হঠাৎ কেউ কোলে নিতে গেলেই শিশুর কান্না, বা নতুন কাউকে দেখলেই মায়ের আঁচলে লেগে থাকা—এই দৃশ্য প্রায় সব পরিবারেই পরিচিত। অনেক অভিভাবকই ভাবেন, এটি কি কোনও সমস্যা? নাকি স্বাভাবিক বেড়ে ওঠারই একটি ধাপ?
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের এই আচরণকে বলা হয় স্ট্রেঞ্জার ফিয়ার—যা আসলে স্বাভাবিক বিকাশেরই একটি অংশ।
স্ট্রেঞ্জার ফিয়ার কী?
স্ট্রেঞ্জার ফিয়ার হলো এমন একটি মানসিক প্রতিক্রিয়া, যেখানে শিশু পরিচিত মানুষের বাইরে কাউকে দেখলে অস্বস্তি, ভয় বা অস্বীকৃতি প্রকাশ করে। সাধারণত ৬–৮ মাস বয়স থেকে এটি শুরু হয় এবং ১–২ বছর বয়স পর্যন্ত থাকতে পারে।
কেন হয় এই ভয়?
শিশুর মস্তিষ্ক ধীরে ধীরে পরিচিত ও অপরিচিত মুখ আলাদা করে চিনতে শেখে।
এই সময়— সে বুঝতে শুরু করে কে তার ‘নিরাপদ মানুষ’ (মা-বাবা); অপরিচিত কাউকে দেখলে অনিরাপত্তা অনুভব করে; এটি আসলে শিশুর সংযুক্তি (attachment) গড়ে ওঠার একটি লক্ষণ—মানে সে তার অভিভাবকের সঙ্গে নিরাপত্তার বন্ধন তৈরি করছে।
কীভাবে প্রকাশ পায়?
স্ট্রেঞ্জার ফিয়ারের কিছু সাধারণ লক্ষণ— নতুন কাউকে দেখলেই কান্না করা; কোলে যেতে না চাওয়া; মায়ের কাছ থেকে দূরে যেতে অস্বীকৃতি; লুকিয়ে পড়া বা আঁকড়ে ধরা।
সব শিশুর ক্ষেত্রে কি একই রকম?
এই প্রশ্নের উত্তর হলো ‘না’। কোনও শিশু খুব দ্রুত নতুন মানুষের সঙ্গে মানিয়ে নেয়, আবার কেউ একটু বেশি সময় নেয়। এটি শিশুর স্বভাব, পরিবেশ এবং অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করে।
অভিভাবকরা কী করবেন?
এই সময় শিশুকে জোর করে নতুন মানুষের সঙ্গে মিশতে বাধ্য করা ঠিক নয়। বরং—
সময় দিন: শিশুকে নিজের মতো করে নতুন পরিবেশে অভ্যস্ত হতে দিন
নিরাপত্তা দিন: আপনি পাশে আছেন—এই অনুভূতিটা তাকে বুঝতে দিন
ধীরে পরিচয় করান: নতুন মানুষের সঙ্গে ধীরে ধীরে পরিচয় করান
হাসিখুশি থাকুন: আপনার আচরণ দেখে শিশুও নিরাপদ বোধ করবে
কী করবেন না?
জোর করে কোলে দেওয়া;“ভয় পেলে লজ্জা” বলা; শিশুর অনুভূতিকে উপেক্ষা করা। এগুলো করলে ভয় আরও বেড়ে যেতে পারে।
কখন চিন্তার কারণ?
সাধারণত স্ট্রেঞ্জার ফিয়ার স্বাভাবিক। তবে যদি— ২–৩ বছর পরেও তীব্র ভয় থাকে; সামাজিক মেলামেশায় একেবারেই আগ্রহ না দেখায়; সব ধরনের মানুষের প্রতি অতিরিক্ত ভয় কাজ করে তাহলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
সর্বোপরি, স্ট্রেঞ্জার ফিয়ার কোনও সমস্যা নয়, বরং শিশুর মানসিক বিকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।
এটি দেখায় যে, সে পরিচিত মানুষকে চিনতে শিখছে এবং নিজের নিরাপত্তা নিয়ে সচেতন হচ্ছে।
অভিভাবকদের জন্য বার্তা একটাই—ধৈর্য ধরুন, সময় দিন, আর শিশুর অনুভূতিকে গুরুত্ব দিন। তাহলেই এই ভয় ধীরে ধীরে কেটে যাবে।