কটূক্তি নাকি সমালোচনা: আইনের চোখে পার্থক্য কোথায়?

কোনও ব্যক্তির বক্তব্য বা মন্তব্য কটূক্তি, নাকি তা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার আওতায় থাকা সমালোচনা— এ নিয়ে প্রায়ই বিতর্ক দেখা যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনও মন্তব্যের জেরে মামলা বা গ্রেফতারের ঘটনা সামনে এলে প্রশ্ন ওঠে, কোন মানদণ্ডে একটি বক্তব্যকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে নাগরিকের চিন্তা, বিবেক, বাক্‌ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। তবে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, জনশৃঙ্খলা, শালীনতা বা নৈতিকতা, আদালত অবমাননা, মানহানি এবং অপরাধে প্ররোচনার মতো বিষয়ে আইনের মাধ্যমে যুক্তিসঙ্গত বিধিনিষেধ আরোপের সুযোগও রাখা হয়েছে।

প্রচলিত দণ্ডবিধিতে ‘কটূক্তি’ নামে আলাদা কোনও সাধারণ অপরাধের সংজ্ঞা নেই। তবে বক্তব্যের ধরন ও পরিস্থিতি অনুযায়ী তা মানহানি, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত, শান্তিভঙ্গের উদ্দেশ্যে অপমান, কিংবা অন্য কোনও নির্দিষ্ট অপরাধের আওতায় পড়তে পারে।

দণ্ডবিধির ৪৯৯ ধারায় মানহানির সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। কারও সুনাম ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্যে বা সে ধরনের ফল হবে জেনেও কোনও বক্তব্য, লেখা, ইঙ্গিত বা দৃশ্যমান উপস্থাপন করা হলে— নির্দিষ্ট শর্তে তা মানহানি হতে পারে। তবে একই ধারায় কয়েকটি ব্যতিক্রম রয়েছে। যেমন-জনস্বার্থে সত্য কথা প্রকাশ করা কিংবা জনস্বার্থে বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির স্বার্থ রক্ষায় সৎ বিশ্বাসে কোনও মন্তব্য করা নির্দিষ্ট শর্তে মানহানি হিসেবে গণ্য নাও হতে পারে।

অপরদিকে, দণ্ডবিধির ৫০৪ ধারায় ইচ্ছাকৃত অপমানের মাধ্যমে জনশান্তি ভঙ্গ বা অন্য অপরাধে প্ররোচনার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি করাকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। আবার ২৯৫এ ধারায় কোনও ধর্ম বা ধর্মীয় বিশ্বাসকে ইচ্ছাকৃত ও বিদ্বেষপূর্ণভাবে অপমান করে কোনও শ্রেণির মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করার বিষয়টি অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মনজিলা ঝুমার মতে, কোনও বক্তব্য কারও কাছে অপ্রিয়, কঠোর বা আপত্তিকর মনে হলেই সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে অপরাধ হয়ে যায় না। বক্তব্যের ভাষা, উদ্দেশ্য, প্রেক্ষাপট, সম্ভাব্য প্রভাব এবং সংশ্লিষ্ট আইনের নির্দিষ্ট উপাদান পূরণ হয়েছে কিনা— এসব বিষয় বিবেচনা করতে হয়।

তিনি বলেন, ‘‘কোনও অভিযোগ পাওয়ার পর পুলিশ আইন অনুযায়ী তদন্ত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারে। তবে অভিযোগ ওঠা এবং অপরাধ প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়। শেষ পর্যন্ত কোনও বক্তব্য নির্দিষ্ট অপরাধের আওতায় পড়ে কিনা, তার বিচারিক সিদ্ধান্ত দেওয়ার ক্ষমতা আদালতের।’’

মানবাধিকার সংগঠন রাইজ ফর রাইটস ফাউন্ডেশনের ট্রেজারার মো. ইমাম হোসেন পাটোয়ারী বাংলা ট্রিবিউনকে  বলেন, ‘‘কটূক্তি ও সমালোচনা’র সীমারেখা নির্ধারণে ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো— বক্তব্যটি কোনও আইনি অপরাধের উপাদান পূরণ করছে কিনা। একইসঙ্গে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও আইনগত সীমাবদ্ধতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।’’