তাহসিফের লাশ উদ্ধার: তদন্তের শুরুতেই উঠছে যেসব প্রশ্ন

বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির (২৮) মৃত্যুরহস্য এখনও খোলেনি। বন্ধুর ডাকে উত্তরার বাসা থেকে বের হওয়ার পর কী ঘটেছিল, কীভাবে তিনি তুরাগ নদের নির্জন এলাকায় গেলেন, সঙ্গে থাকা বন্ধুস্থানীয় ছোট ভাই আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপের ভূমিকা কী এবং নদের কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া মোটরসাইকেলটি সেখানে কীভাবে গেলো; এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে তদন্ত সংস্থাগুলো।

তাহসিফের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় মূল তদন্ত করছে নৌপুলিশ। ঘটনাটি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনায় ছায়াতদন্ত করছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। তদন্তের অংশ হিসেবে দীপকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) ঘটনাস্থল ও আশপাশের কয়েকটি জায়গা পরিদর্শন করেছেন তদন্তকারীরা। উদ্ধার করা হয়েছে নম্বরপ্লেটবিহীন একটি মোটরসাইকেলও। তবে এখন পর্যন্ত তাহসিফের মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত কোনও সিদ্ধান্ত জানায়নি পুলিশ।

তদন্তের শুরুতেই কয়েকটি প্রশ্ন সামনে এসেছে। তাহসিফ ও দীপের শেষ যাত্রার প্রকৃত গন্তব্য কোথায় ছিল? রাতের কোন সময়ে তারা রাজাবাড়ী ঘাট এলাকায় গিয়েছিলেন? সেখানে কাদের দেখে তারা দৌড় দিয়েছিলেন বলে দাবি করছেন দীপ? তাহসিফ নদে পড়ে গেলেন কীভাবে? আর তার মোটরসাইকেলটি নদের কাছাকাছি এলাকায় পড়ে থাকলো কেন?

শেষবার একসঙ্গে বের হওয়ার পর কী ঘটেছিল

গত ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় উত্তরার বাসা থেকে বের হন তাহসিফ। পরিবারের কাছে তিনি জানিয়েছিলেন, দীপ নামে তার বন্ধুস্থানীয় এক ছোট ভাই এসেছেন। তার সঙ্গে কথা বলে ফিরবেন। বাসার সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, সন্ধ্যা ৬টা ২৪ মিনিটের দিকে দীপ তাহসিফদের বাসার গ্যারেজে আসেন। কিছুক্ষণ পর তাহসিফ নিচে নামেন। সন্ধ্যা ৬টা ৩১ মিনিটে দুজনকে পৃথক দুটি মোটরসাইকেলে বেরিয়ে যেতে দেখা যায়।

তাহসিফ সাউরি

বৃহস্পতিবার এই ঘটনায় দেশের একাধিক গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দেন দীপ। তার ভাষ্য অনুযায়ী, তাহসিফের মোটরসাইকেল নষ্ট হয়ে যাওয়ায় তিনি বাসায় গিয়েছিলেন। দুজনে মিলে সেটি চালুর চেষ্টা করেন। পরে ওয়ার্কশপে নিয়ে মোটরসাইকেলটি মেরামত ও তেল পরিবর্তন করান। এরপর উত্তরার একটি রেস্তোরাঁয় একসঙ্গে রাতের খাবার খান। খাবার শেষে হাউস বিল্ডিং এলাকায় এসে আলাদা হয়ে যান।

দীপের দাবি ছিল, রাত ১২টার দিকে তারা পৃথক হন। বাসায় ফিরে তাহসিফকে ফোন করলে তার মোবাইল বন্ধ পান। তবে জিজ্ঞাসাবাদে দেওয়া পরবর্তী বক্তব্যে দীপ জানিয়েছেন, তারা রাজাবাড়ী ঘাট ও মাজার বস্তি এলাকায় গিয়েছিলেন। সেখানে পুলিশের মতো পোশাক পরা দুজনকে দেখে দৌড় দেন। এ সময় তাহসিফ নদে ঝাঁপ দেন এবং তিনি পালিয়ে আসেন।

