সাভারের কাশেমীনগর পূর্ব শাহীবাগের মারকাযুল উলূম আশ-শরইয়্যাহ মাদ্রাসার সাত বছরের এক ছাত্রকে ধর্ষণের মামলায় গ্রেফতার পাঁচ আসামির মধ্যে মক্তব বিভাগের সহকারী শিক্ষক হাফেজ মাওলানা জাবের হোসেন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। কামরুল ইসলাম নামে আরেক শিক্ষককে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। বাকি তিন আসামি শিশু হওয়ায় তাদের গাজীপুরের টঙ্গী কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে।
শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সাভার মডেল থানার এসআই সামরুল হোসেন পাঁচ আসামিকে আদালতে হাজির করেন। তাদের মধ্যে জাবের হোসেন ও দুই শিশুর স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি গ্রহণ এবং কামরুল ইসলাম ও আরেক শিশুকে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন তিনি।
আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকার সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট তামান্নার আদালতে জাবের হোসেন ও দুই শিশুকে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ডের জন্য নেওয়া হয়। জাবের জবানবন্দি দিলেও দুই শিশু এতে সম্মতি দেয়নি। পরে তাদের টঙ্গী কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানো হয়। কামরুল ইসলামকে পাঠানো হয় কারাগারে।
বাদীপক্ষের আইনজীবী আবুল কালাম এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
এর আগে বরগুনা, ভোলা, সিরাজগঞ্জ, গাজীপুর ও ঢাকা থেকে পাঁচ আসামিকে গ্রেফতার করে পুলিশ।
এদিকে মামলা তুলে নিতে ভুক্তভোগী শিশুর পরিবারকে হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন তার বাবা। তিনি বলেন, ‘আমাকে ফোন করে মামলা তুলে নিতে হুমকি দেওয়া হচ্ছে। না হলে আমাকে গুম করা হবে।’ এ ঘটনায় নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বলেও জানান তিনি।
মামলায় যত অভিযোগ
সাত বছরের ওই শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে সাভারের কাশেমীনগর পূর্ব শাহীবাগের মারকাযুল উলূম আশ-শরইয়্যাহ মাদ্রাসার মুহতামিম (পরিচালক) জিয়া ইবনে কাসেমসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে গত ২৩ আগস্ট ঢাকার শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে মামলা করার আবেদন করেন শিশুটির বাবা।
ট্রাইব্যুনাল অভিযোগটি সাভার মডেল থানায় এজাহার হিসেবে গ্রহণের নির্দেশ দেন। ২৭ আগস্ট সাভার মডেল থানা থেকে মামলার এজাহার আদালতে পাঠানো হয়। ঢাকার সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট তানভীর আহমদ তা গ্রহণ করে ১৩ অক্টোবরের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন।
মামলার অভিযোগে বলা হয়, গত ফেব্রুয়ারিতে শিশুটিকে মাদ্রাসায় ভর্তি করা হয়। ফজরের নামাজের পর থেকে এশার নামাজের আগ পর্যন্ত তার পাঠদান চলত। শিশুটির সঙ্গে তার বাবা সপ্তাহে এক দিন দেখা করতেন এবং শুক্রবার ছুটিতে তাকে বাড়িতে নিয়ে যেতেন।
এজাহারে অভিযোগ করা হয়, ভর্তির ২০-২১ দিন পর থেকে কয়েকজন আসামি শিশুটিকে যৌন নির্যাতন করতে শুরু করেন। গত ২১ ফেব্রুয়ারি তৃতীয় রোজার দিন সন্ধ্যায় টয়লেটে এক শিক্ষার্থীর মাধ্যমে শিশুটি প্রথম ধর্ষণের শিকার হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এ বিষয়ে কাউকে জানালে তাকে মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়।
এরপর একে একে কয়েকজন শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের বিরুদ্ধে শিশুটিকে ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের অভিযোগ করা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ৬ জুলাই পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে এসব ঘটনা ঘটে। এমনকি নির্যাতনের বিষয়ে কয়েকজন শিক্ষকের কাছে অভিযোগ জানাতে গিয়েও শিশুটি ফের যৌন নির্যাতনের শিকার হয় বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
এজাহারে আরও বলা হয়, বিষয়টি মাদরাসায় ছড়িয়ে পড়ার পর অভিযোগ ওঠা এক শিক্ষার্থীকে ‘বড় হুজুর’ মারধর করেন। পরে ১২ আগস্ট শিশুটি তার মাকে ঘটনাগুলো বিস্তারিত জানায়।
শিশুটির বাবা ১৫ আগস্ট রাতে মাদ্রাসার পরিচালক জিয়া ইবনে কাসেমের কাছে অভিযোগ করেন বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। এ সময় জিয়া ইবনে কাসেম ৯৯৯-এ ফোন করে অপরাধীদের পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার কথা বলেছিলেন বলে অভিযোগে বলা হয়। একইসঙ্গে পুলিশ ও সাংবাদিকদের জানাতে নিষেধ করেছিলেন বলেও এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
মামলার অভিযোগে জিয়া ইবনে কাসেমসহ আসামিদের একটি ‘সংঘবদ্ধ চক্র’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। মাদরাসার আরও শিক্ষার্থীকে ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের ঘটনায় তারা জড়িত বলে অভিযোগ করেছেন শিশুটির বাবা।