তুচ্ছ ঘটনায় বারবার তিন কলেজের সংঘর্ষ, আতঙ্কে শিক্ষার্থী-শিক্ষক-ব্যবসায়ী

তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজধানীর ঢাকা কলেজ, সিটি কলেজ ও ধানমন্ডি আইডিয়াল কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বারবার সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে। এতে শুধু শিক্ষার্থী নয়, শিক্ষক, পুলিশ প্রশাসন, অভিভাবক ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মধ্যেও আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। কখন কোন ঘটনাকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ শুরু হবে, তা নিয়ে উদ্বেগে থাকেন সংশ্লিষ্টরা।

তিন কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষ বন্ধে গত বছর পুলিশের মধ্যস্থতায় মৌখিক শান্তিচুক্তিও হয়েছিল। তবে এক মাসের মধ্যেই তা ভেঙে যায়। গত এক বছরে নানা কারণে তিন কলেজের শিক্ষার্থীরা ১৫ বারের বেশি সংঘর্ষে জড়িয়েছে। গত আট মাসে অন্তত ১১ বার সংঘর্ষে জড়ানোর তথ্যও রয়েছে। সর্বশেষ রবিবার ঢাকা কলেজ ও আইডিয়াল কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে।

মাঝেমধ্যে সংঘর্ষের ঘটনায় আতঙ্কে থাকেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও। তারা বলেন, শিক্ষার্থীরা নিজেদের মধ্যে কখন কী নিয়ে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন, তা বোঝা কঠিন। এ ধরনের ঘটনা না ঘটাই উচিত বলে মত তাদের।

রমনা থানার উপ-পুলিশ কমিশনার জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘সব মারামারির ঘটনা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সেগুলোর কারণ তুচ্ছ। এসব বিষয় নিয়ে মারামারি হওয়ার কথা নয়। তারপরও শিক্ষার্থীরা মারামারিতে জড়াচ্ছে। এ বিষয়ে আরও কাউন্সেলিং প্রয়োজন’।

পুলিশের সূত্র জানায়, পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী প্রতি মাসে গড়ে ঢাকা কলেজ ৭-৮টি, সিটি কলেজ ৬-৭টি এবং আইডিয়াল কলেজ ৫-৬টি মারামারিতে জড়াচ্ছে। গত ১১ মাসে ঢাকা কলেজ, সিটি কলেজ ও ধানমন্ডি আইডিয়াল কলেজ মিলিয়ে ১২টি মারামারির ঘটনা ঘটেছে। অন্য একটি রিপোর্টে বলা হয়েছে, গত আট মাসে অন্তত ১১ বার সংঘর্ষে জড়িয়েছে এই তিন কলেজ।

এক মাসেই ভেঙে যায় শান্তিচুক্তি

গত বছরের ৯ নভেম্বর ঢাকা কলেজ ও ধানমন্ডি আইডিয়াল কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে নিউ মার্কেট থানা-পুলিশের মধ্যস্থতায় মৌখিক শান্তিচুক্তি হয়। চুক্তি শেষে দুই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা আর মারামারি না করার প্রতিজ্ঞা করেন। এ সময় তারা স্লোগান দেন, ‘আমরা সবাই ভাই ভাই, আমাদের মাঝে বিরোধ নাই।’

গত এক বছরে নানা কারণে ঢাকা কলেজ, আইডিয়াল কলেজ ও সিটি কলেজের শিক্ষার্থীরা ১৫ বারের বেশি সংঘর্ষে জড়ায়। এর মধ্যে সর্বশেষ ছয় মাসে তিনটি বড় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনার পর তৎকালীন রমনা বিভাগের উপকমিশনার মাসুদ আলম শান্তিচুক্তির উদ্যোগ নেন। পরে শিক্ষার্থীরা মৌখিকভাবে ওই চুক্তি করেন।

তবে এক মাসের মাথায়, অর্থাৎ ১০ ডিসেম্বর, আবার সংঘর্ষে জড়ায় ঢাকা কলেজ ও আইডিয়াল কলেজের শিক্ষার্থীরা। এ সময় দুই পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও ইটপাটকেল নিক্ষেপ হয়। ধানমন্ডিতে ঢাকা কলেজের দুটি গাড়ি ভাঙচুর করা হয়। পরে ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীরা আইডিয়াল কলেজের দিকে গেলে আবারও পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে।

যে কারণে বারবার সংঘর্ষ

এই তিন কলেজের দ্বন্দ্বের শুরু কোথায়, তা কেউ জানাতে পারেননি। তবে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, একটি কলেজের এক বা দুজন শিক্ষার্থীকে অন্য কলেজের তুলনামূলক বেশি সংখ্যক শিক্ষার্থী হেনস্তা বা মারধর করার ঘটনাই অনেক সময় বড় সংঘর্ষের সূত্রপাত ঘটায়।