পিবিআই কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দীপের দেওয়া তথ্য সরাসরি বিশ্বাস করছেন না তারা। তার বক্তব্যের সঙ্গে সিসিটিভি ফুটেজসহ অন্যান্য তথ্য মিলিয়ে দেখা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন স্থানের অনেক সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করেছে সংস্থাটি। দুজনের গতিবিধি, কোথায় কতক্ষণ ছিলেন এবং রাতের কোন সময়ে কোন এলাকায় পৌঁছেছিলেন, তা প্রযুক্তির সহায়তায় যাচাই করা হচ্ছে।

কাদের দেখে দৌড় দিয়েছিলেন দীপ ও তাহসিফ

পিবিআই কর্মকর্তাদের কাছে দীপের দেওয়া বক্তব্য অনুযায়ী, তাহসিফ ও তিনি তুরাগ নদের কাছাকাছি একটি এলাকায় ছিলেন। সেখানে পুলিশের মতো পোশাক পরা দুজনকে দেখে তারা দৌড় দেন। দীপের দাবি, এ সময় তাহসিফ নদে ঝাঁপ দেন এবং তিনি পালিয়ে যেতে সক্ষম হন।

তবে দীপের এই বক্তব্যকে হাস্যকর দাবি করেছেন তাহসিফের বাবা কে এম এনায়েতুল করিম। শুক্রবার দুপুরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, ‘হাস্যকর বক্তব্য না? কে চায় এই ঝামেলার মধ্যে পড়তে? ওই অঞ্চলে সে কখনোই গিয়েছে বলে আমি মনে করি না। একজন ডিফেন্স অফিসার পুলিশের ধাওয়ায় দৌড় দেবে; এটা হাস্যকর বক্তব্য না? এটা তো প্রশ্নই আসে না।’

দীপকে নিয়ে তদন্তে পিবিআই সদস্যরা এবং উদ্ধার হওয়া মোটরসাইকেল

পিবিআইয়ের ঢাকা মেট্রো উত্তরের অতিরিক্ত ডিআইজি মো. এনায়েত হোসেন মান্নান শুক্রবার সাংবাদিকদের জানান, কথিত ধাওয়াকারীরা প্রকৃতই পুলিশ সদস্য ছিলেন কিনা, তারা ইউনিফর্ম পরা ছিলেনকি না কিংবা ঘটনাস্থলে পুলিশের কেউ দায়িত্ব পালন করছিলেন কিনা, তা যাচাই করা হচ্ছে। দীপের বক্তব্যের প্রতিটি বিষয়ই পরীক্ষা করা হচ্ছে।

দীপের বক্তব্যের অসংগতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ডিজিটাল ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহাও। তার প্রশ্ন, ধাওয়ার ঘটনা সত্য হলে ধাওয়াকারীরা কারা? তাদের পরিচয় শনাক্ত করার মতো কোনও সিসিটিভি ফুটেজ বা প্রত্যক্ষদর্শী আছেন কি? তাহসিফের ফোন থেকে রাত ১টা ৩৫ মিনিটে পাঠানো বার্তার সঙ্গে কথিত ধাওয়ার সময়ের কোনও সম্পর্ক আছে কি?

তানভীর হাসান জোহার মতে, দীপ যদি তাহসিফকে নদীতে ঝাঁপ দিতে দেখে থাকেন, তাহলে প্রথম বক্তব্যে কেন সেই তথ্য আসেনি, সেটিও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। তিনি বলেন, ‘একজন মানুষ কেন নদীতে ঝাঁপ দেবেন, যদি সত্যিই তাকে ধাওয়া করা হয়ে থাকে?’ এসব প্রশ্নের উত্তর অনুমান দিয়ে নয়, প্রমাণের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠা করতে হবে বলে মনে করেন তিনি।

