রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে প্রায় প্রতিদিনই উদ্ধার হচ্ছে মরদেহ। প্রথমে অজ্ঞাত হিসেবে উদ্ধার হলেও পরে অনেকের পরিচয় মিলছে. স্বজনেরা এসে নিয়ে যাচ্ছেন তাদের। কিন্তু যাদের পরিচয় শনাক্ত করা যায় না, তাদের ঠাঁই হয় মর্গে ‘বেওয়ারিশ’ মরদেহ হিসেবে। আইনি প্রক্রিয়া শেষে সেসব মরদেহ দাফন ও সৎকারের জন্য হস্তান্তর করা হয় আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের কাছে। চলতি বছরের প্রথম আট মাসে সংস্থাটি ৪০০টি বেওয়ারিশ মরদেহ দাফন ও সৎকার করেছে। যা সমাজে সহিংসতা, নিঃসঙ্গতা, পরিচয়হীনতা ও তদন্তসঙ্কটের একটি উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এসব মরদেহ উদ্ধারের পেছনে একক কোনো কারণ নেই। পারিবারিক বিরোধ, জমিজমা ও দেওয়ানি দ্বন্দ্ব, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ, প্রতিশোধপরায়ণতা, ঈর্ষা-প্রতিহিংসাসহ নানা সামাজিক ও ব্যক্তিগত কারণ এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে।
অন্যদিকে পুলিশ বলছে, অজ্ঞাত হিসেবে উদ্ধার হওয়া সব মরদেহই হত্যাকাণ্ডের শিকার নয়। সড়ক দুর্ঘটনা, পানিতে ডুবে মৃত্যু, অসুস্থতা, ভবঘুরে জীবন, মানসিক ভারসাম্যহীনতা ও দীর্ঘদিন পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার কারণও রয়েছে এর পেছনে।
সবশেষ বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর ভাটারার ঢালিবাড়ি ঝিল থেকে অজ্ঞাত এক ব্যক্তির ভাসমান মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, মরদেহটি অর্ধগলিত অবস্থায় ছিল এবং তার পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা চলছে।
একই দিন সকালে ময়মনসিংহ সদরের বেগুনবাড়ি স্লুইসগেট এলাকা থেকে ড্রামের ভেতর অজ্ঞাতপরিচয় এক ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। স্থানীয়রা পানিতে একটি ড্রাম ভাসতে দেখে পুলিশকে খবর দিলে ঘটনাস্থল থেকে ড্রামটি উদ্ধার করা হয়। ড্রামের ভেতর আনুমানিক ৫০ বছর বয়সী এক ব্যক্তির মরদেহ পাওয়া যায়।
কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ শিবিরুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, ওই ব্যক্তিকে হত্যার পর মরদেহ ড্রামের ভেতরে রেখে পানিতে ফেলে দেওয়া হয়েছে। নিহতের পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা চলছে।
এর আগে গত ১৪ সেপ্টেম্বর একদিনে যাত্রাবাড়ী, মতিঝিল, শাহবাগ, কামরাঙ্গীরচর ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ প্রাঙ্গণ থেকে এক নারীসহ অজ্ঞাত পাঁচজনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ময়নাতদন্তের জন্য লাশগুলো ঢাকা মেডিকেল কলেজের মর্গে রাখা হয়।
১২ সেপ্টেম্বর রাজধানীতে তিন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এর মধ্যে আদাবরের হাক্কারপাড় খালে ভেসে আসা একটি স্কুলব্যাগ থেকে খণ্ডিত অবস্থায় এক কিশোরীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। একই দিনে জাতীয় ঈদগাহ ময়দান ও হাইকোর্ট মাজারসংলগ্ন ফুটপাত থেকে অজ্ঞাতপরিচয় আরও দুই ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তাদের একজনের বয়স আনুমানিক ৬৫ এবং অন্যজনের ৪৫ বছর।
