সকালে সন্তানের স্কুলে যাওয়ার তাড়া। দুপুরে অফিসের মিটিং। বিকেলে বাবাকে নিয়ে যেতে হবে চিকিৎসকের কাছে। রাতে মেয়ের পরীক্ষার পড়া দেখাতে বসবেন।
এর মাঝখানে নিজের জন্য সময়? অনেকের উত্তর হবে—সেটা আর কোথায়!
আধুনিক জীবনের এক ক্রমবর্ধমান বাস্তবতার নাম স্যান্ডউইচ প্যারেন্টিং। অর্থাৎ, এমন এক পরিস্থিতি যেখানে একজন মানুষ একই সময়ে নিজের সন্তানদের লালন-পালনের দায়িত্ব পালন করছেন, আবার বয়স্ক বাবা-মা কিংবা শ্বশুর-শাশুড়ির যত্নও নিচ্ছেন।
দুই প্রজন্মের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এই মানুষগুলো যেন স্যান্ডউইচের মাঝের স্তর। চাপটা আসে দুই দিক থেকেই, কিন্তু সবচেয়ে কম আলোচনায় থাকেন তারাই।
কেন বাড়ছে এই বাস্তবতা?
গবেষকরা বলছেন, এর পেছনে রয়েছে কয়েকটি বড় সামাজিক পরিবর্তন। মানুষের গড় আয়ু বেড়েছে। ফলে বাবা-মা আগের চেয়ে বেশি দিন বেঁচে থাকছেন এবং অনেকেরই বার্ধক্যে দীর্ঘমেয়াদি যত্নের প্রয়োজন হচ্ছে।
অপরদিকে, অনেকেই আগের চেয়ে দেরিতে সন্তান নিচ্ছেন। ফলে যখন সন্তানেরা এখনো নির্ভরশীল, তখনই বাবা-মাও বয়সজনিত কারণে নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন। ফলে একজন মানুষকে একই সময়ে দুই প্রজন্মের চাহিদা সামলাতে হচ্ছে।
চাপ শুধু সময়ের নয়
প্রথমে মনে হতে পারে, এটি শুধু সময় ব্যবস্থাপনার সমস্যা। কিন্তু বিষয়টি তার চেয়েও গভীর।
স্যান্ডউইচ প্যারেন্টিংয়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানসিক চাপ, অর্থনৈতিক উদ্বেগ এবং এক ধরনের স্থায়ী অপরাধবোধ।
অনেকেই মনে করেন, তারা কাউকেই যথেষ্ট সময় দিতে পারছেন না। সন্তানের সঙ্গে সময় কাটালে মনে হয় বাবা-মায়ের প্রতি অবহেলা হচ্ছে। আবার বয়স্ক বাবা-মায়ের যত্ন নিতে গিয়ে মনে হয়, সন্তানরা বঞ্চিত হচ্ছে।
এই দ্বন্দ্ব থেকে জন্ম নেয় ক্লান্তি, উদ্বেগ, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে অবসাদও।
সবচেয়ে বেশি হারিয়ে যান মাঝের মানুষটি
এই অবস্থার সবচেয়ে বড় শিকার অনেক সময় সম্পর্ক বা ক্যারিয়ার নয়—বরং মানুষটির নিজের জীবন। নিজের শখ ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়। বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ কমে আসে। ছুটি নেওয়া হয়ে ওঠে বিলাসিতা।
অনেকেরই মনে হয়, তারা যেন শুধু দায়িত্ব পালন করছেন—বেঁচে থাকছেন না।
মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, দীর্ঘদিন এমন পরিস্থিতিতে থাকলে মানুষ মানসিকভাবে অবসন্ন হয়ে পড়তে পারেন। কারণ যত্ন নেওয়ার কাজটিও এক ধরনের আবেগগত শ্রম, যার জন্য প্রয়োজন হয় বিশ্রাম ও পুনরুদ্ধার।
বাংলাদেশেও পরিচিত এক বাস্তবতা
বাংলাদেশে ‘স্যান্ডউইচ প্যারেন্টিং’ শব্দটি ততটা পরিচিত না হলেও বাস্তবতা অনেকের কাছেই চেনা।
একদিকে সন্তানের পড়াশোনা, কোচিং, ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ। অন্যদিকে বাবা-মায়ের চিকিৎসা, ওষুধ, হাসপাতাল কিংবা দৈনন্দিন যত্নের ব্যবস্থা। এর সঙ্গে আছে চাকরির চাপ, বাড়তি জীবনযাত্রার ব্যয় এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা।
ফলে অনেকেই অনুভব করেন, তারা যেন দুই প্রজন্মের প্রত্যাশার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছেন।
একদিকে সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়ার দায়িত্ব, অন্যদিকে বাবা-মায়ের বার্ধক্যের নিরাপত্তা। আর মাঝখানে নিজের জীবনটা কোথায় যেন ধীরে ধীরে আড়ালে চলে যায়।
তাহলে কী করা যায়?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রথমেই বুঝতে হবে—সব দায়িত্ব নিখুঁতভাবে পালন করা সবসময় সম্ভব নয়।
নিজের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করা দুর্বলতা নয়। দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়া, পরিবারের অন্য সদস্যদের যুক্ত করা, প্রয়োজন হলে পেশাদার সহায়তা নেওয়া—এসবই বাস্তবসম্মত পথ হতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, নিজের যত্ন নেওয়াকে স্বার্থপরতা হিসেবে না দেখা। কারণ যে মানুষটি সবার যত্ন নিচ্ছেন, তার নিজেরও বিশ্রাম, আনন্দ এবং মানসিক স্বস্তি প্রয়োজন।
শেষ কথা
স্যান্ডউইচ প্যারেন্টিংয়ের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হয়তো এই নয় যে একজন মানুষ অনেক দায়িত্ব পালন করছেন। বরং এই যে, তিনি প্রায়ই ভুলে যান—তার নিজের জীবনও গুরুত্বপূর্ণ।
সন্তান ও বাবা-মায়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এই মানুষগুলো সমাজের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ভরসাগুলোর একটি। তারা সন্তানকে আগলে রাখেন, আবার বাবা-মায়ের হাতও ছাড়েন না।
কিন্তু প্রশ্নটা থেকেই যায়—সবাইকে আগলে রাখা এই মানুষগুলোর খবর, আসলে কে রাখে?









