দেশে ডাবল-ডেকার স্লিপার বাসের কোনও রেজিস্ট্রেশন না দেওয়া সত্ত্বেও সিঙ্গেল-ডেকার বাস কিনে পরবর্তী সময়ে অবৈধভাবে বডি রূপান্তর করে স্লিপার হিসেবে রুপান্তর করা ৪১টি বাসের রেজিস্ট্রেশন স্থগিত করেছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)।
বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) হাইকোর্ট বিভাগের একটি রিট পিটিশনের নির্দেশনার আলোকে বিআরটিএ গঠিত কমিটির প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। বিআরটিএ-এর ইঞ্জিনিয়ারিং শাখার শীর্ষ কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত ৩ সদস্যের এই তদন্ত কমিটি সম্প্রতি প্রতিবেদনটি জমা দেয়।
এর আগে অনুনমোদিত স্লিপার এসি বাস চলাচলের বৈধতা নিয়ে ২০২৫ সালে রিট করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মুহাম্মদ হুজ্জাতুল ইসলাম খান। সে রিটের শুনানি নিয়ে একই বছরের ৪ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্ট রুল জারি করেন।
পরে রিটকারী আরেকটা পৃথক আবেদন দিয়েছিলেন। সেই আবেদনের শুনানি নিয়ে আদালত স্লিপার বাস নিয়ে তিন সদস্য বিশিষ্ট একটি ইন্ডিপেন্ডেন্ট টেকনিক্যাল কমিটি গঠন করতে নির্দেশ দেন। বিআরটিএ’র আদেশের পর তিন সদস্য বিশিষ্ট একটা কমিটি গঠন করে দিয়েছিলেন। এরপর টেকনিক্যাল কমিটি রিপোর্ট দেন।
বিআরটিএ পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) মোহাম্মদ শহীদুল্লার নেতৃত্বে সদস্য হলেন উপপরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) এ. এস. এম কামরুল হাসান। আর সদস্য সচিব হিসেবে ছিলেন সহকারী পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) মো. মঈনুল ইসলাম।
এ কমিটি বিআরটিএ থেকে অনুমোদিত মোট ডাবল-ডেকার স্লিপার বাসের সংখ্যা নির্ধারণ; অননুমোদিত স্লিপার বাসের বিরুদ্ধে গৃহীত ব্যবস্থা পর্যালোচনা এবং অনুমোদিত ডাবল-ডেকার স্লিপার বাস থাকলে আগামী ৬০ (ষাট) দিনের মধ্যে সব নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ নিয়ে কাজ করে।
এরপর কমিটির ডাবল-ডেকার স্লিপার বাসের বর্তমান অবস্থা মূল্যায়ন; বর্তমান অনুমোদন ও নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়ায় বিদ্যমান নিরাপত্তা ঝুঁকি চিহ্নিত করা; এবং উন্নত দেশের অভিজ্ঞতার আলোকে ডাবল-ডেকার স্লিপার বাসের অনুমোদন ও নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়ার জন্য একটি জাতীয় গাইডলাইন বা নীতিমালা প্রণয়ন, যাতে যাত্রীদের নিরাপত্তা ও আরামদায়ক ভ্রমণ নিশ্চিত করা নিয়ে পর্যালোচনা করে।
পর্যালোচনা শেষে কমিটির মতামতে বলা হয়, বিআরটিএ হতে কোনও ডাবল-ডেকার স্লিপার বাসের অনুমোদন বা রেজিস্ট্রেশন প্রদান করা হয়নি। তবে বিআরটিএর ডাটাবেজ পর্যালোচনা করে ডাবল-ডেকার (স্লিপার নয়) হিসেবে অদ্যাবধি ৮২৯টি বাসের রেজিস্ট্রেশনের তথ্য পাওয়া যায়।
অননুমোদিত স্লিপার বাসের বিরুদ্ধে নেওয়া ব্যবস্থা সম্পর্কে মতামতে বলা হয়, বিআরটিএ হতে সিঙ্গেল-ডেকার বাস হিসেবে রেজিস্ট্রেশন প্রদান করা হলেও পরবর্তীতে কিছু সংখ্যক বাসের মালিক মোটরযানের বডির ধরন ডাবল-ডেকার স্লিপার বাস হিসেবে রূপান্তর করে রাস্তায় চলাচলের অভিযোগের প্রেক্ষিতে ৪১টি বাসের রেজিস্ট্রেশন স্থগিত করা হয়। পাশাপাশি বিআরটিএ’র ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার মাধ্যমে সড়কে চলাচলরত ৩টি স্লিপার বাসের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে এবং অভিযান চলমান রয়েছে। এছাড়া বিআরটিএ সময়ে সময়ে সড়কে চলাচলরত অননুমোদিত ডাবল-ডেকার স্লিপার বাসের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পুলিশ বিভাগে চিঠি পাঠিয়েছে।
অনুমোদিত ডাবল-ডেকার স্লিপার বাসের নিরাপত্তা নিয়ে মতামতে বলা হয়, বর্তমানে ডাবল-ডেকার স্লিপার বাসের কোনও গাইডলাইন বা নীতিমালা না থাকায় বিআরটিএ হতে এরূপ মোটরযানের অনুমোদন বা রেজিস্ট্রেশন দেওয়া হয় না। অনুমোদিত ডাবল-ডেকার স্লিপার বাস বিদ্যমান না থাকায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি প্রযোজ্য নয়।
সার্বিক পর্যালোচনায় কমিটি বলে, বিআরটিএ হতে অদ্যাবধি কোনও ডাবল-ডেকার স্লিপার বাসের অনুমোদন বা রেজিস্ট্রেশন দেওয়া হয়নি। বিআরটিএ হতে সিঙ্গেল-ডেকার বাস হিসেবে রেজিস্ট্রেশন গ্রহণ করে পরবর্তীতে কিছু সংখ্যক বাসের মালিক বাসের বডির ধরন ডাবল-ডেকার স্লিপার বাস হিসেবে রূপান্তর করে। বিআরটিএ’র ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার মাধ্যমে সড়ক ও মহাসড়কে চলাচলকৃত এরূপ বাসের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। পাশাপাশি মালিক কর্তৃক যেসব বাসের বডির ধরন ডাবল-ডেকার স্লিপার বাস হিসেবে রূপান্তর করে বিআরটিএ-তে ফিটনেস নবায়ন করতে আসে সেসব ডাবল-ডেকার স্লিপার বাসের ফিটনেস নবায়ন না করে উক্ত মোটরযানসমূহের রেজিস্ট্রেশন স্থগিত করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। সড়কে চলাচলরত এরূপ অননুমোদিত ডাবল-ডেকার স্লিপার বাসের রুট পারমিট প্রদান করা হয় না।
পর্যালোচনায় আরও বলা হয়, বর্তমানে সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ ও সড়ক পরিবহন বিধিমালা, ২০২২ মোতাবেক শুধুমাত্র সিঙ্গল-ডেকার বাসের অনুমোদন ও রেজিস্ট্রেশন প্রদান করা হচ্ছে। তাই বর্তমান অনুমোদন ও নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়ায় ডাবল-ডেকার স্লিপার বাসের নিরাপত্তা ঝুঁকি চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি; এবং উন্নত দেশের অভিজ্ঞতার আলোকে ডাবল-ডেকার স্লিপার বাসের অনুমোদন ও নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়ার জন্য একটি জাতীয় নীতিমালা প্রণয়নের কার্যক্রম চলমান রয়েছে।