আদাবর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহিদুল ইসলাম জাহাঙ্গীর বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, খাল থেকে একটি স্কুলব্যাগে কিশোরীর মরদেহের চারটি খণ্ড উদ্ধার করা হয়। প্রায় ১৮ ঘণ্টা পর তার আরও দুটি পা উদ্ধার করা হয়। নিহত কিশোরীর বয়স ১৪ থেকে ১৬ বছরের মধ্যে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, নিহত কিশোরির আঙুলের ছাপ সংগ্রহ করে জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) সার্ভারে মিলিয়ে দেখার চেষ্টা করা হয়। তবে তার এনআইডি না থাকায় আঙুলের ছাপের সঙ্গে মেলানোর মতো কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। খণ্ডিত মরদেহটি শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজের মর্গে রাখা হয়েছে। এ ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে আদাবর থানায় হত্যা মামলা করেছে।
অপরদিকে একই দিন জাতীয় ঈদগাহ ময়দান ও হাইকোর্ট মাজারের কাছে ফুটপাত থেকে উদ্ধার হওয়া দুই ব্যক্তির মধ্যে একজনের পরিচয় পাওয়া গেছে। শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনিরুজ্জামান বলেন, পথচারীদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মরদেহ দুটি উদ্ধার করা হয়। তাদের একজনের নাম জুয়েল, বাড়ি লালবাগ। অন্যজনের পরিচয় এখনও জানা যায়নি।
আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে সংস্থাটি ৪০০টি বেওয়ারিশ মরদেহ দাফন ও সৎকার করেছে। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ৩০টি, ফেব্রুয়ারিতে ৫৯টি, মার্চে ৫২টি, এপ্রিলে ৪৬টি, মে মাসে ৫৬টি, জুনে ৬৭টি, জুলাইয়ে ৪২টি এবং আগস্টে ৪৮টি মরদেহ রয়েছে। এসবের মধ্যে ৭৪টি মরদেহ দাফন করা হয়েছে জুরাইন কবরস্থানে এবং ৩২৫টি মোহাম্মদপুরের রায়েরবাজার কবরস্থানে। একটি মরদেহ সৎকার করা হয়েছে পোস্তগোলা শ্মশানঘাটে। এর আগে ২০২৪ সালে ৫৭০টি এবং ২০২৫ সালে ৬৪৩টি বেওয়ারিশ মরদেহ দাফন ও সৎকার করে সংস্থাটি।
ডিএমপির সূত্র বলছে, রাজধানীর সড়ক, রেললাইন, পার্ক, ফুটপাত, নদী, খাল ও ঝিলসহ বিভিন্ন স্থান থেকে প্রায় প্রতিদিনই অজ্ঞাতনামা মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এসব মরদেহের সবগুলো হত্যাকাণ্ডের শিকার নয়। সড়ক দুর্ঘটনা, পানিতে ডুবে মৃত্যু কিংবা অসুস্থতায়ও অনেকের মৃত্যু হয়। নিহতদের অনেকে ভবঘুরে, মানসিক ভারসাম্যহীন, গৃহহীন বা দীর্ঘদিন পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা মানুষ। জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্মনিবন্ধন না থাকায় তাদের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয় না। ফলে আইনি প্রক্রিয়া শেষে তাদের বেওয়ারিশ মরদেহ হিসেবে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
পুলিশ আরও বলছে, হত্যাকাণ্ডের শিকার কিছু মানুষের পরিচয়ও নানা কারণে শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে হত্যার পর মরদেহ গুমের উদ্দেশ্যে খণ্ডবিখণ্ড করা হলে বা বিকৃত করা হলে ফিঙ্গারপ্রিন্টসহ গুরুত্বপূর্ণ আলামত নষ্ট হয়ে যায়। অর্ধগলিত মরদেহের ক্ষেত্রেও পরিচয় শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। এ ধরনের ক্ষেত্রে মরদেহের ডিএনএ সংরক্ষণ করা হয়। তবে মর্গে জায়গার সংকট থাকায় দীর্ঘদিন মরদেহ সংরক্ষণ সবসময় সম্ভব হয় না।
পুলিশ ও আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের তথ্য অনুযায়ী, যেসব মরদেহের পরিচয় প্রযুক্তির মাধ্যমে শনাক্ত করা সম্ভব হয় না, সেগুলো পরে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে শনাক্তের চেষ্টা করা হয়। আইনি প্রক্রিয়া শেষে এবং সুরতহাল ও ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হওয়ার পর পুলিশ সেগুলো বেওয়ারিশ হিসেবে হস্তান্তর করে।
আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের দাফনসেবা কর্মকর্তা কামরুল আহমেদ বলেন, পুলিশের ক্লিয়ারেন্স ছাড়া কোনো মরদেহ বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয় না। সুরতহাল ও ময়নাতদন্তের পর পুলিশ মরদেহ বেওয়ারিশ হিসেবে তাঁদের কাছে হস্তান্তর করলে তারা দাফন বা সৎকার করেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান রেজাউল করিম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, বর্তমানে বিভিন্ন জায়গায় যে অপরাধ, হত্যাকাণ্ড ও মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা ঘটছে, তার পেছনে একক কোনো কারণ নেই। পারিবারিক বিরোধ, জমিজমা ও দেওয়ানি দ্বন্দ্ব, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ, প্রতিশোধপরায়ণতা, ঈর্ষা-প্রতিহিংসাসহ নানা সামাজিক ও ব্যক্তিগত কারণ এতে ভূমিকা রাখছে।
তিনি বলেন, ‘পারিবারিক বিরোধের ক্ষেত্রে আমরা দেখছি, জমিজমা বা অন্যান্য বিরোধ অনেক সময় সহিংসতায় রূপ নিচ্ছে। প্রতিশোধপরায়ণতা থেকে গুরুতর আঘাত, এমনকি হত্যাকাণ্ড পর্যন্ত ঘটছে। আবার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন পক্ষ নিজেদের প্রভাব বা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। ব্যবসা, ঠিকাদারি বা অন্য কোনো সুযোগ প্রতিযোগিতা ছাড়াই নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার প্রবণতা থেকে প্রতিদ্বন্দ্বীকে হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছে। কোথাও কোথাও সেই প্রতিদ্বন্দ্বীকে সরিয়ে দিতেও সহিংসতার আশ্রয় নেওয়া হচ্ছে।’
রেজাউল করিম আরও বলেন, ‘এসব অপরাধ নিয়ন্ত্রণ শুধু সরকার বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একার পক্ষে সম্ভব নয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কমান্ড ও মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম আরও কার্যকর ও সমন্বিত করা প্রয়োজন। একইসঙ্গে স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে তথ্য সংগ্রহ, নজরদারি ও অপরাধ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে।’
তার মতে, সরকার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও স্থানীয় জনগণের সমন্বয়ে গ্রাম ও উপজেলা পর্যায়ে কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে। তিনি বলেন, ‘যেসব এলাকায় বারবার অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে বা মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা বেশি ঘটছে, সেসব এলাকাকে আলাদাভাবে চিহ্নিত করে নজরদারি, মনিটরিং এবং প্রয়োজনে বিশেষ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন বাড়ানো দরকার। নিয়মিত সুপারভিশন ও স্থানীয় পর্যায়ের সমন্বিত উদ্যোগ জোরদার করা গেলে এ ধরনের অপরাধ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।’
পুলিশ সদর দফতরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স) এ এইচ এম শাহাদাত হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, অজ্ঞাত হিসেবে কোনো মরদেহ উদ্ধার হলে প্রযুক্তির সাহায্যে প্রথমে তার পরিচয় নিশ্চিতের চেষ্টা করা হয়। পরিচয় পাওয়ার পর নিহত হওয়ার কারণ অনুসন্ধান করা হয়। যদি হত্যাকাণ্ড হয়ে থাকে, তাহলে তদন্তের মাধ্যমে তা উদঘাটন করা হয় এবং জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হয়। তবে কিছু মরদেহ গলে যাওয়া বা বিকৃত থাকায় পরিচয় শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।