হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বহিরাঙ্গন যেন ‘সিএনজি-স্ট্যান্ডে’ পরিণত হয়েছে। যাত্রী নিয়ে এসে নামানোর পর সিএনজিচালিত অটোরিকশাগুলো বিমানবন্দরের বহির্গমন ও আগমনী ক্যানোপির বিভিন্ন স্থানে এলোমেলোভাবে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। এরপর ডেকে ডেকে যাত্রী ওঠানো হয়। ক্যানোপির বাইরেও কার পার্কিং ও এর আশপাশজুড়ে থাকে সিএনজি।
যাত্রী নিয়ে সিএনজি প্রবেশের পর দ্রুত চলে যাওয়ার নির্দেশনা থাকলেও কর্তব্যরত এয়ারপোর্ট আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) সদস্যরা এগুলো দেখার পরও সরাতে বলেন না। সরানোর কথা বলা হলে জাহিদ নামের এক সদস্য উল্টো বলেন, ‘তাদেরও পেট আছে। তারা যাত্রী নেওয়ার জন্য এসেছে। যাত্রী পেলেই চলে যাবে।’
বৃহস্পতিবার দুপুরে সরেজমিন বিমানবন্দর ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে। আগমনী ক্যানোপি-২-এ দেখা যায়, যাত্রী নিতে একের পর এক গাড়ি প্রবেশ করছে। গাড়িগুলো সারিবদ্ধ থাকার কথা থাকলেও এর কোনো বালাই নেই। ক্যানোপির ভেতরেই এলোমেলোভাবে গাড়ি রাখার ফলে দীর্ঘ সারিও তৈরি হয়েছে। এর মাঝেও আগে থেকে দাঁড়িয়ে থাকা সিএনজি-চালকরা যাত্রী নেওয়ার জন্য ডাকাডাকি করছেন।
এলোমেলোভাবে গাড়ির সারির কারণে যাত্রীরাও ঠিকমতো বের হতে পারছেন না। অথচ ক্যানোপির এক পাশে এপিবিএন সদস্যরা খোশগল্পে ব্যস্ত। তারা তাদের নির্ধারিত স্থানে নির্ভার বসে আছেন। একদিকে দুই-তিনটি করে সিএনজি দাঁড় করিয়ে রাখা, এলোমেলো গাড়ি এবং যাত্রীর স্বজনদের এলোমেলোভাবে দাঁড়িয়ে থাকায় যাত্রীরা যে সুন্দরভাবে বের হবেন, তার কোনো বালাই নেই। আবার অনেকেই মালামাল হারানোর ভয়ে ট্রলির ওপর থাকা মালামাল শক্ত করে ধরে আছেন।
ক্যানোপি-২-এর পর ক্যানোপি-১-এ গিয়েও ভেতরে সিএনজি দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে কর্তব্যরত এপিবিএন সদস্যদের সিএনজি কেন দাঁড়িয়ে আছে; এমন কথা জিজ্ঞাসা করা মাত্র তারা সিএনজির চালককে খুঁজতে থাকেন। বেশ কিছুক্ষণ খোঁজার পরও ওই সিএনজি চালককে তারা খুঁজে পাননি।
ক্যানোপি ছাড়াও উপরের বহিরাঙ্গনের ক্যানোপির একই অবস্থা লক্ষ্য করা যায়। যাত্রী নামানোর পর বের হয়ে যাওয়ার রাস্তায় সিএনজি চালকরা সিএনজি দাঁড় করিয়ে যাত্রী খুঁজছেন। আগমনী ও বহির্গমন ক্যানোপির বাইরে পুরো বিমানবন্দরজুড়েই একপ্রকার অবস্থান। বিমানবন্দরের কার পার্কিংয়ের রাস্তা ঘেঁষে দুই-তিনটি করে সিএনজি দাঁড়ানো।
দেশের বাইরে থেকে বিমানবন্দরে নামার পর বের হয়ে এমন অবস্থা দেখলে যে কারও মনেই হতে পারে, গাড়ির পাশাপাশি এখানে সিএনজি স্ট্যান্ডও আছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিমানবন্দরে আসা এই সিএনজিগুলো যাত্রীদের কাছ থেকে রাজধানীর যেকোনো স্থানে যেতে স্বাভাবিকের চেয়ে দুই-তিন গুণ ভাড়া বেশি নেয়। এ কারণে তারা নানাভাবে এপিবিএনকে ম্যানেজ করে এসব জায়গায় যাত্রীর আশায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকে।
আর ভাড়া বেশি নেওয়ার বিষয়টিও প্রতিবেদকের সামনেই ঘটে। রিয়াদ থেকে আসা মনোয়ারুল ইসলাম নামের এক যাত্রী ক্যানোপি-২ থেকে বিমানবন্দরের ৮ নম্বর গেটে যাবেন। সিএনজি চালক তার কাছে ২৫০ টাকা ভাড়া চেয়ে বসেন। অথচ ক্যানোপি-২ থেকে ৮ নম্বর গেট প্রায় দেখাই যায়। একপর্যায়ে ওই যাত্রী রেগে তার ওপর ক্ষোভ ঝাড়েন।
ক্যানোপির ভেতর থেকে বাইরে বের হওয়ার রাস্তায় দাঁড় করানো সিএনজিগুলোর চালকদের কাছে প্রতিবেদক পরিচয় গোপন করে ধানমন্ডি আসতে ভাড়া কত লাগবে তা জানতে চান। চালকরা প্রতিবেদকের কাছে ৮০০ টাকা ভাড়া চান। এত বেশি ভাড়া কেন জানতে চাইলে তারা বলেন, এটাই ভাড়া। মূলত এভাবে থেকে যাত্রীদের পকেট কাটাই তাদের উদ্দেশ্য।
মনোয়ার নামের সেই যাত্রী বলেন, ‘এখান থেকে ৮ নম্বর গেট কতদূর। সে যে ২৫০ টাকা ভাড়া চাইলো, কিভাবে। এদের কোনো নীতি আছে বলে মনে হয় না।’
রিয়াদ থেকে আসা যাত্রী আরমান রহমান বলেন, ‘আমরা দেশের বাইরে থেকে বিমানবন্দরের নানা রকম নেতিবাচক খবর দেখি। দেশে আসার পর তা সত্যিই মনে হচ্ছে। এখানে কোনও শৃঙ্খলা আছে বলে আমার কাছে মনে হয়নি।’
যাত্রীসহ বিমানবন্দরে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ বলছেন, যেভাবে এলোমেলো গাড়ি পার্কিং আর সিএনজিগুলো থাকে, তাতে বিমানবন্দরের সৌন্দর্য হারাচ্ছে, তেমনি শৃঙ্খলা বলেও কিছু থাকছে না।
এ বিষয়ে বেবিচকের সদস্য নিরাপত্তা এয়ার কমোডর আসিফ ইকবাল বলেন, ‘বিমানবন্দরের বহিরাঙ্গনের বিষয়টি তদারকি করে এপিবিএন। আমরা এগুলো অভিযোগ পাই, তাদের বলি। কিন্তু কতটা বাস্তবায়ন করে তারাই বলতে পারেন।’
এপিবিএনের পুলিশ সুপার রেজাউল করিম বলেন, ‘এ রকম হওয়ার কথা না। তারপরও খোঁজখবর নিয়ে আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবো।’









