সরকারি কর্মকর্তাদের শিষ্টাচারে কী আছে, অসদাচরণে ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান কী?

সরকারি কর্মকর্তাদের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে পেশাদারত্ব, সততা, শৃঙ্খলা ও জনসেবার বিষয়টি বাংলাদেশের সংবিধান ও সরকারি চাকরি-সংক্রান্ত আইন-বিধিতে বেশকিছু বাধ্যবধাকতা তুলে ধরা হয়েছে। নাগরিকদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার, দায়িত্ব পালনে অবহেলা কিংবা সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট ঘটনার ধরন ও প্রযোজ্য বিধি অনুযায়ী প্রশাসনিক বা আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। ফলে চাকরিকালীন সময়ে এসব আইন-বিধানসমূহ উপেক্ষা করার ফল হিসেবে শাস্তিও মিলতে পারে।

গত ২০ অক্টোবর রাজশাহী সফর শেষে বিদায় নিচ্ছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ দিন শাহ মখদুম বিমানবন্দরে প্রশাসন ও পুলিশ কর্মকর্তারা সারিবদ্ধভাবে প্রধানমন্ত্রীকে বিদায় সংবর্ধনা জানাতে দাঁড়িয়ে ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী তাদের সঙ্গে করমর্দন করছিলেন। একপর্যায়ে তিনি বিভাগীয় কমিশনারের দিকে হাত বাড়ান। করমর্দনের সময় তৎকালীন বিভাগীয় কমিশনার ইউসুফ আলী এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে অন্য হাত দিয়ে পেছন থেকে প্রধানমন্ত্রীকে স্পর্শ করার চেষ্টা করেন। তখন প্রধানমন্ত্রী কিছুটা পিছিয়ে যান এবং তাকে লাইনে দাঁড়ানোর পরামর্শ দেন। পরে ইউসুফ আলীকে তার দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করা হলে সরকারি কর্মকর্তাদের শিষ্টাচারের বিষয়টি আলোচনায় ওঠে।

সরকারি কর্মকর্তাদের দায়িত্ব পালনের প্রসঙ্গে দেশের সর্বোচ্চ আইন বাংলাদেশ সংবিধানের ২১ (২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তির দায়িত্ব সর্বদা জনগণের সেবা করার চেষ্টা করা। সংবিধানের এই বিধান সরকারি কর্মকর্তাদের দায়িত্বের মৌলিক ভিত্তি তুলে ধরে। ফলে এটি স্পষ্ট যে, সরকারি পদে দায়িত্ব পালন শুধু প্রশাসনিক ক্ষমতা প্রয়োগের বিষয় নয়; জনগণের সেবা করাও তাদের সাংবিধানিক দায়িত্ব।

সংবিধানের পরেই রয়েছে সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮। এআইনের ২৮ ধারা মতে, জনপ্রশাসনের সব পর্যায়ে সুশাসন নিশ্চিত করতে সরকারি কার্য সম্পাদনের নীতি, শুদ্ধাচার চর্চা এবং সরকারি কর্মচারীদের অনুসরণীয় নৈতিকতার মানদণ্ড প্রণয়নের কথা বলা হয়েছে।

আবার আইনটির ৩০ ধারায় সরকারি কর্মচারীদের আচরণ ও শৃঙ্খলা সংক্রান্ত বিষয় সংশ্লিষ্ট বিধি এবং সরকারের সময়ে সময়ে জারি করা আদেশের মাধ্যমে নির্ধারণের বিধানও রয়েছে। এছাড়া, ৩১ ধারায় আইন অনুসরণ করে সরকারি কর্মচারীর বিরুদ্ধে বিভাগীয় কার্যধারা গ্রহণের সুযোগ রাখা হয়েছে।

সরকারি কর্মচারীদের আচরণসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ বিধান রয়েছে সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯-তে। এই বিধিমালায়—উপহার গ্রহণ, ব্যক্তিগত ব্যবসা বা চাকরি, সম্পদের বিবরণ, সরকারি তথ্য প্রকাশ এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণসহ বিভিন্ন বিষয়ে বিধিনিষেধ ও শর্ত নির্ধারণ করা হয়েছে।

