ঢাকা শহরের কোনও আবাসিক এলাকা দিয়ে হাঁটছেন। হঠাৎ ওপর থেকে ছিটকে এলো এক মগ পানি। কখনও ঝাড়ু দেওয়া ধুলাবালি, কখনও ফলের খোসা, কখনও আবার প্লাস্টিকের ব্যাগভর্তি ময়লা। অল্পের জন্য বেঁচে গেলেন, কিংবা দুর্ভাগ্য হলে ময়লাটা পড়ল আপনার গায়েই।
এমন অভিজ্ঞতা রাজধানীর বাসিন্দাদের কাছে নতুন কিছু নয়। বরং এতটাই পরিচিত যে অনেকেই এটাকে শহুরে জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে ধরে নিয়েছেন।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—যারা জানালা বা বারান্দা থেকে এভাবে ময়লা-আবর্জনা ফেলেন, তারা আসলে কী?
তারা কি অসচেতন? দায়িত্বজ্ঞানহীন? নাকি এর পেছনে কাজ করে আরও গভীর কোনও মনস্তাত্ত্বিক বা সামাজিক কারণ?
বিজ্ঞান বলছে, বিষয়টি শুধু ব্যক্তিগত অভ্যাসের নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের আচরণ, সামাজিক দায়বোধ এবং জনপরিসরকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি।
‘এটা তো আমার জায়গা না’
ঘরের ভেতর অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন যে মানুষ, তিনিই অনেক সময় জানালা দিয়ে ময়লা বাইরে ফেলে দেন।
কেন?
সামাজিক মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, মানুষ সাধারণত ব্যক্তিগত জায়গা এবং সবার ব্যবহারের জায়গাকে সমানভাবে দেখে না। নিজের ঘর, নিজের গাড়ি বা নিজের অফিসের ডেস্কের প্রতি যে দায়িত্ববোধ কাজ করে, রাস্তা, ফুটপাত কিংবা ভবনের নিচের খোলা জায়গার ক্ষেত্রে অনেকের সেই অনুভূতি তৈরি হয় না।
ফলে জনপরিসরকে অনেকেই মনে করেন—এটা সবার, আবার কারও নয়।
সামাজিক মনোবিজ্ঞানে ‘দায়িত্বের বিস্তার’ নামে একটি ধারণা আছে। এর অর্থ হলো, কোনও দায়িত্ব যখন অনেক মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে যায়, তখন প্রত্যেকে ধরে নেয় অন্য কেউ হয়তো কাজটা করবে। এর ফলে ব্যক্তিগত দায়বোধ কমে যেতে পারে।
বারান্দা থেকে ময়লা ফেলার পেছনে এই প্রবণতা কাজ করে কিনা, তা নিয়ে সরাসরি গবেষণা সীমিত। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, জনপরিসরের প্রতি কম মালিকানাবোধ এবং দায়বোধের ঘাটতি এ ধরনের আচরণের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
নোংরা জায়গা আরও নোংরা হয়
আচরণবিজ্ঞানীরা আরেকটি বিষয় নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করেছেন।
দেখা গেছে, কোনও জায়গা যদি আগে থেকেই অপরিচ্ছন্ন থাকে, সেখানে মানুষ আরও সহজে নিয়ম ভাঙে।
রাস্তার পাশে ময়লার স্তূপ পড়ে থাকলে নতুন করে ময়লা ফেলতে মানুষের দ্বিধা কমে যায়। কারণ তারা ধরে নেয়, “এখানে তো সবাই ফেলছে।”
অপরদিকে, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ মানুষকে নিয়ম মেনে চলতে উৎসাহিত করে। অর্থাৎ, অপরিচ্ছন্নতা শুধু একটি ফল নয়, অনেক সময় এটি নতুন অপরিচ্ছন্নতার কারণও হয়ে ওঠে।
এটা কি শুধু অসচেতনতা?
সবসময় নয়। অনেক মানুষ হয়তো সত্যিই বুঝতে পারেন না, তাদের ছোট একটি কাজ অন্যের জন্য কতটা অসুবিধার কারণ হতে পারে। আবার অনেক ক্ষেত্রে মানুষ নিজের কাজের পরিণতি সরাসরি অনুভব করেন না বলেও দায়িত্ববোধ কমে যায়।
ওপরতলা থেকে এক ব্যাগ ময়লা ফেলা হলো। নিচে কে ছিল, ড্রেন আটকালো কিনা, দুর্গন্ধ ছড়ালো কিনা—এসব তার চোখে পড়ে না। ফলে কাজটির সামাজিক প্রভাবও তার কাছে গুরুত্ব হারায়।
‘ছোট’ কাজ, বড় প্রভাব
একটি প্লাস্টিকের বোতল, এক মুঠো আবর্জনা কিংবা এক বালতি ময়লা—আলাদাভাবে দেখলে তেমন বড় কিছু মনে নাও হতে পারে।
কিন্তু যখন হাজারো মানুষ একই কাজ করেন, তখন তার প্রভাব পড়ে পুরো শহরের ওপর।
ড্রেন আটকে যায়, বাড়ে জলাবদ্ধতা, ছড়ায় রোগজীবাণু, নষ্ট হয় পরিবেশ।
শুধু তাই নয়, নগর সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করেন, জনপরিসরের প্রতি উদাসীনতা মানুষের পারস্পরিক আস্থাও কমিয়ে দেয়। কারণ মানুষ তখন ভাবতে শুরু করে—“যদি অন্যরা নিয়ম না মানে, তাহলে আমি কেন মানব?”
তাহলে যারা এ কাজ করেন, তারা আসলে কী?
তারা সবাই খারাপ মানুষ—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সহজ, কিন্তু বিজ্ঞান এত সরল উত্তর দেয় না। বরং বলা যায়, তারা এমন এক সামাজিক সংস্কৃতির অংশ, যেখানে জনপরিসরের প্রতি দায়বোধ দুর্বল, নিয়ম ভাঙার সামাজিক চাপ কম, আর ব্যক্তিগত সুবিধাই হয়ে ওঠে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
তবে এটাও সত্য, সামাজিক প্রভাব থাকলেও ব্যক্তিগত দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। কারণ সভ্যতা শুধু নিজের ঘর পরিষ্কার রাখার নাম নয়।
সভ্যতা হলো এমনভাবে বাঁচা, যাতে আপনার অসচেতনতা অন্যের দুর্ভোগের কারণ না হয়। আর একটা শহর তখনই সত্যিকার অর্থে বাসযোগ্য হয়ে ওঠে, যখন মানুষ বুঝতে শেখে—রাস্তা, ফুটপাত, ড্রেন কিংবা ভবনের নিচের খোলা জায়গাটাও আমার। সেখানে ময়লা ফেলা মানে, শেষ পর্যন্ত নিজের শহরটাকেই নোংরা করা।