অফিসে সবাই যখন ব্যস্ততার প্রতিযোগিতায় মেতে আছে, তখন হয়তো কোনও এক সহকর্মীকে দেখা যায় কাজ শেষ করে চুপচাপ বসে আছেন। বন্ধুদের আড্ডায় কেউ তর্কে জড়িয়ে পড়লেও তিনি সহজেই বিষয়টি এড়িয়ে যান। আবার পরিচিতদের মধ্যে এমন মানুষও আছেন, যারা সুযোগ পেলেই একটু বেশি ঘুমান বা দুপুরে ছোট্ট একটি ঘুম দিয়ে নেন। বাইরে থেকে দেখলে তাদের অনেককেই ‘অলস’ বলে মনে হতে পারে। কিন্তু মনোবিজ্ঞান ও স্নায়ুবিজ্ঞানের কিছু গবেষণা বলছে, এসব আচরণের পেছনে কখনও কখনও লুকিয়ে থাকতে পারে বুদ্ধিমত্তার ভিন্ন এক প্রকাশ।
অবশ্য এর অর্থ এই নয় যে বেশি ঘুমালেই কেউ বুদ্ধিমান, কিংবা কাজ এড়িয়ে গেলেই তিনি মেধাবী। তবে গবেষণাগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে, যে আচরণগুলোকে আমরা প্রায়ই অলসতা বলে মনে করি, সেগুলোর কিছু আসলে দক্ষ চিন্তাভাবনা, আবেগ নিয়ন্ত্রণ বা মানসিক শক্তি সংরক্ষণের কৌশলও হতে পারে।
অপ্রয়োজনীয় পরিশ্রম এড়িয়ে চলা
সমাজে একটি প্রচলিত ধারণা হলো—যত বেশি খাটবেন, তত বেশি বুদ্ধিমান বা সফল হবেন। কিন্তু বাস্তবে বুদ্ধিমান মানুষ সবসময় সবচেয়ে বেশি পরিশ্রম করেন না; অনেক সময় তারা সবচেয়ে কার্যকর উপায়টি খুঁজে বের করেন।
২০০৯ সালে নিউরোসায়েন্স অ্যান্ড বিহেব্যারিয়াল রিভিউস-এ প্রকাশিত একটি পর্যালোচনায় ‘নিউরাল এফিশিয়েন্সি হাইপোথিসিস’-এর কথা বলা হয়। এই ধারণা অনুযায়ী, উচ্চ বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন ব্যক্তিরা অনেক ক্ষেত্রে একই ধরনের মানসিক কাজ করতে তুলনামূলক কম মস্তিষ্কীয় শক্তি ব্যবহার করেন।
অর্থাৎ তারা কাজ এড়িয়ে যান না, বরং কাজটি করার সবচেয়ে কার্যকর পথ খুঁজে নেন। তাই দেখা যায়, তারা পুনরাবৃত্তিমূলক কাজ স্বয়ংক্রিয় করার চেষ্টা করেন, অপ্রয়োজনীয় ধাপ বাদ দেন কিংবা জটিল সমস্যার সহজ সমাধান বের করেন।
বাইরে থেকে এটি কম পরিশ্রম বলে মনে হলেও, আসলে এটি দক্ষতার প্রকাশ হতে পারে।
ঘুমকে গুরুত্ব দেওয়া
অনেকের কাছে বেশি ঘুমানো বা দুপুরে একটু ঘুমিয়ে নেওয়া অলসতার লক্ষণ। কিন্তু বিজ্ঞানীরা বলছেন, ঘুম মস্তিষ্কের জন্য নিষ্ক্রিয় সময় নয়; বরং এটি অত্যন্ত সক্রিয় একটি প্রক্রিয়া।
২০১৫ সালে সায়েন্টিফিক রিপোর্টস-এ প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা যায়, ‘স্লিপ স্পিন্ডল’ নামে পরিচিত বিশেষ ধরনের মস্তিষ্কীয় কার্যকলাপ এবং ফ্লুইড ইন্টেলিজেন্সের মধ্যে ইতিবাচক সম্পর্ক রয়েছে। স্লিপ স্পিন্ডল স্মৃতি সংরক্ষণ, শেখা এবং তথ্য প্রক্রিয়াকরণের সঙ্গে সম্পর্কিত।