পিবিআই কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পরবর্তী জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, রাত ২টার দিকে টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় তাদের উপস্থিতির কথা জানা গেছে। দীপের আরেকটি বক্তব্য অনুযায়ী, তাহসিফকে খুঁজে না পেয়ে তিনি মোটরসাইকেল নিয়ে ফিরে আসেন এবং রাত আড়াইটার দিকে বাসায় পৌঁছান। তদন্তকারীরা তার এই আচরণ ও বক্তব্যও গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করছেন।

তদন্তকারীরা আরও জানিয়েছেন, রাজাবাড়ী ঘাট ও আশপাশের এলাকা মাদকসংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডের জন্য পরিচিত। তবে এ তথ্যের ভিত্তিতে তাহসিফ বা দীপের সঙ্গে মাদক কারবারিদের কোনও বিরোধ ছিল কিংবা ঘটনাস্থলে মাদক কারবারিরা উপস্থিত ছিলেন—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছায়নি পিবিআই।

মোটরসাইকেলটি সেখানে গেলো কীভাবে

তাহসিফের সঙ্গে নিয়ে বের হওয়া মোটরসাইকেলটির খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকা থেকে একটি কালো রঙের নম্বরপ্লেটবিহীন সুজুকি জিক্সার মোটরসাইকেল উদ্ধার করে পিবিআই। সংস্থাটির প্রাথমিক ধারণা, এটি তাহসিফের হতে পারে। কারণ বাসা থেকে বের হওয়ার সময় তার ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটির পেছনেও নম্বরপ্লেট ছিল না বলে সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে।

তাহসিফ ও তার বাবা

পিবিআইয়ের পুলিশ সুপার আবু ইউসুফ বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন, উদ্ধার করা মোটরসাইকেলটির কাগজপত্র ও অন্যান্য তথ্য যাচাই করা হচ্ছে। মালিকানা নিশ্চিত হওয়ার আগে এ বিষয়ে চূড়ান্ত কিছু বলা যাচ্ছে না।

গণমাধ্যম প্রতিবেদনে স্থানীয় চায়ের দোকানি জুবাইদা বেগমের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, মোটরসাইকেলটি তার দোকানের কাছের সড়কে দুদিন ধরে পড়ে ছিল। কেউ সেটি নিতে আসেনি। শুক্রবার সকালে পুলিশ সেটি নিয়ে যায় এবং পরে আবার ফিরিয়ে আনে। ফলে মোটরসাইকেলটি সেখানে কখন থেকে ছিল, কে রেখে গিয়েছিল এবং সেটি তাহসিফের হলে কীভাবে সেখানে পৌঁছাল—এসব প্রশ্নও তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে।

এ ছাড়া বাসা থেকে পৃথক দুটি মোটরসাইকেলে বের হওয়ার পর শেষ পর্যন্ত কোন মোটরসাইকেলটি কার কাছে ছিল এবং অন্যটির অবস্থান কী, তা-ও খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা।

শেষ বার্তা ও আইফোনে মিলতে পারে সূত্র

তাহসিফের মৃত্যুরহস্য উদ্ঘাটনে তার মায়ের কাছে পাঠানো শেষ বার্তাটিও গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। পরিবারের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার দিবাগত রাত ১টা ৩৫ মিনিটে মায়ের কাছে বার্তা পাঠিয়ে তাহসিফ জানান, তিনি বাসায় ফিরছেন। এরপর আর পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ হয়নি।

মরদেহ উদ্ধারের সময় তাহসিফের পকেটে একটি আইফোন পাওয়া যায়। তার হাতঘড়িটিও অক্ষত ছিল। পরিচয় শনাক্ত করতে আইফোনটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এখন ফোনটির ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে শেষ সময়ের গতিবিধি সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায় কিনা, সেটি দেখার বিষয়। ফোনের কল হিস্ট্রি, বার্তা, অ্যাপ ব্যবহারের সময়, সংরক্ষিত অবস্থান সংক্রান্ত তথ্য ও অন্যান্য ডিজিটাল আলামত থেকে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।

