৫ আগস্টের শেখ হাসিনার হেলিকপ্টারের ভিডিও নিয়ে যা বলেছিলেন তাহসিফ

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ভিডিও ধারণ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সৌরির বিরুদ্ধে। আকস্মিক তার মরদেহ উদ্ধারের পর সেই প্রসঙ্গ আবারও আলোচনায় এসেছে। 

তবে ভিডিওটি ধারণ বা ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ কী, তা নিয়ে গত বছরই প্রশ্ন তুলেছিলেন তিনি। একই সঙ্গে অভিযোগের কারণে বিমানবাহিনীর চাকরি হারিয়ে থাকতে পারেন বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন তাহসিফ। ২০২৬ সালের ২১ জুলাই ইউটিউবভিত্তিক পডকাস্ট ও টকশো প্ল্যাটফর্ম ‘স্পিক উইথ রাশিদ’-এ দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন তিনি। অনুষ্ঠানটির সঞ্চালক ছিলেন মামুনুর রশীদ।

সাক্ষাৎকারে সঞ্চালক বলেন, একটি গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছিল, শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ভিডিও কুর্মিটোলা বিমানবন্দর থেকে ধারণ করা হয়েছিল এবং তাহসিফ সেটি ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। এ ঘটনায় বিমানবাহিনীর অভ্যন্তরে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর সংশ্লিষ্টতা নিয়ে তদন্তের কথা উল্লেখ করে ওই নেটওয়ার্কের সঙ্গে তাহসিফের নামও যুক্ত করা হয়েছিল বলে জানান তিনি।

জবাবে তাহসিফ বলেন, ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, রিফাত আশরাফী ভিডিওটি ধারণ করেছেন এবং তিনি সেটি ছড়িয়ে দিয়েছেন। তবে ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগের পক্ষে কী প্রমাণ রয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি।

তাহসিফ বলেন, ‘আমি যদি ভিডিওটা করেও থাকি বা ছড়িয়েও থাকি, হোয়াট ইজ দ্য প্রুফ দে হ্যাভিং? আমি এটা জিজ্ঞেস করতে চাই।’

ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগের কারণে বিমানবাহিনী থেকে অব্যাহতি পেয়ে থাকতে পারেন বলেও মনে করেন তাহসিফ। সঞ্চালকের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘হতে পারে। কারণ যে ঘটনাগুলো ওই সময় ঘটেছিল, আমি সবকিছু বলবো না বা আমারও কিছু অপারগতা আছে। আমার মনে হয়, এই অ্যালিগেশনের কারণে তারা এই জিনিসটা করেছে।’

ওই প্রতিবেদন প্রকাশের পর সামাজিকভাবে বিব্রতকর পরিস্থিতি ও হয়রানির মুখে পড়েছিলেন বলেও জানান তিনি। তাহসিফের অভিযোগ, প্রতিবেদনের শিরোনাম ও উপস্থাপনার কারণে পাঠকদের মধ্যে তার সম্পর্কে ভুল ধারণা তৈরি হয়েছিল।

বিমানবাহিনীর অভ্যন্তরে ‘র’-এর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও নাকচ করেন তাহসিফ। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘র-সম্পৃক্ত থেকে থাকলে আমি বাংলাদেশে কেন? তাই না? র-সম্পৃক্ত থাকলে আমি পাবলিকলি কথা বলছি কেন?’

তিনি আরও বলেন, ‘এটা খুবই হাস্যকর একটা ক্লেইম।’

সাক্ষাৎকারে তাহসিফ দাবি করেন, আন্তবাহিনী জনসংযোগ পরিদফতরের (আইএসপিআর) বক্তব্যেও তার এ ধরনের সংশ্লিষ্টতা নেই বলে জানানো হয়েছিল। তবে সাক্ষাৎকারে সঞ্চালক ও তাহসিফের কথোপকথনে এ বিষয়ে বিস্তারিত কোনও নথি উপস্থাপন করা হয়নি।

বিমানবাহিনী থেকে অব্যাহতির সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে পুনরায় আবেদন করেছিলেন কিনা জানতে চাইলে তাহসিফ বলেন, তিনি আবেদন করেননি। ভবিষ্যতে করবেন কিনা তা-ও নিশ্চিত নন।

তবে পাসপোর্ট আটকে রাখার বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি। তাহসিফ বলেন, ‘আমার পাসপোর্টটা আটকিয়ে রেখেছিল, যেটা আমার গণতান্ত্রিক অধিকার। এ বিষয়ে আমি খুবই মনঃক্ষুণ্ন। আমি দুইটা বছর সাফার করেছি।’

সঞ্চালকের প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, পরে পাসপোর্ট ফেরত পেয়েছেন।

এদিকে বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় তাহসিফের বাবা কে এম এনায়েতুল করিম হেলাল জানান, ২০২৪ সালে সরকার পরিবর্তনের পর সেপ্টেম্বরে বিমানবাহিনী থেকে বরখাস্ত করা হয়েছিল তার ছেলেকে। বরখাস্তের কারণ হিসেবে পরিবারকে শৃঙ্খলাজনিত বিষয় জানানো হয়েছিল বলে জানান তিনি।

তাহসিফের বাবা বলেন, ‘এটা তো ডিপার্টমেন্ট বলতে পারবে। কারণ ডিপার্টমেন্ট আমাদের সিম্পলি জানিয়েছে যে এটা ডিসিপ্লিন অর্গানাইজেশন। ওর ইনডিসিপ্লিনের কারণে তাকে ইস্তফা দেওয়া হলো।’

চাকরি হারানোর পর তাহসিফ বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড ও নেত্র নিউজে কাজ করেন। সবশেষ ভার্গো টোব্যাকোতে প্রশাসন ও নিরাপত্তা কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত ছিলেন তিনি।

ছেলের কোনও হুমকি পাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তাহসিফের বাবা বলেন, ছেলে মাঝে মাঝে তাকে আশঙ্কিত থাকার কথা বলতেন। তবে কী কারণে আশঙ্কিত ছিলেন, তা তিনি জানেন না। ছেলেকে হুমকি দেওয়া হয়েছিল—এমন কোনও কথা তিনি বলেননি বলেও স্পষ্ট করেন।

৫ আগস্টের ভিডিও ধারণ বা ছড়িয়ে দেওয়ার বিষয়ে তাহসিফের পরিবারের কাছে কোনও তথ্য ছিল কিনা জানতে চাইলে তার বাবা বলেন, ‘এই বিষয় নিয়ে আমাদের কিছু জানা নেই বা এই কাজটাও (ভিডিও পোস্ট) আসলে করেছে কিনা, এ বিষয়টাও আমাদের জানা নেই।’

বুধবার তুরাগ নদ থেকে তাহসিফের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়। ময়নাতদন্ত শেষে ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ও সহকারী অধ্যাপক ডা. নাশাত জাবীন জানান, তাহসিফের লিভার, কিডনি, পাকস্থলী ও রক্তসহ প্রয়োজনীয় আলামত সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। ডিএনএ প্রোফাইলের নমুনাও সংগ্রহ করা হয়েছে। এসব পরীক্ষার প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যাবে।

ঢাকা জেলা নৌ-পুলিশের পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহ আল মামুন বৃহস্পতিবার জানান, তাহসিফের মরদেহে বাইরে থেকে দৃশ্যমান কোনও আঘাত বা জখমের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর কারণ জানা যাবে। স্বজনদের অভিযোগ অনুযায়ী পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।