১৯৪৬ সাল। যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসের ছোট শহর টেক্সারকানায় একে একে খুন হন পাঁচজন। হত্যাকারী অজ্ঞাতই রয়ে যায়। সেই ঘটনার রহস্যভেদ করা সম্ভব হয়নি, জানা যায়নি ঘাতকের পরিচয়ও। অজ্ঞাত সেই খুনি কিংবা মুখোশধারী আরেক খুনির গল্প আজও মানুষের আগ্রহের বিষয়।
১৯৬০-এর দশকের শুরুতে বোস্টনে ১৩ জন নারী হত্যার ঘটনায় গ্রেফতার হন অ্যালবার্ট ডি সালভো। সে সময় এই ঘটনা নিয়েও ছিল নানা বিতর্ক। অনেকেই বলেছিলেন, একাধিক খুনি এতে জড়িত থাকতে পারে। পরে ডিএনএ প্রমাণ অন্তত শেষ হত্যাকাণ্ডে সালভোর জড়িত থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করে।
অজ্ঞাত খুনি, রহস্যভেদ করতে না পারা হত্যাকাণ্ড; এসব নিয়েই বিশ্বজুড়ে তৈরি হয়েছে অসংখ্য সিনেমা। মানুষও ভীষণ আগ্রহ নিয়ে এসব সিনেমা দেখেন এখনও। এসব বিভীষিকাময় ও রোমহর্ষক সিনেমা মানুষ কেন দেখে, তা নিয়েও হয়েছে নানা গবেষণা। আসলে মানুষ জানতে চায়, কীভাবে একজন সাধারণ মানুষের আড়ালে লুকিয়ে থাকতে পারে একজন নৃশংস খুনি? কিন্তু পর্দায় দেখা সেই সত্য ঘটনা যখন নিজের পাশের বাড়ির কারও জীবনের সঙ্গে মিলে যায়, তখন শিহরিত হয়ে ভাবতে হয়; এই মানুষটির সঙ্গেই তো আমি ফুচকা খেয়েছি, পাড়ার পিকনিকে গিয়েছি কিংবা বিয়েবাড়িতে পাশাপাশি বসেছি।
বাংলাদেশে এরশাদ শিকদারকে নিয়ে ভয়াবহ নৃশংসতার গল্পগুলো যখন প্রথম প্রকাশ্যে আসে, মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়েছিল সেসব ঘটনা জানতে। এমনকি গত শতাব্দির নব্বইয়ের দশক থেকে শুরু করে একবিংশ শতাব্দির শূন্যের দশকে পাড়া মহল্লাতেও জারি গানের সুরে চলতো এসব ‘কেচ্ছা’। এ ধরনের গল্প মুখে মুখে আরও ছড়ায়, আর শ্রোতারা বিস্ময় নিয়ে ভাবেন; এই সেই মানুষ, যে আমাদের পাড়াতেই বড় হয়েছে!
আমাদের আজকের গল্পটা এমনই এক চরিত্র ‘রসু খাঁ’কে নিয়ে। অনেকেরই মনে থাকার কথা। খুব বেশি দিন আগের কথা নয়, ২০০৯ সালে একটি মসজিদের ফ্যান চুরির ঘটনায় আটক হন তিনি। এরপর তার নামে একের পর এক খুনের ভয়াবহ তথ্য বেরিয়ে আসে রসু খাঁকে ঘিরে। আর সেখানেই সামনে আসে একটি সংখ্যা ‘১০১’। গ্রেফতারের মুহূর্তে ১১ জন নারীকে ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগ যার বিরুদ্ধে, সেই রসু খাঁ নাকি ১০১ নারীকে নির্যাতনের পর হত্যা করতে চেয়েছিলেন। এরপর তার পরিকল্পনা ছিল সুফি জীবনে প্রবেশ করে মাজারে মাজারে ঘুরে ধার্মিক জীবনযাপন করা।
১১ নারীকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় গ্রেফতারের দেড় যুগ পরও বেঁচে আছেন তিনি। বর্তমানে তিনি গাজীপুরের কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারে আছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ১০১-এর রহস্যভেদ কি হয়েছে?
কে এই রসু খাঁ?
