নুসরাত হত্যা মামলার পূর্ণাঙ্গ রায়

ন্যূনতম প্রমাণ ছাড়া মৃত্যুদণ্ডের রায় দায়িত্বজ্ঞানহীন কাজ: হাইকোর্ট

ফেনীর আলোচিত মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার ক্ষেত্রে বিচারিক আদালতের বিচারকের ভূমিকার কঠোর সমালোচনা করেছেন হাইকোর্ট। আদালত বলেছেন, ন্যূনতম সাক্ষ্য-প্রমাণ না থাকা সত্ত্বেও চার আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া ছিল বিচার-বুদ্ধিহীন ও দায়িত্বজ্ঞানহীন সিদ্ধান্ত।

হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায়ে বলা হয়েছে, শামীম, রুহুল আমিন, মাকসুদ কাউন্সিলর ও আফসারউদ্দীনের বিরুদ্ধে ‘ন্যূনতম কোনো প্রমাণ’ পাওয়া যায়নি। অথচ তাদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। এর ফলে ওই আসামিদের প্রায় সাত বছর কনডেম সেলে থাকতে হয়েছে। এতে তাদের পরিবারগুলোর ওপরও ধ্বংসাত্মক প্রভাব পড়েছে।

আদালত পর্যবেক্ষণে বলেন, একটি সভ্য সমাজে এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন সাজা প্রত্যাশিত নয়। ট্রাইব্যুনালের বিচারকের মধ্যে সংবেদনশীলতার অভাবও দেখা গেছে। দণ্ডবিধি ও সাজা প্রদানের বিধিমালার মৌলিক বিষয়গুলো যথাযথভাবে না শেখা পর্যন্ত ওই বিচারককে দায়রা আদালতের বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন থেকে দূরে রাখাই শ্রেয় বলেও কঠোর পর্যবেক্ষণ এসেছে রায়ে।

নুসরাতের মায়ের দায়ের করা শ্লীলতাহানির মামলা প্রত্যাহারে রাজি না হওয়ায় তাকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয় বলে হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায়ে বলা হয়েছে। এ হত্যাকাণ্ডের নির্দেশ দিয়েছিলেন মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলা।

আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সিরাজ-উদ-দৌলার নির্দেশে নুসরাতকে হত্যা করে ঘটনাটিকে আত্মহত্যা হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়। এ পরিকল্পনা, সহায়তা ও বাস্তবায়নের সঙ্গে সিরাজসহ ছয় আসামি জড়িত ছিলেন।

রায়ে বলা হয়েছে, আসামিদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি এবং পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য-প্রমাণ পরস্পরকে সমর্থন করেছে। এসব সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই হত্যাকাণ্ডে তাদের সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হয়েছে।

নুসরাতকে হত্যা করে ঘটনাটি আত্মহত্যা হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার জন্য অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলার নির্দেশ বাস্তবায়নে শাহাদাত হোসেন শামীম ও নুরউদ্দিন মূল সহযোগী হিসেবে কাজ করেন বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে।

নুসরাত মামলা প্রত্যাহারে রাজি না হওয়ায় তাকে হত্যার জন্য শামীম, নুরউদ্দিন, জাবেদ ও জুবায়েরকে প্ররোচিত করেছিলেন অধ্যক্ষ সিরাজ। পূর্ণাঙ্গ রায়ে এমন পর্যবেক্ষণ রয়েছে।

নুসরাতের মৃত্যুকালীন জবানবন্দি ‘ত্রুটিহীন’ ছিল বলেও রায়ে উল্লেখ করেছে হাইকোর্ট। তাই ওই জবানবন্দিকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করেছেন আদালত।

আদালত বলেছেন, নুসরাতের মৃত্যুকালীন জবানবন্দি ত্রুটিহীন এবং গ্রহণযোগ্যতার মাপকাঠিতে উত্তীর্ণ। ওই জবানবন্দিতে চার ব্যক্তির সরাসরি অংশগ্রহণের বিষয়টি উঠে এসেছে।

পাশাপাশি দণ্ডিত আসামিদের দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিকেও সত্য ও স্বেচ্ছাপ্রণোদিত বলে গ্রহণ করেছেন আদালত।

আসামিদের পক্ষ থেকে রিমান্ডে নির্যাতনের অভিযোগের বিষয়টিও পূর্ণাঙ্গ রায়ে বিবেচনা করেছেন হাইকোর্ট।

আদালত বলেছেন, রিমান্ডে আসামিদের নির্যাতন করা হয়েছিল, এমন কোনো প্রমাণ মামলার নথিতে পাওয়া যায়নি। শুধু জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডে নেওয়া হয়েছিল বলেই তাদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিকে অবিশ্বাস্য বলা যাবে না।

এর আগে গত ২৪ আগস্ট হাইকোর্ট নুসরাত হত্যা মামলায় অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলা ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থী শাহাদাত হোসেন শামীমের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন।

তবে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অন্য আসামিদের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ শাস্তি বহাল রাখার মতো পর্যাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ না থাকায় তাদের মৃত্যুদণ্ড থেকে খালাস দেওয়া হয়।

এ ছাড়া আরও চার আসামির মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তারা হলেন মাদ্রাসার ছাত্র নুর উদ্দিন, সাইফুর রহমান মোহাম্মদ যোবায়ের, জাবেদ হোসেন ওরফে সাখাওয়াত হোসেন জাবেদ এবং উম্মে সুলতানা পপি ওরফে তুহিন।

নুসরাত হত্যা মামলার হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায়ে একদিকে হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে জড়িতদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য-প্রমাণের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে। অন্যদিকে পর্যাপ্ত প্রমাণ ছাড়া কাউকে সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়ার বিপজ্জনক দিকটিও স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করেছে হাইকোর্ট।

বিচারিক প্রক্রিয়ায় শুধু অপরাধের ভয়াবহতা নয়, প্রত্যেক আসামির বিরুদ্ধে নির্ভরযোগ্য ও পৃথক সাক্ষ্য-প্রমাণ নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। নুসরাত হত্যা মামলার পূর্ণাঙ্গ রায়ে সেই নীতিই জোরালোভাবে উঠে এসেছে।