চাঁদা না দিলেই হামলা-গুলি-হত্যা, নিরাপত্তা কোথায়?

চাঁদার দাবি অস্বীকার করার মূল্য কখনও জীবন দিয়ে, কখনও গুলিবিদ্ধ ও চাপাতির কোপ খেয়ে আহত হওয়া, কখনও আবার ঘরে বা কর্মস্থলে হামলার আতঙ্ক। সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায় এমন অভিযোগ সামনে আসার পর চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে হত্যা ও হামলার ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে জনমনে। একই সঙ্গে অপরাধী শনাক্ত ও গ্রেফতারের দাবি জোরালো হয়েছে।

পুলিশ কর্মকর্তা ও অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, মামলার তদন্ত কতটা শক্তিশালী হচ্ছে, আদালতে প্রমাণ কতটা টিকছে, বিচার শেষ হতে কত সময় লাগছে, জামিনে বেরিয়ে অভিযুক্তরা আবার অপরাধে ফিরছে কিনা; সেগুলো নজরদারিতে আনতে হবে। তাদের মতে, অভিযান চালিয়ে অপরাধীদের ওপর সাময়িক চাপ তৈরি করা সম্ভব। কিন্তু তদন্ত, প্রসিকিউশন, বিচার, তথ্য ব্যবস্থাপনা এবং অপরাধে জড়িয়ে পড়া ব্যক্তিদের রাজনৈতিক পুনর্বাসন বন্ধ বা পরিবর্তন না করলে চাঁদাবাজির চক্র স্থায়ীভাবে ভাঙা কঠিন।

চাঁদার বিরোধে হামলা-হত্যার অভিযোগ

গত মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) দুপুরে কেরানীগঞ্জের আরশীনগর এলাকার রাজ সেলুনে ফরহাদ হোসেন (২৫) নামে এক মাছ ব্যবসায়ীকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, রাজধানীর মোহাম্মদপুরে ফুটপাতে দোকান বসানো এবং চাঁদা না দেওয়াকে কেন্দ্র করে বিরোধের জেরে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা তার ওপর হামলা চালায়।

তবে পুলিশ বলছে, নিহত ফরহাদও কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। পূর্ব বিরোধের জেরে প্রতিপক্ষ তাকে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যা করে।

এর মাত্র দুই দিন আগে, ১৩ সেপ্টেম্বর রাতে রাজধানীর বাড্ডায় বাসায় ঢুকে মো. রানা (৩৫) নামে এক যুবককে গুলি করে দুর্বৃত্তরা। হোসেন মার্কেটের পেছনে ময়নারবাগ বউবাজার এলাকায় ঘটনাটি ঘটে। আহত অবস্থায় তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নেওয়া হয়। ওই হামলার পেছনেও চাঁদা না দেওয়ার অভিযোগ সামনে এসেছে।

চট্টগ্রামে চিকিৎসক এম ওয়াই এফ পারভেজের অভিজ্ঞতা ভিন্ন। তবে অভিযোগ একই ধরনের। তিনি গণমাধ্যমে বলেছেন, বিদেশি নম্বর ব্যবহার করে ‘বড় সাজ্জাদ’ ও তার সহযোগী রায়হানের পরিচয়ে কয়েক দফা ফোন করে তার কাছে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। টাকা না দিলে চেম্বারে এসে গুলি করে হত্যার হুমকিও দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

৩ সেপ্টেম্বর হাটহাজারী থানায় করা সাধারণ ডায়েরিতে পারভেজ উল্লেখ করেন, আগের দিন রাত ১০টা ৫৪ মিনিটের দিকে রোগীদের সিরিয়াল নেওয়ার জন্য ব্যবহৃত নম্বরে একটি ফোন আসে। তার সহকারী হ্যাপি বড়ুয়া কলটি ধরে পরে তাকে দেন। অপর প্রান্তের ব্যক্তি নিজেকে ‘বড় সাজ্জাদ’ পরিচয় দিয়ে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে টাকা প্রস্তুত রাখার কথা বলেন।

সাম্প্রতিক এসব ঘটনা নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা তৈরি করেছে জনমনে।

চাঁদাবাজির বিরোধিতা করেও হামলার অভিযোগ

চাঁদাবাজির বিরোধিতা করতে গিয়ে হামলা এবং পরে নিজের বিরুদ্ধেই অপপ্রচারের মুখে পড়ার অভিযোগ করেছেন রাজধানীর মোহাম্মদপুরের ৩৩ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি মো. মান্নান হোসেন শাহীন। গত ১০ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে তিনি দাবি করেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর এলাকায় পাহারার উদ্যোগ নেওয়ার জেরে ওই বছরের ২৮ সেপ্টেম্বর তার ওপর হামলা হয়। দীর্ঘ চিকিৎসা শেষে এলাকায় ফিরলেও হুমকি বন্ধ হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।

শাহীন বলেন, গত ৪ সেপ্টেম্বর চাঁদ উদ্যানের একটি সড়কে সুয়ারেজ লাইনের কাজের সময় চাঁদা দাবির খবর পেয়ে সেখানে যান তিনি। চাঁদাবাজিতে বাধা দেওয়ার পর তার ওপর হামলার চেষ্টা করা হয় এবং সঙ্গে থাকা জিসান আহমেদ আহত হন। এ ঘটনায় থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়ার কথাও জানিয়েছেন তিনি।