গবেষকরা দেখেছেন, উচ্চ বুদ্ধিমত্তার ব্যক্তিদের মধ্যে এমন কিছু ঘুমের বৈশিষ্ট্য দেখা যায়, যা আরও কার্যকর মানসিক প্রক্রিয়াকরণের সঙ্গে যুক্ত।
এ কারণেই অনেক সফল মানুষ ঘুমকে বিলাসিতা নয়, প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ হিসেবে দেখেন। পর্যাপ্ত ঘুম মনোযোগ, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, আবেগ নিয়ন্ত্রণ এবং সৃজনশীল চিন্তাকে শক্তিশালী করতে সাহায্য করে।
তবে এটাও মনে রাখা জরুরি, অতিরিক্ত বা অনিয়ন্ত্রিত ঘুমের সঙ্গে বুদ্ধিমত্তার সরাসরি সম্পর্ক নেই। গবেষণার মূল বার্তা হলো—ঘুমকে অবহেলা না করা।
সব বিষয়ে প্রতিক্রিয়া না দেওয়া
সামাজিকভাবে আমরা প্রায়ই মনে করি, প্রতিটি বিতর্কে জবাব দিতে হবে, প্রতিটি সমালোচনার উত্তর দিতে হবে এবং প্রতিটি সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান করতে হবে।
কিন্তু আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা নিয়ে সাম্প্রতিক গবেষণা ভিন্ন কিছু বলছে।
২০২৫ সালে ফ্রন্টিয়ার্স ইন পাবলিক হেলথ-এ প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, উচ্চ আবেগীয় বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন ব্যক্তিরা চাপ নিয়ন্ত্রণ এবং আবেগ ব্যবস্থাপনায় তুলনামূলক দক্ষ। এর একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো ‘সাইকোলজিক্যাল ডিট্যাচমেন্ট’, অর্থাৎ কোন বিষয় থেকে মানসিকভাবে দূরে সরে আসতে হবে, তা বুঝতে পারা।
ধরা যাক, একজন ব্যক্তি সামান্য সমালোচনা শুনে সারাদিন সেটি নিয়েই ভাবতে থাকেন। অন্যজন প্রয়োজনীয় অংশটুকু গ্রহণ করে বাকিটা ছেড়ে দেন। বাইরে থেকে দ্বিতীয় ব্যক্তিকে উদাসীন মনে হতে পারে, কিন্তু বাস্তবে তিনি হয়তো নিজের মানসিক শক্তি কোথায় ব্যয় করবেন, সে বিষয়ে সচেতন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
সব লড়াইয়ে অংশ না নেওয়া সবসময় দুর্বলতা নয়; অনেক সময় এটি অগ্রাধিকার বোঝার সক্ষমতা।
বুদ্ধিমত্তা সবসময় চোখে পড়ে না
আমরা প্রায়ই বুদ্ধিমত্তাকে নিখুঁত সংগঠন, অবিরাম ব্যস্ততা বা নিরন্তর কাজের সঙ্গে মিলিয়ে দেখি। কিন্তু আধুনিক গবেষণা ইঙ্গিত দিচ্ছে, প্রকৃত বুদ্ধিমত্তা অনেক সময় সম্পদের সঠিক ব্যবহার, পর্যাপ্ত বিশ্রাম এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণের মধ্যেও প্রকাশ পায়।
তাই কাউকে শুধু বাইরে থেকে দেখে ‘অলস’ বলে বিচার করার আগে মনে রাখা ভালো—কখনও কখনও কম শক্তি খরচ করে বেশি ফল পাওয়াটাই হতে পারে সবচেয়ে বুদ্ধিমান সিদ্ধান্ত।