আসল নাম রশিদ খাঁ ওরফে রসু খাঁ। জন্ম ১৯৭৬ কিংবা ৭৭ সালে। বাড়ি চাঁদপুর সদর উপজেলার চান্দ্রা ইউনিয়নের মদনা গ্রামে। বাবা মনু খাঁ ওরফে আবু খাঁ ছিলেন ক্ষেতমজুর। বলা হয়ে থাকে, রসু খাঁ পেশায় ছিঁচকে চোর ছিলেন। ঢাকা-গাজীপুর এলাকায় ছিনতাই, ডাকাতি, বাড়ি লুট ও চুরির সঙ্গে জড়িত ছিলেন তিনি।
অথচ সিরিয়াল কিলার পরিচয়ে ১১ নারীকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনার পর পুলিশের জেরায় রসু জানান, বিয়ের আগে এক মেয়েকে ভালোবাসতেন তিনি। সেই ঘটনার জেরে মেয়েটির ভাইয়েরা তার হাত ভেঙে দেয়। এই অপমানের প্রতিশোধ নিতে তিনি ১০১টি খুন করার পর সন্ন্যাসী হয়ে মাজারে মাজারে ঘুরে ধার্মিক জীবনযাপন করার সিদ্ধান্ত নেন।
রসু খাঁর সিরিয়াল কিলিং শুরু হয় ২০০৭ সালে। নিজের শ্যালকের স্ত্রী রিনাকে ভাটিয়ালপুরে এনে হত্যার মাধ্যমে তার এই হত্যাকাণ্ডের শুরু। সর্বশেষ খুনটি করেন ২০০৯ সালের ২০ জুলাই। ফরিদগঞ্জের মধ্য হাঁসা গ্রামে পারভীন আক্তার নামে এক নারীকে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়। ময়নাতদন্তে পারভীনের শরীরে সিগারেট দিয়ে পোড়ানোর ২০টি ক্ষতচিহ্ন পাওয়া যায়।
গ্রেফতার যেভাবে
২০০৭ থেকে ২০০৯ সালে ফরিদগঞ্জে ছয়টি অজ্ঞাত নারীর লাশ উদ্ধার হয়। ২০০৯ সালের ৭ অক্টোবর মসজিদের ফ্যান চুরির ঘটনায় গাজীপুরের টঙ্গীর মিরাশপাড়া থেকে রসু খাঁকে গ্রেফতার করা হয়।
যুগে যুগে সিরিয়াল কিলারদের গ্রেফতারের ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রেই নিজেদের চালাক প্রমাণ করতে গিয়ে তারা পুলিশের হাতে ধরা পড়ে। কখনও পুলিশ বা গণমাধ্যমের কাছে চিঠি, ছবি কিংবা ক্লু পাঠানো, কখনও একই স্থান থেকে বারবার ভিকটিম নির্বাচন করা বা একই এলাকায় লাশ ফেলা; এ ধরনের আচরণ তদন্তকারীদের কাছে অপরাধের একটি প্যাটার্ন তৈরি করে দেয়। এরপর ওই এলাকা বা আশপাশে নজরদারি বাড়িয়ে খুনিকে শনাক্ত করার সুযোগ তৈরি হয়।
সিরিয়াল কিলারদের মনস্তত্ত্ব নিয়ে করা গবেষণাতেও উঠে এসেছে সাধারণ অপরাধীদের সঙ্গে তাদের কিছু পার্থক্যের কথা। অধিকাংশ অপরাধী ঝোঁকের মাথায় কোনও একটি অপরাধ করে ফেলে এবং পরে সেটি নিয়ে গভীর অনুশোচনা ও অনুতাপে ভোগে। কিন্তু অপরাধবোধে ভোগা তো দূরের কথা, সিরিয়াল কিলারদের কাছে তাদের কৃত অপরাধগুলোই অনেক সময় জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন হয়ে ওঠে। তারা এতটাই পরিকল্পিতভাবে খুনগুলো নিয়ে ভাবে যে পুরো ঘটনাটি দীর্ঘদিন মনে রাখে এবং অনেক ক্ষেত্রে গর্বের সঙ্গে সেই গল্পও বলে।
কেন সিরিয়াল কিলাররা এমন হয়?
সিরিয়াল কিলার বা ধারাবাহিক খুনিদের মনস্তত্ত্ব এবং অপরাধের পেছনের কারণ নিয়ে অপরাধবিজ্ঞান ও ফরেনসিক মনোবিজ্ঞানে বেশ কিছু বিখ্যাত গবেষণা ও তত্ত্ব রয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, অনেক সিরিয়াল কিলারের পেছনে শৈশবের নিগ্রহের ইতিহাস রয়েছে। শৈশবের বঞ্চনা ও নির্যাতন তাদের মনে গভীর ক্ষোভ এবং একাকীত্ব তৈরি করতে পারে, যা পরবর্তীতে সহিংসতায় রূপ নেয়।
তবে এর বাইরেও নিজের না-পাওয়ার বেদনা থেকে তৈরি হিংস্রতা এবং জীবনকে ভালো না বাসার কারণকেও গবেষকরা বিবেচনায় রাখেন।
মানুষ কেন এসব গল্প দেখে?
