পেটের ডান পাশে ছোট্ট একটি থলির মতো অঙ্গ। নাম তার অ্যাপেনডিক্স। অনেকের কাছেই এটি পরিচিত কেবল একটি কারণেই—অ্যাপেনডিসাইটিস। ব্যথা হলে অস্ত্রোপচার করে ফেলে দিতে হয়, তারপরও মানুষ স্বাভাবিক জীবনযাপন করেন।
তাই দীর্ঘদিন ধরে একটি ধারণা প্রচলিত ছিল—অ্যাপেনডিক্সের কোনও কাজ নেই। এটি মানুষের শরীরে টিকে থাকা এক ধরনের 'অপ্রয়োজনীয়' অঙ্গ।
কিন্তু আধুনিক জীববিজ্ঞান বলছে, বিষয়টি এতটা সহজ নয়। অ্যাপেনডিক্স হয়তো বেঁচে থাকার জন্য অপরিহার্য নয়, তবে একেবারেই অকার্যকরও নয়। বরং এটি শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা ও অন্ত্রের স্বাস্থ্য রক্ষায় কিছু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
অ্যাপেনডিক্স আসলে কী?
অ্যাপেনডিক্স হলো বড় অন্ত্রের শুরুর অংশে যুক্ত আঙুলের মতো সরু একটি থলি। সাধারণত এর দৈর্ঘ্য ৬ থেকে ১০ সেন্টিমিটারের মধ্যে হয়।
একসময় বিজ্ঞানীরা মনে করতেন, মানুষের পূর্বপুরুষরা বেশি পাতা ও আঁশযুক্ত খাবার খেতেন। সেই খাবার হজমে অ্যাপেনডিক্সের ভূমিকা ছিল। খাদ্যাভ্যাস বদলে যাওয়ার পর এর প্রয়োজনীয়তা কমে যায়। তাই একে 'ভেস্টিজিয়াল অর্গান' বা বিবর্তনের পথে গুরুত্ব হারানো অঙ্গ হিসেবে ধরা হতো।
তবে সাম্প্রতিক কয়েক দশকের গবেষণা এই ধারণাকে নতুনভাবে মূল্যায়ন করতে শুরু করেছে।
অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়ার নিরাপদ আশ্রয়?
মানুষের অন্ত্রে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ব্যাকটেরিয়া বাস করে। এদের অধিকাংশই উপকারী। তারা খাবার হজমে সাহায্য করে, ভিটামিন তৈরি করে এবং রোগজীবাণুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ভূমিকা রাখে।
বিজ্ঞানীদের একটি প্রভাবশালী ধারণা হলো, অ্যাপেনডিক্স এই উপকারী ব্যাকটেরিয়ার জন্য একটি 'নিরাপদ আশ্রয়' হিসেবে কাজ করতে পারে।
ধরুন, ডায়রিয়া বা অন্ত্রের সংক্রমণে অনেক উপকারী ব্যাকটেরিয়া শরীর থেকে বেরিয়ে গেল। তখন অ্যাপেনডিক্সে টিকে থাকা ব্যাকটেরিয়াগুলো আবার অন্ত্রে ছড়িয়ে পড়ে মাইক্রোবায়োম পুনর্গঠনে সহায়তা করতে পারে।
যদিও এই ধারণা নিয়ে এখনও গবেষণা চলছে, তবু অনেক গবেষক এটিকে সম্ভাব্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা হিসেবে বিবেচনা করছেন।
রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার সঙ্গেও সম্পর্ক আছে
অ্যাপেনডিক্সে লিম্ফয়েড টিস্যু নামে বিশেষ ধরনের টিস্যু থাকে, যা শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার অংশ।
বিশেষ করে শৈশব ও কৈশোরে এই টিস্যুগুলো অন্ত্রের রোগজীবাণু চিনতে এবং রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে 'প্রশিক্ষণ' দিতে ভূমিকা রাখতে পারে বলে ধারণা করা হয়।
অর্থাৎ অ্যাপেনডিক্স শুধু হজমতন্ত্রের অংশ নয়, এটি রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার সঙ্গেও যুক্ত।
তাহলে অ্যাপেনডিক্স কেটে ফেললে সমস্যা হয় না কেন?
