মানুষের শরীরে কোটি কোটি অণুজীব বাস করে। তাদের অনেকগুলোকে আমরা রোগের সঙ্গে মিলিয়ে দেখি। কিন্তু শরীরে থাকা সব ব্যাকটেরিয়া যে ক্ষতিকর, তা নয়। বরং আমাদের হজম, রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা এবং শরীরের স্বাভাবিক নানা কাজের সঙ্গে এসব অণুজীবের গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে।
অবাক করার বিষয় হলো, আপনার শরীরে থাকা এই অণুজীবের একটা বড় অংশের গল্প শুরু হয়েছিল আপনার জন্মের সময় থেকেই।
আর সেই গল্পে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রগুলোর একজন—আপনার মা।
সাম্প্রতিক গবেষণায় বলা হয়েছে, মানুষের মাইক্রোবায়োম বা শরীরে থাকা অণুজীবের সমষ্টি গড়ে ওঠার শুরুতেই মায়ের কাছ থেকে পাওয়া অণুজীবের বড় ভূমিকা রয়েছে। প্রকৃতি যেন প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই অণুজীবের উত্তরাধিকার পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করে রেখেছে।
জন্মের সময়ই শুরু হয় ‘অণুজীবের যাত্রা’
শিশু যখন মায়ের গর্ভে থাকে, তখন তার শরীরে থাকা অণুজীবের জগতটি বাইরের পৃথিবীর মতো নয়। জন্মের সময় পরিস্থিতি বদলে যায়।
প্রসবের সময় শিশুর শরীর মায়ের জন্মনালির সংস্পর্শে আসে। এর মাধ্যমে মায়ের শরীরে থাকা কিছু অণুজীব শিশুর শরীরে পৌঁছে যায়।
এই অণুজীবগুলো পরে শিশুর নিজস্ব মাইক্রোবায়োম তৈরির প্রাথমিক ভিত্তি গড়ে তুলতে সাহায্য করে।
অর্থাৎ পৃথিবীতে আসার প্রথম মুহূর্তগুলোতেই শিশু একা নয়—তার শরীরে অণুজীবের একটি নতুন জগতও ধীরে ধীরে গড়ে উঠতে শুরু করে।
শুনতে অস্বস্তিকর, কিন্তু মায়ের শরীরের আরও কিছু অণুজীবও আসে
এখানে গল্পটা একটু অস্বস্তিকর।
প্রসবের সময় শিশুর শরীরে মায়ের অন্ত্রের কিছু ব্যাকটেরিয়াও পৌঁছাতে পারে। শুনতে অস্বাভাবিক লাগলেও জীববিজ্ঞানের দিক থেকে এর একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ আছে।
এই অণুজীবগুলো শিশুর অন্ত্রে মাইক্রোবায়োম গড়ে উঠতে সাহায্য করে। একই সঙ্গে শিশুর রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা কোন অণুজীবকে সহ্য করবে আর কোনটির বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া দেখাবে—সেই প্রাথমিক শিক্ষাতেও ভূমিকা রাখতে পারে।
অর্থাৎ জন্মের মুহূর্তে পাওয়া অণুজীবগুলো শুধু শরীরে এসে বসে থাকে না। তারা শিশুর শরীরের সঙ্গে এক ধরনের দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক তৈরির প্রক্রিয়া শুরু করে।
মায়ের বুকের দুধেও আছে অণুজীব
মায়ের কাছ থেকে শিশুর অণুজীব পাওয়ার গল্প জন্মের সঙ্গে শেষ হয় না।
বুকের দুধের মাধ্যমেও শিশু বিভিন্ন অণুজীব পেতে পারে। শুধু অণুজীবই নয়, বুকের দুধে এমন উপাদানও থাকে যা শিশুর অন্ত্রে থাকা উপকারী অণুজীবগুলোর বেড়ে উঠতে সাহায্য করে।
অর্থাৎ শিশুর মাইক্রোবায়োম গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে মায়ের ভূমিকা একাধিক ধাপে কাজ করে।
জন্মের সময় এক ধরনের অণুজীব, এরপর মায়ের দুধের মাধ্যমে আরেক ধরনের সহায়তা—সব মিলিয়ে শিশুর শরীরে ধীরে ধীরে তৈরি হয় নিজস্ব অণুজীবের জগৎ।
সিজারিয়ান হলে কী হয়?
যেসব শিশু সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে জন্মায়, তাদের শুরুটা কিছুটা ভিন্ন হতে পারে।
স্বাভাবিক প্রসবের সময় মায়ের শরীর থেকে যে অণুজীবগুলো সরাসরি শিশুর শরীরে পৌঁছানোর সুযোগ পায়, সিজারিয়ানের ক্ষেত্রে সেই সংস্পর্শ হয় না। ফলে জন্মের পর শিশুর শরীরে যে অণুজীবের সমষ্টি তৈরি হয়, তার ধরনও কিছুটা আলাদা হতে পারে।
কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, সিজারিয়ানে জন্ম নেওয়া শিশুদের অন্ত্রে নির্দিষ্ট কিছু ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি স্বাভাবিক প্রসবের শিশুদের তুলনায় দেরিতে দেখা যেতে পারে।
তবে এখানেই গল্প শেষ নয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, সময়ের সঙ্গে অনেক শিশুর মাইক্রোবায়োম স্বাভাবিক অবস্থার কাছাকাছি চলে আসে। বুকের দুধও এই প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখতে পারে।
তাই সিজারিয়ান জন্ম মানেই শিশুর মাইক্রোবায়োম খারাপ—এমন সরল সিদ্ধান্তে যাওয়ার সুযোগ নেই।
মাইক্রোবায়োম এত গুরুত্বপূর্ণ কেন?
এখানেই বিষয়টি আরও আকর্ষণীয়।
মানুষের শরীর আর তার অণুজীবগুলোকে আলাদা দুটি জগত ভাবলে ভুল হবে। দীর্ঘ বিবর্তনের পথে মানুষ ও অণুজীবের মধ্যে এমন এক সম্পর্ক তৈরি হয়েছে, যেখানে দুপক্ষই একে অপরের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
আমাদের শরীর এমন কিছু কাজের জন্য অণুজীবের ওপর নির্ভর করে, যার মধ্যে বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান তৈরির মতো বিষয়ও রয়েছে। আবার অণুজীবের অনেক প্রজাতিও মানুষের শরীরের বাইরে স্বাধীনভাবে টিকে থাকতে পারে না।
তাই প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে এই অণুজীবের উত্তরাধিকার পৌঁছে দেওয়া জীববিজ্ঞানের দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মায়ের কাছ থেকে পাওয়া অণুজীব কি সারাজীবন থাকে?
পুরোপুরি একই অবস্থায় থাকে না।
শিশু বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে খাবার, পরিবেশ, মানুষজনের সংস্পর্শ, ওষুধ এবং জীবনযাপনের নানা বিষয় তার মাইক্রোবায়োম বদলে দেয়।
তবু জীবনের শুরুর সময় পাওয়া অণুজীবগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করতে পারে। একটি সাম্প্রতিক ডাচ গবেষণায় ৭১৪টি মা-শিশু জুটিকে গর্ভাবস্থার ছয় মাস থেকে শিশুর এক বছর বয়স পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করা হয়। সেখানে মায়ের কাছ থেকে শিশুর মাইক্রোবায়োমে অণুজীব পৌঁছানোর বিভিন্ন পথ বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষণাটিতে মায়ের অন্ত্রের অণুজীবের মাধ্যমে সংক্রমণের প্রভাবকে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ পাওয়া যায়।
শরীরের অণুজীবের সঙ্গে মস্তিষ্কেরও সম্পর্ক আছে?
আছে—এবং এখানেই বিষয়টি আরও মজার।
অন্ত্র ও মস্তিষ্কের মধ্যে যে যোগাযোগব্যবস্থা রয়েছে, তাকে বলা হয় গাট-ব্রেইন অ্যাক্সিস। অন্ত্রের অণুজীব এই ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত
এ কারণে মাইক্রোবায়োম শুধু হজমের বিষয় নয়; মেজাজ, চিন্তা ও স্মৃতির মতো মানসিক কার্যক্রমের সঙ্গেও এর সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা চলছে। তবে এসব সম্পর্ককে সরাসরি ‘এই ব্যাকটেরিয়া থাকলেই এমন মানসিক অবস্থা হবে’—এভাবে দেখার সুযোগ নেই। বিষয়টি অনেক বেশি জটিল।
তাহলে আপনি আসলে একা নন!
মানুষ নিজের শরীরকে সাধারণত ‘আমি’ বলে ভাবি। কিন্তু শরীরের ভেতরে তাকালে দেখা যায়, সেখানে অসংখ্য অণুজীবেরও বসবাস।
আর সেই অণুজীবের গল্পের শুরু হতে পারে আপনার জন্মের মুহূর্তেই—মায়ের শরীর থেকে পাওয়া অণুজীব দিয়ে।
তারপর সময়ের সঙ্গে খাবার, পরিবেশ ও জীবনযাপন সেই মাইক্রোবায়োমকে বদলে দেয়।
অর্থাৎ আপনার শরীরের ভেতরের এই অদৃশ্য জগতের একটা অংশের ইতিহাস আপনার নিজের জন্মেরও আগে শুরু হয়েছিল।
আপনার শরীরের অণুজীবের গল্প তাই শুধু আপনার গল্প নয়—এটি এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে চলে আসা এক অদৃশ্য উত্তরাধিকার।