প্রতিটি সংঘর্ষের আগের দিন অথবা ঘটনার কিছু সময় আগে কোনও না কোনও ঘটনা ঘটে। পরে সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই কলেজের শিক্ষার্থীরা বড় সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মূল ঘটনাটি তুচ্ছ হলেও তা দ্রুত ক্যাম্পাসে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর শুরু হয় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও ইটপাটকেল নিক্ষেপ। ভাঙচুর করা হয় কলেজের আশপাশের স্থাপনা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও যানবাহন। বন্ধ হয়ে যায় ওই সড়কে যান চলাচল। ভোগান্তিতে পড়েন সাধারণ মানুষ।

বেশ কয়েক দিন তিন কলেজের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এক কলেজের শিক্ষার্থীদের অন্য কলেজের শিক্ষার্থীদের দেখতে না পারা থেকেও হেনস্তার ঘটনা ঘটে। পরে তা ক্যাম্পাসে ছড়িয়ে পড়ে এবং প্রতিশোধ নিতে শিক্ষার্থীরা সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন।

ঢাকা কলেজের একাদশ শ্রেণির তিন শিক্ষার্থী গত বছরের একটি ঘটনার বর্ণনা দিয়ে জানান, কলেজ ছুটির পর তারা তিনজন ধানমন্ডি লেক হয়ে যাচ্ছিলেন। পথে সিটি কলেজের পোশাক পরা একদল শিক্ষার্থী আড্ডা দিচ্ছিলেন। তারা তিনজনকে কাছে ডাকেন। কাছে যেতেই একজন তাদের গলায় থাকা ঢাকা কলেজের আইডি কার্ড ধরে বলেন, ‘ঢাকা কলেজ! ১ম বর্ষ না দ্বিতীয় বর্ষ? তোমাদের আইডি কার্ড তো নরমাল। এবার তো তোমাদের কলেজ ডাব্বা মারছে, জিপিএ ফাইভ কম আসছে, তোমরাও ডাব্বা মারবা।’

এভাবে নানা ‘খ্যাপানোর মতো কথা’ বলায় তিন শিক্ষার্থী উত্তেজিত হয়ে পড়েন। তারা প্রতিবাদ করলে হাতাহাতি শুরু হয়। পরে উপস্থিত লোকজন তাদের ছাড়িয়ে দেন। তিন শিক্ষার্থী মন খারাপ করে সেখান থেকে চলে যান।

পরদিন কলেজ চলাকালে ঘটনাটি ঢাকা কলেজে ছড়িয়ে পড়ে। ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন তাদের সহপাঠীরা। তারা একত্রিত হয়ে প্রতিশোধ নিতে রাস্তায় নেমে সিটি কলেজের দিকে যেতে থাকেন। ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীরা লাঠিসোঁটা নিয়ে আসছে—এমন তথ্য পেয়ে সিটি কলেজের শিক্ষার্থীরাও মারামারির প্রস্তুতি নেন। শুরু হয় ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও ইটপাটকেল নিক্ষেপ। একপর্যায়ে পুরো এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়।

ঢাকা কলেজের তিন শিক্ষার্থীর মতো একই ধরনের অভিযোগ করেছেন সিটি কলেজের শিক্ষার্থীরাও। সিটি কলেজের এক শিক্ষার্থী জানান, তিনি ঢাকা কলেজের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় পোশাক দেখে একদল শিক্ষার্থী তাকে চিনে ফেলেন। কোনও কারণ ছাড়াই তারা তাকে আজেবাজে কথা বলে ক্ষ্যাপাতে থাকেন। তিনি প্রতিবাদ করলে তার বাইসাইকেল রেখে দেওয়া হয়। পরে বিষয়টি তিনি শিক্ষকদের জানান। শিক্ষকরা পুলিশকে অবহিত করলে পুলিশ ঢাকা কলেজ থেকে সাইকেলটি উদ্ধার করে।

ধানমন্ডি আইডিয়াল কলেজের শিক্ষার্থীরা জানান, তাদের কলেজের কোনও শিক্ষার্থীকে একা পেলেই কোনও কারণ ছাড়াই ঢাকা কলেজ বা সিটি কলেজের শিক্ষার্থীরা হেনস্তা ও অপমানজনক কথা বলেন। পরে এ ঘটনাই সংঘর্ষের সূত্রপাত ঘটায় এবং পরদিন মারামারি লেগে যায়।

