দেশজুড়ে ছোট-বড় মাদকবিরোধী অভিযানে প্রতিদিনই ধরা পড়ছে বাহক, খুচরা বিক্রেতা ও স্থানীয় কারবারিরা। উদ্ধার হচ্ছে ইয়াবা, গাঁজা, হেরোইন, ফেনসিডিল থেকে শুরু করে ক্রিস্টাল মেথের মতো ভয়াবহ মাদক। কিন্তু বিপুল এই বাণিজ্যের নেপথ্যের ‘গডফাদার’ ও অর্থের জোগানদাতা কারা? সীমান্ত পেরিয়ে আসা চালান কার নির্দেশে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছায়? আর স্থানীয় পর্যায়ে মাদক কারবারের সঙ্গে চাঁদাবাজি, আধিপত্য বিস্তার ও অস্ত্রের নেটওয়ার্কের যোগসূত্রই বা কোথায়?
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য বলছে, দেশের মাদক বাণিজ্য কেবল খুচরা বিক্রেতানির্ভর নয়। এর পেছনে রয়েছে বহুস্তরীয় একটি নেটওয়ার্ক। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সমন্বিত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ২০ হাজার ৮৯১ জন মাদক কারবারিকে তিন ভাগে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে ১ হাজার ৬২০ জনকে ‘গডফাদার’, ৬ হাজার ২২৭ জনকে পাইকারি এবং ১৩ হাজার ৪৪ জনকে খুচরা কারবারি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আর শুধু ঢাকা বিভাগেই ‘গডফাদার’ হিসেবে চিহ্নিত ২৩১ জন। এর বাইরে পাইকার ১ হাজার ১০২ এবং খুচরা কারবারি ২ হাজার ৪৮৯ জন। তবে গোয়েন্দা তথ্যে নাম থাকা সবার বিরুদ্ধে একই ধরনের মামলা নেই বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি ৩০৯ জন ‘গডফাদার’ চট্টগ্রাম বিভাগে। এরপর রাজশাহীতে ২৭৩, রংপুরে ২৩৭, ঢাকায় ২৩১, খুলনায় ২২৮, বরিশালে ১১৭, ময়মনসিংহে ১১৫ এবং সিলেটে ১১০ জন। পুলিশের পৃথক তালিকায় ১৯ হাজার ৪৫ এবং বিজিবির তালিকায় ৩ হাজার ৯৬৪ জন মাদক কারবারির তথ্য থাকার বিষয়টিও মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এই অপরাধ জগৎকে ঘিরে একাধিক সংস্থার একাধিক তালিকা রয়েছে। তবে এসব তালিকা কতটা সমন্বিত, একই ব্যক্তির নাম একাধিক তালিকায় রয়েছে কিনা, তালিকাভুক্তদের বিরুদ্ধে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কিংবা তদন্ত কতদূর, সে বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাওয়া যায়নি।
সীমান্তে মাদকপাচারের শতাধিক পয়েন্ট
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের ২০২৫ সালে প্রকাশিত বাংলাদেশ বার্ষিক ড্রাগ রিপোর্টের তথ্য অনুযায়ী, অন্তত ১৮ জেলার ১০৫টি সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে বিভিন্ন ধরনের মাদক বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। ভারত সীমান্তঘেঁষা পশ্চিম ও উত্তরাঞ্চল দিয়ে গাঁজা, ফেনসিডিল ও হেরোইন এবং মিয়ানমার সীমান্ত দিয়ে মূলত ইয়াবা ও ক্রিস্টাল মেথ প্রবেশ করছে।
দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে টেকনাফ, উখিয়া, শাহপরীর দ্বীপ, তুমব্রু, ঘুমধুম, কুতুপালং ও সেন্ট মার্টিন সংলগ্ন এলাকাকে সক্রিয় বা ঝুঁকিপূর্ণ রুট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। পশ্চিমাঞ্চলে যশোর, সাতক্ষীরা, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর, রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিভিন্ন সীমান্ত পয়েন্ট ব্যবহারের তথ্যও রয়েছে অধিদফতরের কাছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলছেন, সীমান্ত পেরিয়ে আসা মাদকের সবচেয়ে বড় গন্তব্যগুলোর একটি ঢাকা। বিপুল জনসংখ্যা, নগদ অর্থের প্রবাহ ও বড় বাজার রাজধানী মাদক কারবারিদের কাছে আকর্ষণীয়। কর্মকর্তাদের হিসাবে, দেশে আনুমানিক ৮২ লাখ মাদকাসক্তের মধ্যে প্রায় ২৩ লাখই ঢাকায়।
২০২৫ সালে শুধু ইয়াবা ও অন্যান্য অ্যামফিটামিনজাত ট্যাবলেট জব্দ হয়েছে প্রায় ৪ কোটি ৩৫ লাখ পিস। আগের বছর এই সংখ্যা ছিল প্রায় ২ কোটি ২৮ লাখ। একই বছরে ৯৬ হাজার কেজির বেশি গাঁজা, ৩৩৭ কেজি হেরোইন এবং প্রায় ৩ লাখ ২০ হাজার বোতল ফেনসিডিল জব্দের তথ্য রয়েছে। বিজিবির মাসভিত্তিক প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত সারা দেশে বাহিনীটি অন্তত ১ কোটি ৮৫ লাখ পিস ইয়াবা, ১২ হাজার ২৮১ কেজি গাঁজা, ৬ দশমিক ৩০ কেজি হেরোইন এবং ১৪ হাজার ৬৬৬ বোতল ফেনসিডিল জব্দ করেছে।