ডিজিটাল ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহাও রাত ১টা ৩৫ মিনিটে পাঠানো বার্তা, উদ্ধার হওয়া আইফোনের ডিজিটাল তথ্য, সিসিটিভি ফুটেজ এবং মেডিকোলিগ্যাল প্রতিবেদন সমন্বিতভাবে বিশ্লেষণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তার মতে, অনুমানের ভিত্তিতে মৃত্যুর কারণ নির্ধারণ না করে স্বাধীন প্রমাণের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা প্রতিষ্ঠা করা জরুরি।

মৃত্যু দুর্ঘটনা, নাকি অন্য কিছু

তাহসিফের মৃত্যুর কারণ এখনও নিশ্চিত হতে পারেননি তদন্তকারীরা। পিবিআই কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এটি দুর্ঘটনা নাকি হত্যাকাণ্ড—কোনও সম্ভাবনাই এখনই বাদ দেওয়া যাচ্ছে না। দীপের বক্তব্যের পাশাপাশি অন্যান্য তথ্য-প্রমাণ যাচাই করে সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে চান তারা।

তাহসিফের মরদেহ উদ্ধারের পর তৈরি করা সুরতহাল প্রতিবেদনে শরীরে বড় ধরনের আঘাতের চিহ্ন না থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে নাক দিয়ে রক্ত বের হওয়ার তথ্যও রয়েছে। বৃহস্পতিবার শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে তার ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। চূড়ান্ত প্রতিবেদন এখনও পাওয়া যায়নি। তাহসিফের শরীরে কোনও নেশাজাতীয় দ্রব্য, অ্যালকোহল বা বিষের উপস্থিতি ছিল কিনা, সেটিও পরীক্ষার মাধ্যমে জানা যাবে বলে জানিয়েছেন তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

তাহসিফ সাউরি

দীপের দাবি অনুযায়ী, তাহসিফ নিজেই নদে ঝাঁপ দিয়ে থাকলে পানিতে ডুবে তার মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে। তবে তাহসিফ সাঁতার জানতেন বলে দাবি করেছেন তার বাবা। শুক্রবার সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘আমার ছেলে সাঁতার জানতো। ও তো পাইলট। ওদের সুইমিংয়ের কোর্স করা এবং তার ওপর সার্টিফিকেট আছে। সাঁতারের ওপর বড় ধরনের কোর্স করা আছে আমার ছেলের।’

এ কে এম এনায়েতুল করিমের দাবি, তার ছেলের মৃত্যুর ঘটনাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা চলছে। পরিবারের পক্ষ থেকে হত্যার আশঙ্কা প্রকাশ করা হলেও মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে ময়নাতদন্ত ও অন্যান্য পরীক্ষার ফলের অপেক্ষা করতে হচ্ছে।

দীপের বক্তব্য কতটা সত্য

তদন্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের একজন এখন দীপ। তাহসিফ নিখোঁজ হওয়ার আগে দীর্ঘ সময় তার সঙ্গে ছিলেন তিনি। তাদের একসঙ্গে বের হওয়া, মোটরসাইকেল মেরামত, রাতের খাবার এবং পরে আলাদা হয়ে যাওয়ার কথা দীপ নিজেই জানিয়েছেন। আবার জিজ্ঞাসাবাদে ঘটনাস্থলে একসঙ্গে থাকা এবং পুলিশের মতো পোশাক পরা দুজনকে দেখে দৌড়ে পালানোর কথাও বলেছেন।

কিন্তু প্রথম বক্তব্যে রাত ১২টার দিকে আলাদা হয়ে যাওয়ার কথা বললেও পরবর্তী জিজ্ঞাসাবাদে রাত ২টার দিকে মাজার বস্তি এলাকায় উপস্থিত থাকার তথ্য দিয়েছেন তিনি। তাহসিফকে নদীতে ঝাঁপ দিতে দেখার দাবি করলেও প্রথমে তা জানাননি। এসব বক্তব্যের সত্যতা যাচাইয়ে সিসিটিভি ফুটেজ, ফোনের তথ্য ও অন্যান্য আলামত মিলিয়ে দেখছে তদন্ত সংস্থাগুলো।

