আলোচিত সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুন কেন আত্মহত্যা করেছেন, তা এখনও পরিষ্কার করতে পারেনি ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। বিয়ের পর থেকে কারা মরিয়মকে মানসিক যন্ত্রণা দিতেন এবং কী কারণে তিনি এমন পরিস্থিতিতে পড়েছিলেন, রিমান্ডে সে বিষয়ে পরিষ্কার তথ্য দেননি নজরুল। আত্মহত্যার পেছনের পুরো কারণ বা মোটিভ জানতে দ্বিতীয় দফায় আরও চার দিনের রিমান্ডে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে ডিবির তেজগাঁও টিম। মামলার তদন্ত সংস্থা ডিবি সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
প্রথম দফার চার দিনের রিমান্ড শেষে বৃহস্পতিবার নজরুল ইসলামকে আদালতে হাজির করে পুনরায় সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবির ইন্সপেক্টর মোহাম্মদ সালাউদ্দিন আহমেদ। শুনানি শেষে আদালত তার চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ইন্সপেক্টর সালাউদ্দিন আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, গত চার দিনের রিমান্ডে সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম যা বলেছেন, তাতে তারা সন্তুষ্ট হতে পারেননি। তার বক্তব্য অনুযায়ী, এমন কথায় কেউ আত্মহত্যা করতে পারেন না।
তিনি বলেন, আত্মহত্যা করা মরিয়ম খাতুনের বয়স কম এবং তিনি আবেগী ছিলেন। কিন্তু এমন একটি অবস্থার মধ্যে তাকে ফেলা হয়েছিল, যা তিনি আর সহ্য করতে পারেননি। এ কারণে তিনি আত্মহত্যা করতে বাধ্য হন। তবে সেই অবস্থাটি কী ছিল এবং কারা তাকে মানসিক যন্ত্রণা দিতেন, সেটি পরিষ্কার হতে চায় ডিবি। কিন্তু নজরুল এ বিষয়ে কোনও তথ্য দিচ্ছেন না।
সালাউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘একটা লোক তো আর এমনি এমনি আত্মহত্যা করবেন না। তাকে এই বিষয়টি পরিষ্কার করতে হবে। আর বিয়েটাও তো স্বাভাবিক ছিল না। আমরা মনে করছি, যেহেতু বিয়েটা অস্বাভাবিক ছিল, সুতরাং তার সঙ্গে খুবই অস্বাভাবিক আচরণ করা হয়েছে। যার কারণে মরিয়ম আত্মহত্যা করেছে। সেই বিষয়গুলো তিনি তো ক্লিয়ার করছেন না। যতক্ষণ না পর্যন্ত পুরো মোটিভ ক্লিয়ার হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত আমাদের জিজ্ঞাসাবাদ অব্যাহত থাকবে।’
তিনি আরও বলেন, মরিয়মের সুইসাইডাল নোটও তদন্তে আমলে নেওয়া হয়েছে। সেখানে কেন এসব লেখা হয়েছিল, সেটিও জানতে হবে।
শারীরিক নির্যাতনের বিষয়ে জানতে চাইলে তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, নজরুল এ বিষয়েও কোনও তথ্য দেননি। আর মেডিক্যাল রিপোর্ট এখনও পাওয়া যায়নি। মেডিক্যাল রিপোর্ট পাওয়ার পর এ বিষয়ে বলা যাবে।
প্রথম চার দিনের রিমান্ডে যা বলেছেন নজরুল
তদন্ত সংস্থার কর্মকর্তারা জানান, রিমান্ডে দেওয়া বক্তব্যে নজরুল ইসলাম দাবি করেন, ঘটনার সময় তিনি ন্যাম ভবনের বাসাতেই অবস্থান করছিলেন।
তিনি জানান, সকালে পারিবারিক ও ব্যক্তিগত কাজে বাসা থেকে বের হয়ে দুপুর আনুমানিক ২টার দিকে ন্যাম ভবনের ফ্ল্যাটে ফেরেন। এলাকার তার কয়েকজন রাজনৈতিক সহকর্মী ও নেতাকর্মী এলে তিনি তাদের সঙ্গে কথা বলেন এবং একসঙ্গে দুপুরের খাবার খান।
খাওয়া শেষ করে দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাবার খেয়েছেন কিনা তা জানতে তার ঘরের সামনে যান। কিন্তু ঘরটি ভেতর থেকে তালাবদ্ধ ছিল। বারবার ডাকাডাকি করেও কোনও সাড়াশব্দ না পেয়ে তিনি পুলিশে খবর দেন। পুলিশ এসে দরজা ভেঙে ঝুলন্ত অবস্থায় মরিয়মের লাশ উদ্ধার করে।
ভাইরাল ভিডিও ও মানসিক অশান্তি
জিজ্ঞাসাবাদে নজরুল দাবি করেন, মরিয়মের সঙ্গে তার সম্পর্ক ভালো ছিল। তবে তাদের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর মরিয়ম চরম মানসিক অশান্তিতে ভুগছিলেন। মরিয়ম প্রায়ই বলতেন, মানুষ এখনও ভিডিওটি দেখছে। বিষয়টি নিয়ে তিনি প্রতিনিয়ত মানসিক চাপে থাকতেন।
