বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে মুক্ত না হলে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়

রাজনৈতিক প্রভাব, বিচারে দীর্ঘসূত্রতা, দুর্বল বিচারব্যবস্থা, ক্রমবর্ধমান মব ভায়োলেন্স ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির কারণে দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি চরম নাজুক হয়ে পড়েছে বলে মন্তব্য করেছেন একটি গোল টেবিল বৈঠকে অংশ নেওয়া বক্তারা।

গবেষণাভিত্তিক স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর ইনক্লুসিভ পলিসি অ্যান্ড গভর্নেন্স (সিআইপিজি) আয়োজিত ‘আইন-শৃঙ্খলা অবনতির বহুমাত্রিক কারণ ও টেকসই সমাধানের উপায়’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে তারা এ কথা বলেন।

বক্তারা বলেন, কোনো নির্দিষ্ট সরকারের সমালোচনা নয়, বাস্তবতার নিরিখে অপরাধের মূল কারণ চিহ্নিত করে একটি সুশৃঙ্খল ও নিরাপদ রাষ্ট্র গঠনে টেকসই সমাধান খুঁজে বের করাই আয়োজনের মূল লক্ষ্য।

সিআইপিজির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. মোজাম্মেল হকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার এ এস এম শাহরিয়ার কবির।

আলোচনায় অংশ নেন সিআইপিজির ভাইস চেয়ারম্যান ও সাবেক সিনিয়র সচিব মো. সফিউল্লাহ, সাবেক সচিব মো. হুমায়ুন কবীর, ঐতিহাসিক মাসদার হোসেন মামলার বাদী ও সাবেক সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ মো. মাসদার হোসেন, ইঞ্জিনিয়ার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এবিএম গোলাম মুস্তফা এবং সাবেক অতিরিক্ত সচিব মো. আবদুল কাইয়ুম। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সাবেক সচিব মোহাম্মদ আব্দুল কাইয়ুম।

সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক ড. মো. মোজাম্মেল হক বলেন, বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেশে খুন-খারাবি ও সহিংসতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে, যা সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করছে।

তিনি বলেন, আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ করা সরকারের প্রাথমিক ও মৌলিক দায়িত্বগুলোর একটি। অপরাধের মূল উৎপত্তি খুঁজে বের করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে সুনাগরিক তৈরির দুর্গ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে এবং নারী ও শিশু নির্যাতন রোধে সমাজের প্রতিটি স্তরকে এগিয়ে আসতে হবে।

আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির স্থায়ী উন্নতির জন্য সরকার, বিরোধী দল, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, গণমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সাধারণ জনগণের মধ্যে সুদৃঢ় সমন্বয় গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।

মূল প্রবন্ধে ব্যারিস্টার এ এস এম শাহরিয়ার কবির বলেন, নাগরিক হিসেবে আমরা সরকারকে কর দিই। তাই আমাদের জানমালের সুরক্ষা দেওয়া রাষ্ট্রের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা। যে রাষ্ট্র নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়, সে রাষ্ট্র শাসন করার অধিকার রাখে না।

তিনি বলেন, গত ৫৫ বছরের ইতিহাসে রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ ‘পুলিশ’ কেবল ক্ষমতাসীন সরকারের অনুগত হয়ে কাজ করেছে, জনগণের সুরক্ষায় নয়।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অপরাধবিদ্যার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও গবেষণায় পর্যাপ্ত বরাদ্দ না থাকায় আফসোস প্রকাশ করেন তিনি।

তিনি বলেন, পিনাল কোডে হত্যার সংজ্ঞায়ন এবং ১৮৬০ সালের পুরোনো পুলিশ আইন যুগোপযোগী না হওয়া, দুর্বল তদন্ত ব্যবস্থা ও পুলিশের নিজেদের অপরাধ নিজেদের দিয়ে তদন্ত করানোর সংস্কৃতি পুরো আইন-শৃঙ্খলা ব্যবস্থাকে ভঙ্গুর করে তুলেছে। বিচারে দীর্ঘসূত্রতার কারণে নির্দোষ মানুষকে বছরের পর বছর কারাগারে কাটাতে হচ্ছে, যা তনু হত্যা মামলার মতো ঘটনায় দৃশ্যমান।

তিনি আরও জানান, বিচার বিভাগ থেকে সরকার বছরে প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয় করলেও বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হয় মাত্র ২৬০ কোটি টাকা। আর ২০ কোটি মানুষের জন্য আপিল বিভাগে মাত্র তিন ঘণ্টার সময়কাল আন্তর্জাতিক মানে একেবারেই অপ্রতুল।

এই অসভ্য পরিবেশ থেকে উত্তরণে সদিচ্ছা, দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন এবং নিজ নিজ ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলার ওপর জোর দেন তিনি।

সাবেক সচিব মো. হুমায়ুন কবীর বলেন, কোনো কাঠামোগত আইন পরিবর্তনের আগে রাষ্ট্র ও সমাজে সর্বাগ্রে ‘সৎ ও নৈতিক মানুষ’ তৈরি করতে হবে। অন্যথায় কোনো আইনই কার্যকর সুফল দেবে না।

পরিশেষে সিআইপিজির নির্বাহী পরিচালক ও সাবেক অতিরিক্ত সচিব ড. খুরশীদ আলম উপস্থিত অতিথি, আলোচক ও গণমাধ্যমকর্মীদের ধন্যবাদ জানিয়ে সেমিনারের সমাপ্তি ঘোষণা করেন।