সব মিলিয়ে তদন্তের সামনে এখন কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—তাহসিফ ও দীপের প্রকৃত চলাচলের সময়সূচি, কথিত ধাওয়ার সত্যতা, ধাওয়াকারীদের পরিচয়, উদ্ধার হওয়া মোটরসাইকেলের মালিকানা এবং মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ। এসব প্রশ্নের উত্তর মিললেই জানা যাবে ২৭ অক্টোবর রাতে আসলে কী ঘটেছিল।

পরিবার মামলা না করলে পুলিশই বাদী হবে

তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় শুক্রবার বিকাল পর্যন্ত পরিবারের পক্ষ থেকে কোনও মামলা করা হয়নি। তার বাবা কে এম এনায়েতুল করিম জানিয়েছেন, পরিবার এখনও মামলা করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়নি। তবে মামলা করা না করার চেয়ে ছেলের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনকেই তিনি বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।

শুক্রবার দুপুরে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘আমার ছেলে দেশের একজন সুনাগরিক ছিল। সশস্ত্র বাহিনীর একজন সদস্য ছিল। তার এ ধরনের মৃত্যুর যেন সুষ্ঠু তদন্ত হয় এবং প্রকৃত কারণ বের হয়ে আসে।’ পরিবার থানায় কী অভিযোগ করলো বা করলো না, শুধু তার ওপর নির্ভর না করে সরকার যেন প্রচলিত আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়, সেই আহ্বানও জানান তিনি।

এদিকে নৌ-পুলিশের প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মো. রেজাউল করিম শুক্রবার বিকালে বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন, পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা করা হয় কিনা, সে জন্য অপেক্ষা করা হচ্ছে। পরিবার মামলা না করলে পুলিশ বাদী হয়ে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেবে। তিনি জানান, নৌপুলিশের পাশাপাশি পিবিআই ঘটনাটি নিয়ে কাজ করছে। জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া বিভিন্ন তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।

উত্তরখান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. হাবিবুর রহমানও জানিয়েছেন, তাহসিফের বাবাকে মামলা করার জন্য থানায় আসতে বলা হয়েছে।

প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন জরুরি

তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনা তদন্ত করে প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন জরুরি বলে মনে করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এই জায়গা থেকে আমরা যেটা চাই, এই ধরনের হত্যার রহস্যগুলো উদ্ঘাটন করা হোক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমরা এক ধরনের বক্তব্য শুনছি। আবার তার পরিবারের কাছ থেকে আমরা আরেক ধরনের বক্তব্য শুনছি। তিনি সবশেষ যার সঙ্গে ঘুরতে বেরিয়েছিলেন, তার কাছ থেকে আরেক ধরনের বক্তব্য শুনছি। এখন এই ধরনের হত্যাকাণ্ড যদি এত সহজে সহজ বিষয় হয় বা খুব সহজ হয়ে যায় তখন মানুষের মধ্যে নাগরিক নিরাপত্তা নিয়ে নানা ধরনের উদ্বেগ উৎকণ্ঠা তৈরি করে।’

একজনের সঙ্গে আরেকজনের নানা ধরনের বিরোধ বা মতপার্থক্য থাকতে পারে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সেটি দেশের প্রচলিত আইন এবং নীতির মধ্যে থেকে মীমাংসা বা সমাধান করার চেষ্টা করা যায়। কিন্তু সেই চেষ্টার পরিবর্তে কাউকে হত্যা করা এবং সে হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন করতে না পারার যে দায়, তা এই ধরনের হত্যাকাণ্ডগুলো বাড়িয়ে দেয়।’

এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন করে দ্রুত জড়িতদের গ্রেফতার ও যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে প্রত্যাশা করেন তিনি। তার ভাষ্য, কেউ কাউকে হত্যা করে যদি দায় থেকে মুক্ত হয়ে যেতে পারে কিংবা বিচারের মুখোমুখি হওয়া থেকে দূরে থাকতে পারে, তাহলে দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়বে।