স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও সালমানের স্টুডিওতে হামলা, বিচার দাবি এইচআরএসএসের

রাজধানীর মিরপুরে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, লুটপাট, ভাঙচুর ও স্থাপনা ধ্বংস এবং কনটেন্ট নির্মাতা সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও তীব্র নিন্দা জানিয়েছে হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)। এসব ঘটনায় জড়িতদের বিচার এবং ক্ষতিগ্রস্ত স্বাস্থ্যসেবা পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।

রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানায় এইচআরএসএস। সংগঠনটি বলেছে, এসব ঘটনা শুধু ফৌজদারি অপরাধের বিষয় নয়। এর সঙ্গে জীবন ও নিরাপত্তার অধিকার, স্বাস্থ্যসেবার অধিকার, সম্পত্তির অধিকার, ব্যক্তিগত মর্যাদা, পেশাগতভাবে কাজ করার স্বাধীনতা এবং আইনের শাসনের বিষয়ও জড়িত।

মানবাধিকার সংস্থাটির বিবৃতিতে বলা হয়, মিরপুর-১-এর রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে মধ্যরাতে দুই শতাধিক মুখোশধারী ব্যক্তি হামলা চালিয়ে নিরাপত্তাকর্মীদের জিম্মি ও মারধর করেন। স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ওষুধ, সরকারি টিকা, টিকাদান-সংক্রান্ত রেজিস্টার ও নথিপত্র, পরিবার পরিকল্পনা সামগ্রী, চিকিৎসা সরঞ্জামসহ বিভিন্ন মালামাল লুট এবং পরে ভারী যন্ত্রপাতি দিয়ে একটি স্থায়ী ও তিনটি সেমিপাকা ভবন ধ্বংস করা হয়েছে বলে মামলা ও গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি অনুযায়ী, এতে প্রায় দেড় কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।

রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি দীর্ঘদিন ধরে বিশেষ করে নিম্ন আয়ের ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠী, নারী ও শিশুদের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, মাতৃস্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনা এবং টিকাদান সেবা দিয়ে আসছিল। এইচআরএসএস বলেছে, স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানটি হামলা ও ধ্বংসের মাধ্যমে অকার্যকর হয়ে পড়ায় সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার অধিকার এবং জীবন রক্ষার ওপর এর সরাসরি প্রভাব পড়ে।

সরকারি টিকা এবং টিকাদান-সংক্রান্ত রেজিস্টার ও নথিপত্র লুট বা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অভিযোগকে বিশেষভাবে উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করেছে সংস্থাটি। তাদের মতে, স্বাস্থ্য-নথি ও টিকা-সংক্রান্ত তথ্যের ক্ষতি হলে শিশুদের টিকাদান কার্যক্রম, পরবর্তী ডোজ নিশ্চিতকরণ এবং জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই ঘটনাটিকে শুধু জমি বা স্থাপনা-সংক্রান্ত বিরোধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলে মনে করে এইচআরএসএস।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকার তদন্ত দাবি

বিভিন্ন প্রতিবেদনে হামলার সময় ঘটনাস্থলে পুলিশের উপস্থিতি এবং পুলিশের সামনে লুটপাটের অভিযোগ উঠে আসায় এ বিষয়েও স্বচ্ছ তদন্তের দাবি জানিয়েছে এইচআরএসএস।

সংস্থাটি বলেছে, সিসিটিভি ফুটেজে পুলিশের গাড়ি ঘটনাস্থলের কাছে থাকার সময়ও মালামাল পিকআপে তোলার দৃশ্য দেখা গেছে বলে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।

এইচআরএসএসের মতে, শুধু হামলাকারীদের শনাক্ত করাই যথেষ্ট নয়। পুলিশ কখন ঘটনাটি সম্পর্কে জানতে পেরেছে, কখন ঘটনাস্থলে পৌঁছেছে, কেন হামলা ও ধ্বংসযজ্ঞ প্রতিরোধ করা যায়নি এবং ঘটনাস্থলে উপস্থিত পুলিশ সদস্যরা কী ভূমিকা পালন করেছেন, এসব প্রশ্নের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। দায়িত্ব পালনে অবহেলা বা যোগসাজশের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধেও আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।

সালমানের স্টুডিওতে হামলার নিন্দা

একই সময়ে রাজধানীর ইসিবি চত্বর এলাকায় কনটেন্ট নির্মাতা সালমান মুক্তাদিরের ‘ব্রাউনফিশ’ স্টুডিওতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনাতেও তীব্র নিন্দা জানিয়েছে এইচআরএসএস।

সংস্থাটি বলেছে, সংঘবদ্ধ একটি দল স্টুডিওতে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর ও মালামাল লুট করে এবং সেখানে থাকা ব্যক্তিদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ রয়েছে। ঘটনার প্রকৃত কারণ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা জরুরি।

এইচআরএসএস সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, লুটপাট ও ধ্বংসযজ্ঞের পূর্ণাঙ্গ, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের দাবি জানিয়েছে। হামলার সঙ্গে জড়িত প্রত্যক্ষ ব্যক্তিদের পাশাপাশি পরিকল্পনাকারী, নির্দেশদাতা, অর্থদাতা ও সহযোগীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি করেছে সংগঠনটি।

এ ছাড়া সরকারি টিকা, স্বাস্থ্য-নথি, ইপিআই রেজিস্টার, ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম উদ্ধার এবং সেগুলোর নিরাপত্তা ও ব্যবহারযোগ্যতা যাচাই করার দাবি জানানো হয়েছে।

ক্ষতিগ্রস্ত স্বাস্থ্যকেন্দ্র দ্রুত পুনঃস্থাপন করে স্বাস্থ্যসেবা চালু এবং সেবা থেকে বঞ্চিত জনগণের জন্য অন্তর্বর্তীকালীন বিকল্প স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা করারও দাবি জানিয়েছে এইচআরএসএস।

ঘটনাস্থলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা সম্পর্কে স্বাধীন ও জবাবদিহিমূলক তদন্ত এবং দায়িত্বে অবহেলা বা যোগসাজশ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।

সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলার ঘটনায়ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত কারণ ও জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে তারা।

কোনও ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা প্রভাবশালী মহল যেন আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে দখল, হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট করতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রকে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে এইচআরএসএস। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান, চিকিৎসাকর্মী, স্বাস্থ্যকর্মী, রোগী এবং সাধারণ নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা ও জবাবদিহিমূলক আইন প্রয়োগের দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।

বিবৃতিতে এইচআরএসএস বলেছে, স্বাস্থ্যসেবা কোনও রাজনৈতিক, ব্যবসায়িক বা স্থানীয় প্রভাবের বিষয় নয়; এটি মানুষের মৌলিক অধিকার ও জনকল্যাণের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র ধ্বংসের অর্থ শুধু একটি ভবন ধ্বংস নয়। এর মাধ্যমে অসংখ্য মানুষের চিকিৎসা, টিকাদান, মাতৃস্বাস্থ্য ও শিশুর স্বাস্থ্যসেবা বাধাগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ঘটনায় দায়ীদের বিচার, ক্ষতিগ্রস্ত স্বাস্থ্যসেবা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছে এইচআরএসএস।