গুরুত্বপূর্ণ ‘ডিভাইস’ সরাতেই কি সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ড 

সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যাকাণ্ডের তদন্তে নতুন করে আলোচনায় এসেছে বেশ কিছু ইলেকট্রনিক ডিভাইস ও সেখান থেকে উদ্ধার হওয়া তথ্য। র‍্যাবের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক ও সাবেক মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে থাকা মামলায় জব্দ করা ইলেকট্রনিক ডিভাইস পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালও জব্দ করে। এসব ডিভাইস বিশ্লেষণ করতে গিয়ে ২০০৭ সাল থেকে সাম্প্রতিক সময় পর্যন্ত বিভিন্ন তথ্য, সার্ভার ও মুছে ফেলা ফাইল উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন।

প্রসিকিউশনের দাবি, উদ্ধার করা তথ্য বিশ্লেষণ করে কয়েকজনকে সন্দেহভাজন হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। তাদের মধ্যে একজনকে জিজ্ঞাসাবাদও করা হয়েছে। আর সেই জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া একটি বক্তব্য সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের তদন্তে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

আগামীকাল গুরুত্বপূর্ণ কিছু ঘটতে যাচ্ছে

প্রসিকিউটর তানভীর হোসেন জোহার ভাষ্য অনুযায়ী, জিজ্ঞাসাবাদে একজনের কাছ থেকে পাওয়া বক্তব্যে জানা যায়—তৎকালীন র‍্যাব প্রধানের ড্রাইভে দায়িত্ব পালন করা এক ব্যক্তিকে হত্যাকাণ্ডের আগের দিন বলা হয়েছিল, ‘আগামীকাল কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে’ এবং প্রয়োজন হলে তাকে ভোরে উপস্থিত থাকতে হবে। যার পরদিনই জানা যায় সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের খবর।

তবে ওই ব্যক্তি হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে আগে থেকে কোনও নির্দিষ্ট তথ্য পেয়েছিলেন কিনা, কিংবা ঘটনার সঙ্গে তার সরাসরি কোনও সম্পৃক্ততা ছিল কিনা—তা এখনও নিশ্চিত নয়। তাই প্রসিকিউশনও বিষয়টিকে তদন্তে পাওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হিসেবেই দেখছে।

ডিভাইসে কী পাওয়া গেল?

প্রসিকিউটর তানভীর হোসেন জোহা জানান, জব্দ করা ইলেকট্রনিক ডিভাইস ও সার্ভারে দীর্ঘ সময়ের বিপুল তথ্য পাওয়া গেছে। কিছু ফাইল মুছে ফেলা হলেও সেগুলোর একটি অংশ পুনরুদ্ধার করা হয়েছে। আবার কিছু তথ্য ও নথি আগে থেকেই প্রিন্ট করা অবস্থায় ছিল। এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে তদন্তকারীরা তিন থেকে চার জনকে সন্দেহভাজন হিসেবে চিহ্নিত করেছেন বলেও জানান তিনি।

জোহার বক্তব্য অনুযায়ী, জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের মধ্যে আরও কিছু সংবেদনশীল বিষয় রয়েছে। বিশেষ করে বিডিআর কিংবা তৎকালীন সরকারের কোনও স্পর্শকাতর নথি বা তথ্য-উপাত্ত ডিস্ক, টেপ বা মেমোরি-সংক্রান্ত কিছু ডিভাইসে থাকার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। ওই ব্যক্তির কাছে আরও কিছু ডিভাইস থাকার কথাও তদন্তে উঠে এসেছে বলে দাবি করেন তিনি।

তদন্তকারীদের ধারণা, এসব ডিভাইস ও তথ্য সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের তদন্ত কর্তৃপক্ষের হাতে গেলে ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদঘাটনে সহায়ক হতে পারে।

যা বললেন চিফ প্রসিকিউটর

সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের তদন্ত বা বিচার করার এখতিয়ার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রয়েছে কিনা তা নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন। এ বিষয়ে চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম বিষয়টি স্পষ্ট করে বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের ১৯৭৩ সালের আইনের ৩ ধারায় কোন কোন অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচার বা তদন্তের আওতাভুক্ত, তা নির্ধারণ করা হয়েছে।

সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ড একটি বাসায় সংঘটিত সাধারণ হত্যাকাণ্ড হিসেবে বিবেচিত হলে সেটি ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ারের মধ্যে পড়ে কিনা, তা এই মুহূর্তে নিশ্চিত করে বলতে চাননি তিনি। তবে কোনও অভিযোগ ট্রাইব্যুনালে জমা পড়লে সেটি গ্রহণ করে যাচাই-বাছাই করার সুযোগ রয়েছে বলে জানান চিফ প্রসিকিউটর

অন্য কোনও ঘটনার সূত্র ধরে ক্লু পাওয়া যেতে পারে

চিফ প্রসিকিউটর জানান, ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা ও প্রসিকিউশন টিম বিভিন্ন বিষয়ে তদন্ত করছে। সেই তদন্তের সূত্র ধরে অন্য কোনও ঘটনার সঙ্গে সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের যোগসূত্রের তথ্য সামনে আসতে পারে।

তানভীর জোহার দেওয়া তথ্যের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তদন্ত করতে গিয়ে এমন একটি ক্লু পাওয়া গেছে, যেখানে কোনও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, সামরিক কর্মকর্তা কিংবা র‍্যাব কর্মকর্তার সম্ভাব্য সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি সামনে এসেছে। তবে তদন্তে উঠে আসা সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি চিফ প্রসিকিউটর।

তিনি বলেন, যদি বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায় এবং সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি স্পষ্ট হয়—তাহলে সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের চলমান তদন্তকারী কর্তৃপক্ষকে সেই তথ্য দিয়ে সহায়তা করা যেতে পারে।

আবেদন করলে কী করবে ট্রাইব্যুনাল?

সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে ট্রাইব্যুনালে আবেদন করা হলে, তা সরাসরি গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যান না করে আইনগতভাবে যাচাই করা হবে—এমন অবস্থান জানিয়েছেন চিফ প্রসিকিউটর। তার বক্তব্য অনুযায়ী, আবেদনটি ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ারের মধ্যে পড়লে সেটি গ্রহণ করা হবে। আর এখতিয়ারের বাইরে হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হবে।

ট্রাইব্যুনালে আবেদন করবেন রুনির ভাই

সাগর-রুনি হত্যা মামলার বাদী ও রুনির ভাই নওশের আলী রোমান জানিয়েছেন, তারা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আবেদন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

তিনি বলেন, ট্রাইব্যুনালে যেসব মামলার বিচার চলছে, সেগুলোর সঙ্গে সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের বিচারিক এখতিয়ার কীভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে, তা তিনি নিশ্চিত নন। তবে এটি দীর্ঘদিনের আলোচিত ও অমীমাংসিত মামলা এবং নিহত দুজনই সাংবাদিক হওয়ায় ট্রাইব্যুনাল বিষয়টি দেখবে—এমন প্রত্যাশা তাদের রয়েছে।

এসময় সাংবাদিক দম্পতির একমাত্র সন্তান মাহির সারওয়ার মেঘ উপস্থিত থেকে চিফ প্রসিকিউটরের কাছে হত‍্যাকাণ্ডটির সুষ্ঠু বিচার দাবি করেন।

মামলার বিবরণী অনুসারে, ২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের ভাড়া বাসায় সাংবাদিক সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি নিহত হন। এরপর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও হত্যাকাণ্ডের রহস্যের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি।