ধর্ষ ছিনতাইকারী রয়েছে।
অভিযান চলছে, বলছে পুলিশ
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের প্রধান শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা উত্তরার ঘটনা ডিটেক্ট করে অপরাধীদের গ্রেফতার করেছি। এরপর মতিঝিলের ঘটনাতেও আমরা ছিনতাইকারীদের গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছি।’
তিনি বলেন, ‘রাজধানীতে অপরাধ করে পার পাওয়ার সুযোগ নেই। এছাড়াও প্রতিনিয়ত ছিনতাইকারীসহ নানা অপরাধীদের বিরুদ্ধে গ্রেফতার অভিযান অব্যাহত রয়েছে।’
রাজধানীর তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার ইবনে মিজান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ছিনতাইকারী, টানাপার্টি, কিশোরগ্যাং, মাদককারবারি অর্থাৎ সব ধরনের অপরাধ নির্মূলে কাজ করে যাচ্ছে পুলিশ।’ প্রতিদিন অভিযান চলছে, গ্রেফতারও করা হচ্ছে- যোগ করেন তিনি।
মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার তানভির সরদার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাদের বিশেষ অভিযান অব্যাহত রয়েছে। প্রতিদিনই আমরা শতাধিকের ওপরে গ্রেফতার করছি। এর মধ্যে ছিনতাইকারী রয়েছে, টানাপার্টি রয়েছে। এছাড়াও অন্যান্য অপরাধীদেরও গ্রেফতার করা হচ্ছে।’
বিমানবন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কামরুল ইসলাম তালুকদার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিমানবন্দর সড়কে আগের যেকোনও সময়ের তুলনায় আমরা টহল বৃদ্ধি করেছি। বিমানবন্দর চৌরাস্তা মোড়টিতে সিভিলে এবং পোশাকে পুলিশ মোতায়েন থাকে। এখানে টানাপার্টি, ছিনতাইকারী সবগুলোর বিরুদ্ধে আমাদের শক্ত অবস্থান।’
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক কামরুজ্জামান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ছিনতাই প্রতিরোধে পুলিশি টহল বাড়ানোর পাশাপাশি সিসিটিভি ক্যামেরার আওতা বাড়ানো জরুরি। একইসঙ্গে মোবাইল ট্র্যাকিং এবং চিহ্নিত অপরাধীদের দ্রুত গ্রেফতার নিশ্চিত না করলে এই আতঙ্ক কমবে না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দৃশ্যমান ও কঠোর পদক্ষেপই এখন সময়ের দাবি।