গত রবিবার সন্ধ্যায় সংসদ ভবনের উল্টো দিকের ন্যাম ভবনের একটি ফ্ল্যাট থেকে গাজী নজরুলের দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়মের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এরপর রাতে সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম ও তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকছুদাকে হেফাজতে নেয় পুলিশ।
রাতেই আত্মহত্যার প্ররোচনার অভিযোগে সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম, তাঁর স্ত্রী মাকছুদা ইসলাম ও নিহতের মামা ওবায়দুর রহমানের বিরুদ্ধে মামলা করেন মরিয়মের বাবা এস এম মাসুম বিল্লাহ।
পরদিন শেরেবাংলা নগর থানার এসআই মো. শামসুজ্জোহা সরকারের আবেদনে গাজী নজরুল ইসলামকে চার দিন ও মাকছুদা বেগমকে একদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। সেদিন রাতেই মামলার তদন্তভার গোয়েন্দা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। রিমান্ড শেষে মাকছুদা বেগমকে মঙ্গলবার কারাগারে পাঠানো হয়েছে। আর নজরুল ইসলামের চার দিনের রিমান্ড শেষে বৃহস্পতিবার ফের সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করা হয়।
এ মামলার আরেক আসামি মরিয়মের মামা ওবায়দুর রহমানকে গ্রেফতারের পর বুধবার কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
এজাহারে যা বলা হয়েছে
মামলার এজাহারে মাসুম বিল্লাহ অভিযোগ করেছেন, গত জুনে তার শ্যালক ওবায়দুর রহমানের ‘প্রত্যক্ষ প্ররোচনায়’ সংসদ সদস্য গাজী নজরুলের সঙ্গে বাদীর বড় মেয়ে মরিয়মের (১৯) বিয়ে হয়। সংসদ ভবনের বিপরীত পাশে ৫ নম্বর ন্যাম ভবনের ২০৩ নম্বর বাসায় নজরুল ও মাকছুদার সঙ্গে থাকতেন মরিয়ম।
এজাহারে বলা হয়, বিয়ের পর থেকেই বিভিন্ন বিষয় নিয়ে নজরুল ও মাকছুদা শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করতেন বলে মরিয়ম তাঁর পরিবারকে বলে গেছেন।
এর মধ্যে গত রবিবার বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে নজরুল মোবাইল ফোনে বাদীকে দ্রুত বাসায় যেতে বলেন। সেখানে গিয়ে মরিয়মকে গলায় ফাঁস দিয়ে ঝুলে থাকতে দেখেন বাবা মাসুম বিল্লাহ।
তিনি এজাহারে লিখেছেন, লাশ উদ্ধারের সময় মেয়ের বিছানার ওপরে তার লেখা ‘সুইসাইড নোট’ দেখতে পান।
একটি চিরকুটে লেখা আছে, ‘শুধু মায়ায় পড়েছি বলে বারবার তোমার কাছে নত হই…তা না হলে যতটা সস্তা ভাবছো ততটা সস্তা আমি নই…।’
আরেকটিতে লেখা, ‘আমি অতি বিশ্বাস করে যুদ্ধে নেমেছিলাম তার সাথে, জিততে পারিনি হেরে গেলাম ময়দানে। জিতবইবা কেমনে, যুদ্ধের শেষ প্রান্তে যেয়ে দেখি তুমিতো ছিলে বিপক্ষের সেনাপতি।’
আরও লেখেন, ‘আমি হেরেছি তুমি জিতেছো, কারণ আমি তোমাকে বিশ্বাস করেছিলাম বলেই তো ঠকিয়ে জিততে পেরেছো। আমি ধ্বংসের শেষ দাঁড়িয়েও মুখে হাসি রেখেছি। ভেবে নাও এই হাসির কারণই হবে তোমার ধ্বংসের কারণ।’
আরেকটি চিরকুটে দুটি লেখা রয়েছে। একটিতে আছে, ‘সে ছিল অন্য নারীর স্বামী। কাগজে কলমে অধিকার ছিল তার বউ এর…!!! আর আমি ছিলাম বোকা…!!! অন্য কারও স্বামীকে বানিয়েছিলাম নিজের শখের পুরুষ…!!!’
অপর লেখায় আছে, “কাউকে অর্ধেক পাওয়ার চেয়ে হারিয়ে ফেলা বেশির সম্মানের। কারণ ভালোবাসা কখনোই ভাগ করে নেওয়ার বিষয় নয়…ভালোবাসা হয় সম্পূর্ণ, না হয় অপূর্ণ!”
এজাহারে বলা হয়েছে, রবিবার বিকাল ৩টা থেকে সাড়ে ৫টার মধ্যে মরিয়ম আত্মহত্যা করে থাকতে পারেন।
যে ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছিল
গত ২০ জুলাই রাতে ঢাকার মগবাজারের একটি হোটেলে মরিয়মের সঙ্গে এমপি নজরুলের অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। এ বিষয়ে প্রথমে জামায়াতের নেতাকর্মীরা দাবি করেন, এটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে তৈরি করা।
পরে সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম ফেসবুক পোস্টে ওই তরুণীকে দ্বিতীয় স্ত্রী বলে দাবি করেন। সাংগঠনিক তদন্তে তার ‘নৈতিক স্খলন’ প্রমাণিত হওয়ার কথা জানিয়ে ২২ জুলাই গাজী নজরুলকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেয় জামায়াতে ইসলামী। বিরোধী দল এ সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে পরে স্পিকার ও নির্বাচন কমিশনকে চিঠি দেয়।