রাজধানীতে কারা আলোচনায়
ঢাকার মাদক বাজারে দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত এলাকাগুলোর একটি মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্প। গত ২০ আগস্ট র্যাব-২ সেখান থেকে মো. সেলিম ওরফে ‘চুয়া সেলিম’কে গ্রেফতার করে। র্যাব (বর্তমানে এসআরবি) কর্মকর্তারা তাকে জেনেভা ক্যাম্পে সক্রিয় দুই বড় মাদক ‘কিংপিন’ বা মূলহোতার একজন হিসেবে বর্ণনা করেন। সংস্থাটির দাবি, হত্যা, মাদক ও অস্ত্রসহ বিভিন্ন অভিযোগে তার বিরুদ্ধে অন্তত ৩৬টি মামলা রয়েছে।
এর আগে ১৯ মে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে গ্রেফতার হন মো. রাজা বাদশা ওরফে ‘পিচ্চি রাজা’। ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) তাকে জেনেভা ক্যাম্পের ‘শীর্ষ মাদক কারবারি’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। পুলিশের তথ্যমতে, তার বিরুদ্ধে ২৯টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে ১৩টি মাদক, তিনটি হত্যা এবং সাতটি হত্যাচেষ্টা মামলা।
মাদক ও চাঁদাবাজির সম্পর্ক কোথায়
অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, রাজধানীর অপরাধ জগতের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে অনেক এলাকায় মাদক বিক্রি কেবল ‘বেচাকেনা’ নয়, এর সঙ্গে স্থানীয় আধিপত্য ও অপরাধী গোষ্ঠীগুলোর নিয়ন্ত্রণও জড়িত। কোন স্পটে কে মাদক বিক্রি করবে, কারা সেখানে অবস্থান করবে, স্থানীয় দোকান বা পরিবহন থেকে কারা চাঁদা তুলবে, এসব নিয়ে বিভিন্ন অপরাধী গ্রুপের মধ্যে প্রায়ই বিরোধ তৈরি হয়। কখনও সেই বিরোধ গড়ায় সংঘর্ষ ও খুনোখুনিতে।
গত জুনে বিশেষ অভিযানের পর ডিএমপি জানায়, এক মাসে রাজধানী থেকে ২ হাজার ৮৪৪ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ১ হাজার ২১৫ জন মাদক কারবারি এবং পৃথকভাবে ৬৫৮ জনকে চাঁদাবাজ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। একই অভিযানে ৭৪৪ কেজি গাঁজা, প্রায় ১ লাখ ৭৯ হাজার পিস ইয়াবাসহ হেরোইন, ফেনসিডিল ও ক্রিস্টাল মেথ উদ্ধার করা হয়।
সর্বশেষ ১ থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রাজধানীতে পুলিশের নিয়মিত অভিযানে অন্তত ১ লাখ ৬৬ হাজার ৬৫১ পিস ইয়াবা, ৬৬৮ কেজি ৫০৮ গ্রাম গাঁজা, ৬০২ দশমিক ৪ গ্রাম হেরোইন এবং ১ হাজার ৩১ বোতল ফেনসিডিল ও ইস্কাফ উদ্ধারের তথ্য পাওয়া গেছে। এ সময়ে মাদকসহ বিভিন্ন অভিযোগে ১৫ হাজার ৮৩ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
বিভিন্ন এলাকায় আলোচনায় যাদের নাম
সর্বশেষ গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, টেকনাফে সক্রিয় হিসেবে মো. নূর ওরফে বার্মাইয়া নূর, জাহেদ হোসেন, হারুন অর রশিদ, ফয়েজ আহমেদ, জিয়াবুল হক ওরফে জিয়া, জাফর আলম, দিদারুল আলম ও সামসু মিয়াসহ কয়েকজনের নাম উঠে এসেছে। কুমিল্লায় আশিক ওরফে বোমা আশিক, আবুল কাশেম, মিজান, নূর ইসলামসহ কয়েকজন এবং রাজশাহীতে শীষ মোহাম্মদ, টিপু, মো. তোফাজ্জল হোসেন ও নওশাদ আলীসহ কয়েকজনকে ‘গডফাদার’ পর্যায়ে চিহ্নিত করার তথ্য রয়েছে।
মাদকের টাকার খোঁজ কতদূর
মাদকের বড় ব্যবসায়ীদের শনাক্ত করতে শুধু মাদক উদ্ধার বা বাহক গ্রেফতার নয়, অর্থের উৎস ও সম্পদের গতিপথ অনুসন্ধানের গুরুত্বও বহুবার সামনে এনেছেন অপরাধ বিশ্লেষকরা।
সিআইডি এর আগে জানিয়েছিল, ২০১৭ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে করা ৩৫টি মানি লন্ডারিং মামলার তদন্তে ১২ জন কথিত মাদক ‘কিংপিন’ বা গডফাদারের প্রায় ১৭৮ কোটি ৪৪ লাখ টাকার সম্পদের তথ্য পাওয়া যায়। তদন্তের অংশ হিসেবে জমি, বাড়ি ও ব্যাংক হিসাব জব্দ এবং সম্পদ বাজেয়াপ্তের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে যে ১ হাজার ৬২০ জনকে গোয়েন্দা তথ্যে ‘গডফাদার’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, তাদের মধ্যে কতজনের ব্যাংক হিসাব, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের লেনদেন, জমি-বাড়ি, ব্যবসায়িক বিনিয়োগ ও সন্দেহজনক সম্পদের অনুসন্ধান হয়েছে, এর হালনাগাদ পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাওয়া যায়নি।