এখানেই অনেকের প্রশ্ন—যদি এত কাজ থাকে, তাহলে অ্যাপেনডিক্স কেটে ফেললেও মানুষ স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকেন কীভাবে?
উত্তর হলো, মানুষের শরীরে অনেক কাজই একাধিক অঙ্গ মিলেই সম্পন্ন করে।
অ্যাপেনডিক্সের সম্ভাব্য কাজগুলো গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেগুলো একমাত্র এই অঙ্গের ওপর নির্ভরশীল নয়। শরীরের অন্য অংশও একই ধরনের ভূমিকা পালন করতে পারে।
তাই চিকিৎসাগত প্রয়োজনে অ্যাপেনডিক্স অপসারণ করলে অধিকাংশ মানুষের দীর্ঘমেয়াদে বড় কোনও স্বাস্থ্যসমস্যা দেখা যায় না।
তাহলে বিবর্তন এটিকে সরিয়ে দেয়নি কেন?
বিবর্তন নিয়ে একটি প্রচলিত ভুল ধারণা হলো, যে অঙ্গের খুব বেশি কাজ নেই, সেটি দ্রুত হারিয়ে যায়।
বাস্তবে বিষয়টি এমন নয়। প্রাকৃতিক নির্বাচন সাধারণত এমন বৈশিষ্ট্যকেই সরিয়ে দেয়, যা বেঁচে থাকা বা প্রজননের জন্য ক্ষতিকর।
কিন্তু কোনও অঙ্গ যদি খুব বেশি ক্ষতিকর না হয়, আবার সামান্য হলেও উপকার করে, তাহলে সেটি লাখ লাখ বছর ধরে টিকে থাকতে পারে।
গবেষকেরা আরও দেখেছেন, শুধু মানুষ নয়—বিভিন্ন স্তন্যপায়ী প্রাণীতেও স্বাধীনভাবে অ্যাপেনডিক্সের মতো অঙ্গ বিবর্তিত হয়েছে। এটিও ইঙ্গিত দেয় যে, অঙ্গটির কিছু জৈবিক সুবিধা থাকতে পারে।
অ্যাপেনডিসাইটিস কেন হয়?
অ্যাপেনডিক্সের ভেতরের পথ মল, শক্ত হয়ে যাওয়া মলকণা (ফিক্যালিথ), লিম্ফ টিস্যুর ফোলা বা খুব কম ক্ষেত্রে অন্য কারণে বন্ধ হয়ে গেলে সেখানে ব্যাকটেরিয়া বেড়ে যেতে পারে।
এর ফলে প্রদাহ তৈরি হয়, যাকে বলা হয় অ্যাপেনডিসাইটিস।
সাধারণত পেটের মাঝখানে ব্যথা শুরু হয়ে পরে ডান পাশের নিচের অংশে চলে আসে। এর সঙ্গে জ্বর, বমি বমি ভাব বা ক্ষুধামন্দাও থাকতে পারে।
সময়মতো চিকিৎসা না হলে অ্যাপেনডিক্স ফেটে যেতে পারে, যা জীবনহানিকর জটিলতা তৈরি করতে পারে। তাই এমন লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
তাহলে বিজ্ঞান কী বলছে?
আজ থেকে কয়েক দশক আগে বিজ্ঞানীরা অ্যাপেনডিক্সকে প্রায় অকার্যকর অঙ্গ বলেই মনে করতেন।
কিন্তু আধুনিক গবেষণা বলছে, এটি সম্ভবত শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা এবং অন্ত্রের উপকারী জীবাণুর ভারসাম্য রক্ষায় কিছু ভূমিকা রাখে।
তবে এটাও সত্য যে, অ্যাপেনডিক্স ছাড়াও মানুষ সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন। অর্থাৎ এটি অপরিহার্য নয়, কিন্তু সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয়—এ কথাও আর নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।
সর্বোপরি, বিজ্ঞান যত এগোচ্ছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে—মানবদেহের অনেক ছোট অঙ্গের মতো অ্যাপেনডিক্সও হয়তো এমন কিছু কাজ করে, যার সবটাই আমরা এখনও পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারিনি।