শুরুতেই প্রশ্ন ছিল, সিরিয়াল কিলারের এসব তথ্য মানুষ এত আগ্রহ নিয়ে দেখে কেন? মনোবিজ্ঞানীরা বলে থাকেন, নিরাপদ দূরত্বে বসে পর্দার ভয়াবহতা উপভোগ করার প্রবণতা মানুষের আছে। এটিকে তারা অনেক সময় সিটবেল্ট বেঁধে ভয় পাওয়ার সঙ্গে তুলনা করেন।
মানুষ জানতে চায়, কীভাবে একজন সাধারণ মানুষের আড়ালে লুকিয়ে থাকতে পারে একজন নৃশংস খুনি। অপরাধের লক্ষণ বা বিপদগুলো চেনার মাধ্যমে দর্শক অবচেতনভাবেই নিজেদের নিরাপদ রাখতে এবং এমন পরিস্থিতি এড়িয়ে চলার কৌশল বা সতর্কবার্তা খোঁজে। কিন্তু রসু খাঁর গল্পে সেই ভয়াবহতা সিনেমার পর্দায় নয়; বাস্তবেই ঘটেছে। আরও বিস্ময়কর হলো, সেই গল্পের কেন্দ্রে থাকা মানুষটি এখনও বেঁচে আছেন।
একটা ফ্যান ও ১০১ খুনের আকাঙ্ক্ষা
রসু খাঁকে নিয়ে আজও নানা গল্প ঘুরে বেড়ায়। ২০০৯ সালে আটক রসু খাঁ তার অপরাধের জন্য ফাঁসির রায় দিয়েছেন আদালত। তিনি গাজীপুরের কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারের সেলে ফাঁসির দণ্ড কার্যকরের প্রহর গুনছেন।
রসু খাঁর এই খুনের গল্প শুরু হয়েছিল প্রেমে ব্যর্থতা থেকে, আর গল্পের শেষ হয়েছিল একটি ফ্যান চুরির ঘটনায়। পারভীন হত্যার পর রসু নিজেই ফরিদগঞ্জ থানার ওসিকে ফোন করে বাবুল নামে অন্য দুই যুবককে ফাঁসানোর চেষ্টা করেন। সেই ফোন নম্বরের সূত্র ধরেই পুলিশ তাকে ধরে।
রিমান্ডে তিনি ১১টি খুনের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। তার বিরুদ্ধে মোট ১১টি মামলা হয়। এর মধ্যে শাহিদা হত্যা মামলায় (২০০৮) ২০১৫ সালের ২২ এপ্রিল প্রথম মৃত্যুদণ্ড দেন চাঁদপুরের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ অরুণাভ চক্রবর্তী।
পারভীন হত্যা মামলায় (২০০৯) ২০১৮ সালের ৬ মার্চ চাঁদপুরের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল রসু খাঁ, তার ভাগ্নে জহিরুল ইসলাম ও সহযোগী ইউনুছকে মৃত্যুদণ্ড দেন। এরপর হাইকোর্টের রায়ে ২০২৪ সালের ৯ জুলাই বিচারপতি সৈয়দ মো. জিয়াউল করিম ও কে এম ইমরুল কায়েশের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বিভাগের বেঞ্চ পারভীন হত্যা মামলায় রসু খাঁর মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন। তবে অন্য দুই আসামির সাজা যাবজ্জীবন করা হয়।
পপি হত্যা মামলায় ২০১১ সালে খালাস পান রসু খাঁ। ২০২২ সালে একটি অপহরণ মামলাতেও খালাস পান তিনি। এখনও তার ছয়টি মামলা বিচারাধীন থাকায় ফাঁসি কার্যকর হয়নি। তাই গ্রেফতারের ১৬ বছর পরও কাশিমপুর কারাগারে বন্দি আছেন বাংলাদেশের এই কুখ্যাত সিরিয়াল কিলার। কিন্তু ১০১টি হত্যা ঘটিয়ে ভালো হয়ে যেতে চাওয়া রসু খাঁর সেই ১০১-এর রহস্য আজও মানুষের কৌতূহলের কারণ হয়ে আছে। কেন ১০১? কেন এই সংখ্যাই ছিল তার লক্ষ্য? সেই প্রশ্নের জবাব কি সত্যিই পাওয়া গেছে? রসু খাঁর সেই সংখ্যা মানুষের মনে এখনও কৌতূহলের কারণ হয়ে আছে।