একইভাবে তালিকাভুক্তদের মধ্যে কতজন বর্তমানে কারাগারে, কতজন জামিনে বাইরে কিংবা কতজন পলাতক তারও সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।
ডিজিটাল মাধ্যমেও মাদক বাণিজ্য
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মাদক পরিবহনের কৌশলের পাশাপাশি লেনদেনের ধরনও বদলেছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের একটি প্রতিবেদনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন মার্কেটপ্লেস, এনক্রিপটেড মেসেজিং অ্যাপ, কুরিয়ার সার্ভিস ও ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবহারের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। গত ১৬ জুলাই কার্যকর হওয়া মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ (সংশোধন) আইন, ২০২৬-এ সাইবার স্পেস, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, মোবাইল অ্যাপ, ডিজিটাল পেমেন্ট, ই-ওয়ালেট ও ভার্চুয়াল সম্পদ ব্যবহার করে মাদক লেনদেনকে আলাদাভাবে অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
গ্রেফতার হচ্ছে বাহক, ‘গডফাদার’রা কোথায়
সাম্প্রতিক সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তা গণমাধ্যমে বলেছেন, গ্রেফতার হওয়া মাদক কারবারিদের সূত্র ধরে তারা নেটওয়ার্কের ‘গডফাদারদের’ কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন। তবে বিপুলসংখ্যক গ্রেফতার ও মাদক জব্দের পরও নেটওয়ার্কের শীর্ষ স্তর, অর্থদাতা এবং নিয়ন্ত্রণকারীদের আইনের আওতায় আনা এখনও বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মাদক কারবার ও চাঁদাবাজিকে রাজধানীর আইনশৃঙ্খলার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবেও দেখছে ঢাকা মহানগর পুলিশ। সম্প্রতি ডিএমপির মাসিক অপরাধ পর্যালোচনা সভায় কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দিন আহমদ মাদক কারবারি, চাঁদাবাজ, ছিনতাইকারী ও বিভিন্ন অপরাধে জড়িতদের গ্রেফতারে অভিযান চালানোর নির্দেশ দেন। চাঁদাবাজি, মাদক, ছিনতাই ও কিশোর গ্যাংসহ বিভিন্ন অপরাধের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা জানিয়ে মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযানের পাশাপাশি গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ানোরও নির্দেশ দেন তিনি।
মাদক ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়ে গত কয়েক মাসে একাধিকবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ গণমাধ্যমে বলেছেন, মাদক, অবৈধ অস্ত্র ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে যৌথ অভিযান চলছে। খুচরা ব্যবহারকারীদের তুলনায় বড় চোরাচালানকারী এবং সীমান্ত দিয়ে মাদক আনা ব্যক্তিদের ধরার বিষয়টি অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি। গত ৬ আগস্ট কক্সবাজারে এক অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘নির্মোহভাবে শীর্ষ মাদক কারবারিদের তালিকা আমরা প্রস্তুত করবো।’ একইসঙ্গে চিহ্নিত চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসী ও মাদক ব্যবসায়ীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনতে নির্দেশ দেওয়ার কথাও জানান তিনি।
‘বাহক ধরা পড়ছে, মূল নিয়ন্ত্রকদের ধরতে হবে’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মাদকের নেটওয়ার্ক একেবারে সীমান্তের ওপারের উৎপাদনকেন্দ্র থেকে শুরু করে দেশের ভেতরে আসক্ত ব্যক্তির কাছে পৌঁছানো পর্যন্ত বিস্তৃত। এই পুরো শৃঙ্খলের প্রতিটি ধাপে যাদের মাদক প্রবেশ, বিক্রি ও সেবন ঠেকানোর কথা, তারা কার্যকরভাবে বাধা সৃষ্টি করতে না পারায় মাদক হাতবদল হয়ে শেষ পর্যন্ত ভোক্তার কাছে পৌঁছে যাচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় নীতি হচ্ছে মাদকের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’। কিন্তু আমরা মুখে যতটা বলছি, বাস্তবে ততটা কার্যকর করতে পারছি না। অভিযান হচ্ছে, মাদক উদ্ধার হচ্ছে, কারবারিরা গ্রেফতার হচ্ছে, তালিকাও করা হচ্ছে। এসব অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, তারপরও মাদক থামছে না কেন?’