বিধিমালার ৫ ধারায় নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সরকারি অনুমোদন ছাড়া এমন উপহার গ্রহণে বিধিনিষেধ রয়েছে, যা কর্মকর্তাকে উপহারদাতার প্রতি দাফতরিক বাধ্যবাধকতায় ফেলতে পারে। ১৭ ধারায় সরকারি অনুমোদন ছাড়া ব্যক্তিগত ব্যবসা বা অন্য কর্মে নিয়োজিত হওয়ার বিষয়ে বিধিনিষেধ রয়েছে। ১৯ ধারায় অনুমোদন ছাড়া দাফতরিক তথ্য প্রকাশের বিষয়েও বিধান রয়েছে।

সরকারি কর্মচারীর বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রকৃতি অনুযায়ী, বিভাগীয় তদন্ত ও শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ গুরুত্বপূর্ণ।

এ ছাড়া সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮-এর ৩৭ক ধারায় নির্দিষ্ট কিছু কাজকে সরকারি কর্মে বিঘ্ন সৃষ্টিকারী অসদাচরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের বৈধ আদেশ অমান্য করা, আইনসংগত কারণ ছাড়া সরকারি আদেশ বা নির্দেশ অমান্য করা এবং অন্য সরকারি কর্মচারীর দায়িত্ব পালনে বাধা সৃষ্টি করা। এখানে নির্দিষ্ট অসদাচরণের জন্য নিম্ন পদ বা নিম্ন বেতন গ্রেডে অবনমিতকরণ, বাধ্যতামূলক অবসর এবং চাকরি থেকে বরখাস্তের মতো দণ্ডের বিধান রয়েছে।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. খাদেমুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, প্রতিটি ক্ষেত্রে দণ্ড দেওয়ার আগে আইনে নির্ধারিত অভিযোগ, জবাব ও তদন্তের প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। শুধু নাগরিকের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে বলেই ৩৭ক ধারার এসব দণ্ড স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রযোজ্য হবে, তাও কিন্তু নয়।

তিনি বলেন, ‘তাই কোনও সরকারি কর্মকর্তা নাগরিকের সঙ্গে অশোভন আচরণ করলে বা দায়িত্ব পালনে অনিয়ম করলে অভিযোগকারী সংশ্লিষ্ট দফতরের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ দিতে পারেন। অভিযোগের সঙ্গে ঘটনার তারিখ, সময়, স্থান, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার পরিচয়, প্রত্যক্ষদর্শীর তথ্য এবং আইনসম্মতভাবে সংগৃহীত প্রাসঙ্গিক প্রমাণ যুক্ত করা সহায়ক হতে পারে।’

সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অভিযোগের ধরন অনুযায়ী, বিষয়টি যাচাই করে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিতে পারে। কোনো ঘটনায় পৃথক ফৌজদারি অপরাধের উপাদান থাকলে প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী সেই বিষয়টিও বিবেচিত হতে পারে বলেও আইনজীবী খাদেমুল ইসলাম জানান।

তিনি বলেন, সরকারি কর্মকর্তাদের শুধু শিষ্টাচার মানলেই চলবেনা, তাদেরকে রাষ্ট্রচারও মেনে চলতে হবে। কারণ, সরকারি কর্মকর্তাদের রাষ্ট্রাচার ও শিষ্টাচারের প্রসঙ্গটি শুধু ব্যক্তিগত ভদ্রতা নয়; এটি জনসেবা, প্রশাসনিক জবাবদিহিতা এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগের সঙ্গে সম্পর্কিত বলেও মনে করা হয়।

প্রধানমন্ত্রী বা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে সাক্ষাতের সময় হাত মেলানো, রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে আচরণ কিংবা দাপ্তরিক যোগাযোগের নির্দিষ্ট রীতি সরকারি কর্মকর্তাদের পেশাগত আচরণের অংশ। রাষ্ট্রীয় পদমর্যাদা ও আনুষ্ঠানিকতার সঙ্গে সম্পর্কিত এসব রীতিকে বলা হয় রাষ্ট্রাচার।

এ ক্ষেত্রে দেশের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতিনিধি কিংবা অন্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠান পরিচালনা, অভ্যর্থনা, আসন বিন্যাস, পরিচিতি পর্বে বক্তব্য দেওয়ার ক্রমানুসরণ এবং আনুষ্ঠানিক যোগাযোগের মতো বিষয়গুলো থাকতে পারে। সবসময়ই রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান ও কূটনৈতিক ক্ষেত্রে এসব রীতি মেনে চলার আবশ‍্যকীয়তা রয়েছে।