ইস্টার্ন ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান শওকত আলীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হাইকোর্টের রুল

ব্যাংক কোম্পানি আইন লঙ্ঘন করে নামে-বেনামে ২০ শতাংশের বেশি শেয়ার নিয়ন্ত্রণ করায় বিষয় প্রমাণিত হওয়ার পরও ইস্টার্ন ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান শওকত আলী চৌধুরীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে কর্তৃপক্ষের নিষ্ক্রিয়তা কেন অবৈধ হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট।

একইসঙ্গে ১৫ দিনের মধ্যে এ সংক্রান্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি শওকত আলী চৌধুরীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে রিটকারীর আবেদন ৩০ দিনের মধ্যে নিষ্পতি করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের গর্ভনরকে বলা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) বিচারপতি শওকত আলী চৌধুরী ও বিচারপতি আব্দুর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন। আদালতে রিটের পক্ষে শুনানি করেন অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আলী, অ্যাডভোকেট ইশরাত হাসান ও অ্যাডভোকেট বিপ্লব কুমার দাশ।

এর আগে ঢাকা বার অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য এবং ইবিএলের ক্ষুদ্র শেয়ারহোল্ডার অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম এই রিট দায়ের করেন। ব্যাংকিং এবং শেয়ার বাজারের আমানতকারী ও বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষায় জনস্বার্থে এই রিট দায়ের করেন।

ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ১৪ক (১) ধারা অনুযায়ী কোনও একক ব্যক্তি, পরিবার বা প্রতিষ্ঠান ব্যাংকের ১০ শতাংশের বেশি শেয়ার ধারণ করতে পারে না। অথচ ইস্টার্ন ব্যাংক পিএলসির (ইবিএল) সাবেক চেয়ারম্যান মো. শওকত আলী চৌধুরী ও তার পরিবার সরাসরি ৯.৯৯ শতাংশ এবং বেনামি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আরও ১১.১২ শতাংশ—অর্থাৎ মোট ২১.১১ শতাংশ (প্রায় ৩৩ কোটি ৬৭ লাখ) শেয়ার নিয়ন্ত্রণ করছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তেও ২০.৪৮ শতাংশ শেয়ার কুক্ষিগত রাখার বিষয়টি নিশ্চিত হলেও নিয়ন্ত্রণ সংস্থা এখনো কোনও কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তে পাওয়া যায়, শওকত আলী চৌধুরী তার শতভাগ পারিবারিক প্রতিষ্ঠান ‘এস.এন. করপোরেশন’-এর বেতনভুক্ত কর্মচারী নইমুল হক ও তার স্ত্রী সালমা শিরীন এবং নিজের শ্যালিকা অনিকা তাহজীবকে ডামি বা প্রক্সি শেয়ারহোল্ডার হিসেবে ব্যবহার করেছেন। মাত্র একলাখ টাকা পরিশোধিত মূলধনের নামমাত্র প্রতিষ্ঠান ‘মেসার্স আরুশা অ্যান্ড কোং’ (৯.৯৮ শেয়ার) এবং ‘আনিকা শেয়ার্স অ্যান্ড সিকিউরিটিজ’ (১.১৪ শেয়ার)-এর মাধ্যমে এই শেয়ার নিয়ন্ত্রণ করা হয়। আরুশা অ্যান্ড কোম্পানির সাবেক শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে শওকত আলীর শ্যালিকা ও মেয়ের প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা ছিল এবং নথিপত্রে শ্যালিকা ও শওকত আলীর ঠিকানাও একই (২৮ সুরসন রোড, চট্টগ্রাম) পাওয়া গেছে।

মাত্র এক লাখ টাকার আরুশা অ্যান্ড কোং ২০০৯ সালের পর কোনো শেয়ার না কিনলেও নিয়মিত প্রাপ্ত বোনাস শেয়ারের জোরে বর্তমানে প্রায় ৩৩০.৫০ কোটি টাকা মূল্যের ১৩ কোটি ৫৪ লাখের বেশি শেয়ারের মালিক বনে যায়। প্রতিষ্ঠানটি এ পর্যন্ত ২৪৩.২৩ কোটি টাকা নগদ লভ্যাংশ পেয়েছে। শওকত আলী নিজে ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও পরিচালক পদে বহাল থেকে এসব লভ্যাংশ অনুমোদন করান এবং সেই লভ্যাংশের অর্থ জমি কেনার ভুয়া অগ্রিম বায়না দেখিয়ে তার ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাবে (৯.৯০ কোটি টাকা) ও নিজ প্রতিষ্ঠান এস.এন. করপোরেশনে (২৭.২৫ কোটি টাকা) স্থানান্তর করে শত শত কোটি টাকার ব্যক্তিগত সুবিধা ভোগ করেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্ত রিপোর্ট ধামাচাপা দিতে ও বাজেয়াপ্তির হাত থেকে রক্ষা পেতে শওকত আলী ও তার চক্র মার্কেটে দ্রুত এসব বেনামি শেয়ার বিক্রির মাধ্যমে ‘সেফ এক্সিট’-এর অপচেষ্টা চালাচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুশাসন নীতিমালা অনুযায়ী এ ধরনের গুরুতর আর্থিক অনিয়ম ও জালিয়াতির কারণে পরিচালক ও তার পরিবারের সংশ্লিষ্টতা থাওলে উক্ত ব্যক্তি ও পরিবারের সদস্যদের যেকোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ন্যূনতম ৩ বছরের জন্য নিষিদ্ধ করার বিধান রয়েছে।