আগে ‘শিবির’, এখন ‘ছাত্রলীগ: বদলায়নি ট্যাগিংয়ের রাজনীতি

আগে ‘শিবির’, এখন ‘ছাত্রলীগ’। আগে ‘রাষ্ট্রবিরোধী’ এখন ‘ফ্যাসিস্ট’। সময় বদলেছে, ক্ষমতাও বদলেছে। বদলেছে রাজনৈতিক ট্যাগিংয়ের ভাষাও। প্রধানমন্ত্রীকে কটূক্তির অভিযোগে গ্রেফতার কলেজশিক্ষার্থী সিফাত আব্দুল্লাহকে পুরোনো সন্ত্রাসবিরোধী মামলায় যুক্ত করা এবং তার সঙ্গে ‘ছাত্রলীগ’ পরিচয় জুড়ে দেওয়ার ঘটনা সেই প্রশ্নই আবার সামনে এনেছে। তবে সংশ্লিষ্ট মামলায় তিনি এজাহারভুক্ত আসামি নন এবং ওই ঘটনায় তার সম্পৃক্ততা এখনও তদন্তাধীন।

সিফাতের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর গত ৩ সেপ্টেম্বর রাতে তাকে গাজীপুরের গাছা এলাকা থেকে আটক করে পুলিশ। ভিডিওতে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিলের অভিযোগ তুলে তিনি প্রধানমন্ত্রী ও সরকারের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে অশালীন ও আপত্তিকর ভাষা ব্যবহার করেন বলে অভিযোগ। পরদিন তাকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় আদালতে পাঠানো হয় এবং আদালত কারাগারে পাঠান।

কিন্তু আটকের পর থেকেই সিফাতের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে সামনে আসে ‘আওয়ামী লীগ’ ও ‘ছাত্রলীগ’-এর প্রসঙ্গ। গাছা থানার ওসি গোলাম রব্বানী বাংলা ট্রিবিউনসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, সিফাতের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের সঙ্গে যোগসূত্র এবং রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অপপ্রচারের অভিযোগ পাওয়া গেছে। সিফাত নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সঙ্গে মিলে ঝটিকা মিছিলের প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। আবার পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, গত ২৭ জুনের যে মামলায় সিফাতকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে, যদিও তিনি সেই মামলার এজাহারভুক্ত আসামি নন। ওই মামলায় ৫০ থেকে ৬০ জন অজ্ঞাত আসামি রয়েছেন এবং সিফাত ওই ঘটনার সঙ্গে জড়িত ছিলেন কিনা, তা তদন্ত করে দেখা হবে। সিফাতের পরিবারও তার আওয়ামী লীগ বা ছাত্রলীগের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

এই প্রেক্ষাপটেই জনমনে প্রশ্ন উঠেছে, কাউকে গ্রেফতারের পর রাজনৈতিক পরিচয় দিয়ে জনগণের সামনে তার সম্পর্কে একটি ধারণা তৈরি করা কি তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ার আগেই তাকে সামাজিকভাবে অপরাধী বানিয়ে ফেলছে? মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন মনে করেন, বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই চর্চা নতুন নয়। বদলেছে কেবল ট্যাগের নাম।

প্রধানমন্ত্রীকে কটূক্তির অভিযোগে গ্রেফতার সিফাতকে ছাত্রলীগের সঙ্গে যুক্ত করে বক্তব্য দেওয়াসহ সামগ্রিক ‘ট্যাগিংয়ের রাজনীতি’ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে নূর খান লিটন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “শুরুতেই ট্যাগিং করে জনগণের সামনে একজনকে অপরাধী সাব্যস্ত করা হয়। ট্যাগিংয়ের রাজনীতি থেকে আমরা বেরিয়ে আসতে পারছি না। আগে জামায়াত-শিবিরসহ অন্যান্য ট্যাগিং দেওয়া হতো, এখন ছাত্রলীগের ট্যাগিং দেওয়া হচ্ছে।’’

তিনি বলেন, “সিফাতের অপরাধের জন্য বিচার চাওয়া যেতে পারে, বিচার হতে পারে। কিন্তু সেই পুরোনো পদ্ধতিতেই ট্যাগিং দিয়ে পুরোনো মামলায় আসামি করা অন্যায় ও দুঃখজনক।”

একই প্রশ্নে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বক্তব্যেও এসেছে প্রমাণের বিষয়টি। কাউকে গ্রেফতারের পরপরই ‘ফ্যাসিস্ট’, ‘আওয়ামী লীগ’ কিংবা এ ধরনের রাজনৈতিক পরিচয়ের ট্যাগ দিয়ে দেওয়া হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে সত্যতা যাচাইয়ের আগেই তা ছড়িয়ে পড়ছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশের অতিরিক্ত আইজি খন্দকার রফিকুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “আমার মনে হয়, এর পেছনে চলমান এক ধরনের ক্ষমতার সংকট বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য কাজ করতে পারে। কেউ হয়তো সেই পরিস্থিতিকে আরও উসকে দেওয়ার মানসিকতা থেকেও এমনটা করতে পারেন।”

তিনি আরও বলেন, “তবে কারও রাজনৈতিক পরিচয় বা সম্ভাব্য মোটিভেশন আলাদা বিষয়। আইনশৃঙ্খলা ও অপরাধের প্রশ্নে আমাদের দেখতে হবে— সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি আসলে কী অপরাধ করেছেন এবং তার বিরুদ্ধে কী প্রমাণ আছে। পুলিশ কখনও কাউকে ট্যাগ দেয় না।’’

