হঠাৎ মনে হচ্ছে ত্বকের নিচে কিছু একটা নড়ছে। কখনও মনে হয় ছোট ছোট পোকা শরীরজুড়ে হামাগুড়ি দিচ্ছে। বারবার গোসল করেও বা ত্বক পরিষ্কার করেও সেই অনুভূতি যায় না। এমনকি কেউ কেউ দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতে শুরু করেন, তাদের শরীরে পরজীবী বাসা বেঁধেছে।
কিন্তু চিকিৎসকেরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে কোনও পোকা, কীট বা পরজীবীর অস্তিত্ব খুঁজে পান না।
চিকিৎসাবিজ্ঞানে এ ধরনের অবস্থাকে একবোম সিনড্রোম বা পরজীবী থাকার ভ্রান্ত বিশ্বাসজনিত মানসিক ব্যাধি বলা হয়। এটি একটি বিরল কিন্তু স্বীকৃত মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সমস্যা। এতে আক্রান্ত ব্যক্তি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন, তার শরীরে পরজীবী রয়েছে, যদিও চিকিৎসা পরীক্ষায় তার কোনও প্রমাণ পাওয়া যায় না।
এটি কি কল্পনা?
না। এটি সাধারণ অর্থে 'কল্পনা' বা 'ভান' নয়। আক্রান্ত ব্যক্তির কাছে এই অনুভূতি সম্পূর্ণ বাস্তব।
অনেকেই জানান, ত্বকে যেন কিছু হামাগুড়ি দিচ্ছে, কামড়াচ্ছে বা খোঁচা দিচ্ছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই ধরনের অনুভূতিকে হামাগুড়ি দেওয়ার অনুভূতি বলা হয়। তবে এই অনুভূতি থাকলেই যে একবোম সিনড্রোম হবে, এমন নয়। এটি আরও অনেক শারীরিক বা স্নায়বিক সমস্যার কারণেও হতে পারে।
একবোম সিনড্রোমে মূল সমস্যা হলো—শরীরে পরজীবী থাকার বিশ্বাসটি বাস্তবতার সঙ্গে মিল না থাকলেও ব্যক্তি সেটিকে সত্য বলে দৃঢ়ভাবে ধরে রাখেন।
কেন হয় এই সমস্যা?
এখনও এর সুনির্দিষ্ট কারণ পুরোপুরি জানা যায়নি। তবে গবেষণায় কয়েকটি সম্ভাব্য কারণ উঠে এসেছে।
কিছু ক্ষেত্রে এটি একক মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে দেখা দেয়। আবার কখনও এটি অন্য কোনও রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
যেমন— পারকিনসন রোগ বা স্মৃতিভ্রংশের মতো কিছু স্নায়বিক রোগ; তীব্র বিষণ্নতা বা অন্যান্য মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা; দীর্ঘদিন কিছু মাদকদ্রব্য ব্যবহার; ভিটামিন বি–১২-এর ঘাটতি; কিছু হরমোনজনিত বা বিপাকীয় সমস্যা; বিরল ক্ষেত্রে কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া।
তাই এই ধরনের উপসর্গ দেখা দিলে শুধু মানসিক কারণ ধরে নেওয়া হয় না; চিকিৎসকেরা আগে সম্ভাব্য শারীরিক কারণগুলোও খতিয়ে দেখেন।
আক্রান্ত ব্যক্তিরা কী করেন?
অনেক আক্রান্ত ব্যক্তি বিভিন্ন চিকিৎসকের কাছে বারবার যান। কেউ কেউ ত্বক থেকে সংগ্রহ করা ধুলাবালি, চামড়ার খোসা বা ছোট ছোট কণাকে 'প্রমাণ' হিসেবে নিয়ে যান।
আবার কেউ কেউ ত্বক থেকে 'পোকা বের করার' চেষ্টা করতে গিয়ে নিজেই ক্ষত তৈরি করে ফেলেন। এতে সংক্রমণ বা স্থায়ী দাগের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
রোগ নির্ণয় কীভাবে হয়?
একবোম সিনড্রোম নির্ণয়ের আগে চিকিৎসকেরা নিশ্চিত হতে চান, সত্যিই কোনও পরজীবী সংক্রমণ, চর্মরোগ বা অন্য শারীরিক সমস্যা আছে কি না।
প্রয়োজনে চর্মরোগ, মানসিক স্বাস্থ্য ও স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞরা একসঙ্গে রোগীকে মূল্যায়ন করেন।
কারণ প্রকৃত পরজীবী সংক্রমণ ও এই মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার চিকিৎসা সম্পূর্ণ ভিন্ন।
চিকিৎসা কী?
একবোম সিনড্রোমের চিকিৎসা সম্ভব। বর্তমানে বিশেষজ্ঞরা প্রয়োজন অনুযায়ী মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত ওষুধ ব্যবহার করেন। পাশাপাশি রোগীর সঙ্গে আস্থাভিত্তিক সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং নিয়মিত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের তত্ত্বাবধান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তবে অনেক রোগী শুরুতে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের কাছে যেতে অনিচ্ছুক থাকেন। কারণ তারা বিশ্বাস করেন, সমস্যাটি মানসিক নয়; বরং সত্যিই শরীরে পরজীবী রয়েছে।
তাই চিকিৎসকদের জন্যও এটি একটি সংবেদনশীল পরিস্থিতি। রোগীকে ভুল প্রমাণ করার চেষ্টা না করে, তার কষ্টকে গুরুত্ব দিয়ে ধীরে ধীরে চিকিৎসায় যুক্ত করার পরামর্শ দেওয়া হয়।
একবোম সিনড্রোম কি বিরল?
হ্যাঁ। এটি তুলনামূলকভাবে বিরল একটি রোগ। গবেষণায় দেখা গেছে, মধ্য ও বয়স্ক মানুষের মধ্যে এটি তুলনামূলক বেশি দেখা যায় এবং নারীদের মধ্যে কিছুটা বেশি শনাক্ত হয়। তবে যে কোনও বয়সের মানুষেরই এই সমস্যা হতে পারে।
মনে রাখা জরুরি
শরীরে পোকা হাঁটার অনুভূতি মানেই একবোম সিনড্রোম নয়। অ্যালার্জি, স্নায়ুরোগ, ডায়াবেটিস, কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বা প্রকৃত পরজীবী সংক্রমণেও একই ধরনের অনুভূতি হতে পারে।
তাই এমন উপসর্গ দেখা দিলে নিজে সিদ্ধান্ত না নিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
একবোম সিনড্রোম আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানুষের মস্তিষ্ক ও শরীরের সম্পর্ক অত্যন্ত জটিল। কখনও কখনও একজন মানুষ এমন অনুভূতি পেতে পারেন, যা তার কাছে সম্পূর্ণ বাস্তব, কিন্তু যার কোনও দৃশ্যমান শারীরিক কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না। তাই এ ধরনের রোগকে অবহেলা বা উপহাস নয়, বরং সহানুভূতি, বৈজ্ঞানিক বোঝাপড়া এবং যথাযথ চিকিৎসার মাধ্যমে দেখাই সবচেয়ে জরুরি।