ড. তৌহিদুল হকের মতে, এর অন্যতম কারণ মাদক বাণিজ্যের মূলহোতা, নিয়ন্ত্রক ও সুবিধাভোগীদের অনেক সময় আইনের আওতায় আনতে না পারা। তিনি বলেন, ‘বেশিরভাগ সময় আমরা দেখি বাহক বা নিচের স্তরের কারবারিরাই গ্রেফতার হচ্ছে। কিন্তু যারা মূল নিয়ন্ত্রক, যাদের প্রভাব অনেক গভীরে, তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব, আশ্রয়-প্রশ্রয় কিংবা অর্থের ভাগ ও নানা সুবিধার বিনিময়ে মাদক বাণিজ্যের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়।’
মাদক বাজারের সঙ্গে সহিংসতার সম্পর্ক ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘মাদক ব্যবসা কাঁচা টাকার কারবার। ফলে মাদকের বাজার নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ, সহিংসতা, খুন ও দ্বন্দ্বের ঘটনা ঘটে। কারণ একবার বিক্রি ও সেবনের সুযোগ নিশ্চিত করা গেলে প্রতিদিনই বিপুল অর্থ আসে। এই সুযোগ কেউ সহজে ছাড়তে চায় না।’
মাদক ব্যবসার সঙ্গে চাঁদাবাজির সম্পর্ক প্রসঙ্গে ড. তৌহিদুল হক বলেন, ‘মাদকের বাজার থেকে চাঁদা তোলার অভিযোগ বাস্তব। কোথাও মাদক বিক্রি করতে গেলে, কোথাও সেবন করতে গেলেও চাঁদা দিতে হয়। এই অর্থ কখনও অপরাধী গোষ্ঠীর কাছে যায়, আবার কখনও যাদের নিয়ন্ত্রণ করার কথা, তাদের মধ্যেও কেউ কেউ এই অর্থনৈতিক সুবিধার সঙ্গে যুক্ত হতে পারেন।’
তিনি বলেন, ‘এভাবে ধাপে ধাপে যখন একটি বাণিজ্যিক ও অপরাধী নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠে, তখন শুধু ‘জিরো টলারেন্স’ বললেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। নীতিটিকে বাস্তবে দৃশ্যমানভাবে প্রয়োগ করতে হবে। তাহলেই মাদকের মতো ভয়াবহ সমস্যাকে কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।’
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের উপপরিচালক (ঢাকা উত্তর) মো. রাজিউর রহমান বলেন, ‘মাদক ব্যবসা এখন আর শুধু খুচরা বিক্রেতা বা বাহকের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর পেছনে অর্থদাতা, সীমান্তভিত্তিক চোরাকারবারি, পাইকার ও স্থানীয় পর্যায়ের নিয়ন্ত্রকদের একটি নেটওয়ার্ক কাজ করে। আমাদের লক্ষ্য শুধু মাদক উদ্ধার বা বাহক গ্রেফতার নয়, বরং এই নেটওয়ার্কের মূলহোতাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা।’
বিশেষ করে ইয়াবা, আইস, হেরোইন ও অন্যান্য মাদকের বড় চালানের ক্ষেত্রে আমরা অর্থের উৎস, যোগাযোগের মাধ্যম এবং কারা এসব চালান পরিচালনা করছে, সেগুলোও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর খতিয়ে দেখছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। এই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় একই অপরাধী চক্র মাদক ব্যবসার পাশাপাশি এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, অস্ত্রের ব্যবহার বা চাঁদাবাজির মতো অপরাধেও জড়িয়ে পড়ে। পুলিশ, বিজিবি, কোস্ট গার্ডসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করেই আমরা কাজ করছি।’