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাজনৈতিক ‘ট্যাগিং’ বলতে সাধারণত এমন প্রবণতাকে বোঝানো হয়, যেখানে ব্যক্তির নির্দিষ্ট কর্মকাণ্ড ও তার পক্ষে থাকা প্রমাণ যাচাইয়ের আগেই তাকে একটি রাজনৈতিক দল, সংগঠন বা মতাদর্শের পরিচয়ে চিহ্নিত করা হয়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিসরে সময় ও ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে এই ট্যাগের ভাষারও পরিবর্তন হয়েছে। কখনও ‘শিবির’, ‘জামায়াত’, ‘বিএনপি’, ‘জঙ্গি’ কিংবা ‘রাষ্ট্রবিরোধী’। আবার সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতায় ‘আওয়ামী লীগ’, ‘ছাত্রলীগ’ ও ‘ফ্যাসিস্ট’ শব্দও ব্যক্তিকে চিহ্নিত করতে ব্যবহারের অভিযোগ উঠছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, আওয়ামী লীগের ভাতৃপ্রতিম সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগকে ২০২৪ সালের ২৩ অক্টোবর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অধীনে ‘নিষিদ্ধ’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়। ফলে নিষিদ্ধ সংগঠনটির সদস্যপদ বা আইনবিরোধী কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের অভিযোগ অবশ্যই তদন্তযোগ্য। কিন্তু কাউকে ‘ছাত্রলীগ’ বলা এবং আইন ও সাক্ষ্য প্রমাণ দিয়ে সেই পরিচয় ও অপরাধে সংশ্লিষ্টতা প্রতিষ্ঠা করা এক কথা নয়। সিফাতের ঘটনায় এই পার্থক্যটিই গুরুত্বপূর্ণ।

স্থানীয় পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, তার রাজনৈতিক যোগাযোগ বা নিষিদ্ধ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। অন্যদিকে সিফাতের স্বজনদের দাবি, সিফাত আওয়ামী লীগ বা ছাত্রলীগের সঙ্গে যুক্ত নন এবং তিনি জুলাই আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন।

‘অশালীন বক্তব্য’ আর ‘সন্ত্রাস’ কি এক?

সিফাতকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় গ্রেফতার দেখানোর ঘটনায় নিন্দা জানিয়ে হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেন, তারা কোনও ধরনের অশালীন ও আপত্তিকর বক্তব্য সমর্থন করে না। কোনও বক্তব্য আইন লঙ্ঘন করলে প্রচলিত আইনে তার প্রতিকার ও জবাবদিহির ব্যবস্থা থাকতে পারে। তবে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মতো গুরুতর আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট অপরাধের উপাদান ও বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ থাকা জরুরি।

সিফাতের ঘটনা নিয়ে একই প্রশ্ন তুলেছে বিভিন্ন মহল। প্রধানমন্ত্রী বা সরকারকে কটূক্তির অভিযোগ এক বিষয়, আর নিষিদ্ধ সংগঠনের কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়া বা সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অধীনে অপরাধ করা আরেক বিষয়। একটি অভিযোগ থেকে অন্যটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রমাণিত হয় না।

সিফাতের গ্রেফতার নিয়ে আইন প্রয়োগে দ্বৈত মানদণ্ডের প্রশ্ন তুলেছেন সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মাসুদ কামাল। শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) ফেসবুকে তিনি লিখেছেন, ‘‘গালিগালাজ অশোভন ও শাস্তিযোগ্য হলেও একই ধরনের ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে সবার প্রতি সমানভাবে আইন প্রয়োগ হচ্ছে কিনা, সেই প্রশ্ন রয়েছে।’’ তার ভাষায়, “আসলে সব গালি এক নয়। মনে হচ্ছে, গালিতে কোনও সমস্যা নেই, গালিটা কাকে দেওয়া হচ্ছে সেটাই দেখার বিষয়।’’ সন্ত্রাসবিরোধী আইনকেও ‘কালো আইন’ আখ্যা দিয়ে সমালোচনা করেন তিনি।

ট্যাগের পরিণতি কখনও জীবনহানিও

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে যাচাইহীন বা অনুমাননির্ভর রাজনৈতিক পরিচয়ের ভয়াবহ পরিণতির নজিরও রয়েছে। ২০১২ সালের ৯ ডিসেম্বর পুরান ঢাকায় দর্জি বিশ্বজিৎ দাসকে শিবির মনে করে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা হামলা করেন। তিনি কোনও রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নেননি। কর্মস্থলে যাওয়ার পথে তাকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।

২০১৯ সালের অক্টোবরে বুয়েটের শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদের ক্ষেত্রেও সামনে আসে ‘শিবির’ সন্দেহের বিষয়টি। তদন্তে উঠে আসে, তার সম্ভাব্য শিবির-সংশ্লিষ্টতা নিয়ে সন্দেহ থেকে তাকে নির্যাতন করা হলে তার মৃত্যু হয়। ২০২৫ সালে আবরার হত্যা মামলার পূর্ণাঙ্গ রায়ে হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণেও বলা হয়, ‘‘শিবিরের সঙ্গে তার সম্ভাব্য সম্পৃক্ততার অভিযোগে কোনোভাবেই তার ওপর চালানো অমানবিক নির্যাতনকে ন্যায্যতা দেয় না।’’

সংশ্লিষ্টদের মতে, ট্যাগিং রাজনীতির পেছনে রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা রয়েছে। ক্ষমতাসীন ও বিরোধী পক্ষের সম্পর্ক যখন প্রতিদ্বন্দ্বিতার বদলে ‘শত্রু-মিত্র’ কাঠামোয় চলে যায়। তখন ব্যক্তিগত দায়ের জায়গায় গোষ্ঠীগত দায় সামনে আসে।