তিন কলেজের শিক্ষার্থীদের বক্তব্য থেকে জানা যায়, প্রতিষ্ঠার শুরুতে এক কলেজের শিক্ষার্থীরা আরেক কলেজের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কোনও কারণ ছাড়াই সংঘর্ষে জড়িয়েছিলেন। সেই থেকে কোনও ঘটনা ঘটলেই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে। পর্যায়ক্রমে তিন কলেজে নতুন করে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীরাও অন্য কলেজকে প্রতিদ্বন্দ্বী ও প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখতে শুরু করছেন।

শিক্ষার্থীরা জানান, একজনকে একা পেয়ে মারধর করলে বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে শিক্ষক বা পুলিশ জানতে পারেন না। জানলেও ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী মারধরের ঘটনায় তৎক্ষণাৎ ‘উল্লেখযোগ্য’ প্রতিকার বা বিচার পান না। ফলে ওই শিক্ষার্থী ও তার সহপাঠীদের মধ্যে ক্ষোভ জমে থাকে। পরে অন্য কোনও ঘটনা ঘটলেই সেই ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটে এবং প্রতিশোধ নিতে তারা আবার সংঘর্ষে জড়ান।

পুলিশ বলছে, সংঘর্ষ বাধানো এবং সংঘর্ষে লিপ্ত হওয়া একাধিক শিক্ষার্থীকে চিহ্নিত করা হয়েছে। যারা বারবার সংঘর্ষে জড়িয়েছে, যাচাই-বাছাই শেষে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

রবিবারও সংঘর্ষ

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকা কলেজের উচ্চ মাধ্যমিকের একজন শিক্ষার্থী বলেন, বেলা সাড়ে ১১টার দিকে সায়েন্স ল্যাব দিয়ে ঢাকা কলেজের একটি বাস যাওয়ার সময় ল্যাবএইড হাসপাতালের সামনে আইডিয়াল কলেজের শিক্ষার্থীরা বাসটিতে ইটপাটকেল ছুড়েছেন—এমন খবর পান তারা। পরে দুপুর ১২টার দিকে তারা আইডিয়াল কলেজের দিকে যান।

ওই শিক্ষার্থীর দাবি, ইটপাটকেলের আঘাতে ঢাকা কলেজের বাসটির জানালার কাচ ভেঙে যায়। পরে আইডিয়াল কলেজের শিক্ষার্থীদের হামলায় ঢাকা কলেজের তিন শিক্ষার্থী আহত হন।

অন্যদিকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে আইডিয়াল কলেজের এক শিক্ষার্থী বলেন, ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীরা অকারণে তাদের ওপর হামলা করতে এসেছিলেন। তাদের হামলায় আইডিয়াল কলেজের পাঁচ জনের বেশি শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন বলে তিনি দাবি করেন।

কাউন্সেলিংয়ের ওপর জোর

ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত সাত কলেজের প্রশাসক অধ্যাপক এ কে এম ইলিয়াস বলেন, রবিবারের ঘটনা কী নিয়ে ঘটেছে, তা তিনি এখনও জানেন না।

তবে তিনি বলেন, একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীরাই বেশি সংঘর্ষে জড়ায়। তাদের বয়স কম, আবেগ বেশি। সংঘর্ষে জড়ানোর পেছনে মনস্তাত্ত্বিক বিষয়ও রয়েছে। অন্য কলেজ বা অন্য কলেজের শিক্ষার্থীদের ছোট করে দেখা কিংবা দেখতে না পারার বিষয়টি এর মধ্যে রয়েছে। এসব দূর করতে প্রতিটি ক্লাসে শিক্ষার্থীদের কাউন্সেলিং করা হচ্ছে, বোঝানো হচ্ছে। তাদের পরিবারকেও ডেকে বলা হচ্ছে।

ঢাকা সিটি কলেজের এক শিক্ষক বলেন, এসব ঘটনা বন্ধে শুধু তাদের একক প্রচেষ্টা যথেষ্ট নয়। শিক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষক ও প্রশাসন—সবার সম্মিলিত চেষ্টা দরকার। তবে এ ধরনের সহিংস ঘটনা থামানো সম্ভব। ক্লাসেও শিক্ষার্থীদের এ বিষয়ে বারবার বলা হয়।

ধানমন্ডি আইডিয়াল কলেজের অধ্যক্ষ মুহাম্মদ রেজওয়ানুল হক বলেন, পড়াশোনা করতে এসে কেউ মারামারি করতে পারবে না। তারা বাকি দুই কলেজের শিক্ষকদের সঙ্গেও বিভিন্ন সময় এসব বিষয়ে বসেছেন এবং আলোচনা করেছেন। কীভাবে সংঘাত এড়ানো যায়, সে বিষয়ে সবার সিদ্ধান্ত একই। তারা এ সমস্যা নিরসনের চেষ্টা করছেন।