শাহীন আরও বলেন, ঘটনার পর উল্টো তাকেই চাঁদাবাজ হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে কাউন্সিলর পদে প্রার্থী হলে তাকে এবং পরিবারের সদস্যদের হত্যা করা হবে বলেও হুমকি দেওয়া হয়েছে।

‘শুধু অ্যারেস্ট করে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ হবে না’

সাবেক আইজিপি বাহারুল আলম মনে করেন, অপরাধ নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বকে শুধু পুলিশের অভিযান কিংবা গ্রেফতারের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখলে কার্যকর সমাধান আসবে না। পুলিশ, আদালত ও কারাগার; ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার এই পুরো কাঠামোকেই একসঙ্গে কার্যকর করতে হবে।

বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘শুধু অ্যারেস্ট করে অপরাধ বা চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না।’

তার মতে, মামলা পরিচালনায় ধারাবাহিকতা ও জবাবদিহি বাড়াতে একটি স্থায়ী ও পেশাদার প্রসিকিউশন সার্ভিস জরুরি। সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে প্রসিকিউটর পরিবর্তিত হলে মামলার ধারাবাহিকতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

তিনি বলেন, কোনও মামলা শেষ পর্যন্ত কেন ব্যর্থ হলো, তদন্তে ঘাটতি ছিল, নাকি সাক্ষ্য-প্রমাণ উপস্থাপনে দুর্বলতা ছিল, অথবা প্রসিকিউশনের প্রস্তুতিতে সমস্যা ছিল—এসব নিয়মিত পর্যালোচনা করতে হবে।

পুলিশের প্রশ্ন বিচারপ্রক্রিয়া নিয়েও

পুলিশ সদর দফতরের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, অপরাধ কমাতে পুলিশ সর্বাত্মক চেষ্টা করছে। তবে পুলিশকে প্রচলিত আইনি কাঠামোর মধ্যেই কাজ করতে হচ্ছে। যেখানে পুলিশের কোনও হাত নেই। পুলিশ চাঁদাবাজ বা অপরাধী গ্রেফতার করে। আর কয়দিন পর আইনের নানা ফাঁক ফোঁকরে বেরিয়ে যায়।

তিনি বলেন, অভিযোগপত্র দেওয়ার পরও অনেক মামলা দীর্ঘদিন নিষ্পত্তিহীন থাকে। আবার কোনও কোনও অভিযুক্ত জামিনে বেরিয়ে পুনরায় অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। এমন অভিযোগও ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে পুলিশের কাছে আসে।

আদালতের ওপর অতিরিক্ত মামলার চাপ কিংবা সক্ষমতার ঘাটতি থাকলে সেটি সমাধানেও রাষ্ট্রকে উদ্যোগী হতে হবে বলে মনে করেন পুলিশের এই কর্মকর্তা। তার মতে, ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার অন্য অংশগুলোর সমস্যা অমীমাংসিত রেখে শুধু পুলিশের ওপর চাপ বাড়িয়ে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন। অপরাধ নিয়ন্ত্রণের জন্য তদন্তের পাশাপাশি বিচারপ্রক্রিয়ার কার্যকারিতাও নিশ্চিত করতে হবে।

অপরাধ চক্রে নতুন সদস্য আসছে কোথা থেকে

অপরাধীকে গ্রেফতার ও বিচারের পাশাপাশি আরেকটি প্রশ্নকে সামনে এনেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করিম সোহাগ। তিনি বলেন, নগরে আসা কাজহীন, আশ্রয়হীন কিংবা সামাজিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ মানুষকে সংঘবদ্ধ অপরাধীরা ব্যবহার করতে পারে। বিশেষ করে ঝুঁকিতে থাকা শিশু-কিশোরদের চাঁদাবাজি, মাদক পরিবহনসহ বিভিন্ন অপরাধে ব্যবহার করার প্রবণতা উদ্বেগের বিষয়।

তিনি মনে করেন, পারিবারিক অস্থিরতা, দিকনির্দেশনার অভাব, কর্মসংস্থানের সংকট এবং বন্ধু বা আশপাশের পরিবেশের প্রভাব একজন ব্যক্তি কীভাবে অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে, তা বুঝতে এসব কারণ বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। ছোটখাটো অপরাধ দিয়ে শুরু করা কেউ ধীরে ধীরে সহিংস কিংবা সংঘবদ্ধ অপরাধের অংশ হয়ে উঠতে পারে। ফলে শুধু গ্রেফতার নয়, অপরাধে প্রবেশের পথ বন্ধ করাও গুরুত্বপূর্ণ।

এ জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ, পুনর্বাসন, পারিবারিক সহায়তা এবং ঝুঁকিপূর্ণ শিশু-কিশোরদের জন্য কার্যকর সামাজিক সুরক্ষা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন তিনি।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, চাঁদার দাবি প্রত্যাখ্যান করার পর একজন মাছ ব্যবসায়ী আবার নিশ্চিন্তে দোকান বসাতে পারবেন কিনা, একজন চিকিৎসক নিরাপদে চেম্বারে রোগী দেখতে পারবেন কিনা কিংবা কোনও নাগরিক নিজের ঘরে নিরাপদ বোধ করবেন কিনা, সেটা নিশ্চিত করতে হবে সরকার কিংবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকেই।