আপনি বিড়ালকে ডাকলেন। সে একবার তাকা, তারপর এমন ভাব করল যেন আপনাকে জীবনে দেখেইনি। আদর করতে গেলেন, হয়তো একটু দূরে সরে গেল। আবার কখনও দেখা গেল, সারাদিন আপনার আশপাশে ঘুরছে, গা ঘেঁষে বসছে কিংবা নির্দিষ্ট সময়ে খাবারের জন্য আপনাকেই খুঁজছে।
তাহলে আসলে বিড়াল কী চায়? একা থাকতে, নাকি মানুষের সঙ্গ?
বিড়ালকে আমরা সাধারণত স্বাধীনচেতা, আত্মকেন্দ্রিক এবং একাকী প্রাণী হিসেবেই দেখি। কুকুরের মতো মানুষের সঙ্গে সবসময় যোগাযোগের চেষ্টা করে না। ডাকলেও অনেক সময় সাড়া দেয় না। ফলে বিড়াল কতটা সামাজিক, আর কতটাই বা বুদ্ধিমান—এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে বিজ্ঞানীরাও বেশ মজার এক সমস্যার মুখোমুখি হন।
কারণ, বিড়াল কোনও কাজ না করলে তার মানে এই নয় যে সে কাজটি করতে পারে না। হতে পারে, সে কাজটি করতেই চাইছে না।
আর এই পার্থক্যটাই বিড়ালের বুদ্ধিমত্তা বোঝার ক্ষেত্রে বড় বাধা।
মানুষের ঘরে এলো কীভাবে?
বিড়ালের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কও অন্য অনেক গৃহপালিত প্রাণীর মতো নয়।
গবেষকদের মতে, প্রায় ১০ হাজার থেকে ৫ হাজার বছর আগে মধ্যপ্রাচ্যে আফ্রিকান বন্য বিড়াল থেকে গৃহপালিত বিড়ালের বিকাশ শুরু হয়। তবে মানুষ বসে বসে বিড়ালকে পোষ মানিয়েছে—গল্পটা সম্ভবত এতটা সরল নয়।
বরং বিড়ালই যেন নিজে থেকে মানুষের কাছে এসেছিল।
মানুষ যখন গ্রাম ও পরে শহরে খাদ্যশস্য মজুত করতে শুরু করলো, তখন সেখানে ইঁদুর ও ইঁদুরজাতীয় প্রাণীর আনাগোনা বাড়ল। আর সেই সহজ শিকারের টানেই বন্য বিড়াল মানুষের বসতির আশপাশে ঘুরতে শুরু করে।
শুরুতে মানুষ ও বিড়ালের সম্পর্কটা ছিল অনেকটা পারস্পরিক সুবিধার। বিড়াল পেত খাবারের সহজ উৎস, আর মানুষ পেত শস্যের আশপাশে ঘুরে বেড়ানো ইঁদুরের হাত থেকে কিছুটা সুরক্ষা।
সময় গড়ানোর সঙ্গে সেই সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়। আর একপর্যায়ে বিড়াল জায়গা করে নেয় মানুষের ঘরেও।
তাহলে কি তারা সত্যিই একা থাকতে ভালোবাসে?
এক কথায় উত্তর—সবসময় নয়। বর্তমানের গৃহপালিত বিড়াল পরিস্থিতিভেদে একা থাকতে পারে, আবার দলবদ্ধ হয়েও থাকতে পারে। খাবার, আশ্রয় ও সঙ্গীর প্রাপ্যতার ওপর তাদের সামাজিক আচরণ অনেকটাই নির্ভর করে।
এমনকি একই পরিবারের প্রাপ্তবয়স্ক স্ত্রী বিড়াল কখনও কখনও একসঙ্গে বাচ্চাদের লালন-পালন করে।
অবশ্য সব বিড়ালের স্বভাব এক নয়। কেউ বেশ সামাজিক, কেউ আবার তুলনামূলক একা থাকতে পছন্দ করে। নিজেদের মধ্যে যোগাযোগের ক্ষেত্রেও তারা গন্ধের সংকেত ব্যবহার করে।
নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিটি বিড়ালের শরীরে থাকা ১৩টি ফ্যাটি অ্যাসিডের ওপর ভিত্তি করে আলাদা এক ধরনের রাসায়নিক ‘পরিচয়পত্র’ তৈরি হয়। অন্য বিড়াল প্রস্রাবের গন্ধের মাধ্যমে পরিচিত বিড়ালকে আলাদা করে চিনতে পারে।
অর্থাৎ, বিড়ালের জগতে পরিচয় শুধু মুখ দেখে হয় না; গন্ধও সেখানে গুরুত্বপূর্ণ।
মানুষের সঙ্গেও বন্ধুত্ব হয়
মানুষের সঙ্গে বিড়ালের সামাজিক সম্পর্কও তৈরি হতে পারে। আর এই সম্পর্ক তৈরিতে বিড়ালের জীবনের প্রথম কয়েক সপ্তাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে দুই থেকে সাত সপ্তাহ বয়সে বিড়ালছানাকে নিয়মিত মানুষের সংস্পর্শে রাখলে বড় হয়ে তারা তুলনামূলক বন্ধুসুলভ ও কম ভীতু হয়।
অর্থাৎ, যে বিড়ালটিকে আপনি ছোটবেলা থেকেই মানুষের সঙ্গে মিশতে দেখেছেন, তার আচরণ আর মানুষের সংস্পর্শ না পাওয়া বিড়ালের আচরণ এক নাও হতে পারে।
মালিকের কণ্ঠও চেনে?
এখানেই বিড়াল নিয়ে প্রচলিত অনেক ধারণা একটু নড়বড়ে হয়ে যায়।
গবেষণায় দেখা গেছে, বিড়াল তাদের মালিককে চিনতে পারে। মালিক ও অপরিচিত মানুষের কণ্ঠের মধ্যেও তারা পার্থক্য করতে পারে।
এমনকি মানুষ কোনও দিকে ইঙ্গিত করলে সেই নির্দেশনা অনুসরণ করে লুকানো খাবারের অবস্থানও খুঁজে নিতে পারে।
তবে কুকুরের সঙ্গে এখানেই বিড়ালের একটি বড় পার্থক্য।
কোনও সমস্যা সমাধান করতে না পারলে কুকুর অনেক সময় মালিকের দিকে তাকিয়ে সাহায্য চায়। বিড়ালের মধ্যে সাধারণত তেমন আচরণ দেখা যায় না।
মানুষের কণ্ঠের প্রতিও তারা সাধারণত যোগাযোগের জন্য কুকুরের মতো সক্রিয় প্রতিক্রিয়া দেখায় না। বরং মনোযোগ দেওয়া বা তাকানোর মতো আচরণ করে।
তাহলে কি বিড়াল কম বুদ্ধিমান?
বিষয়টি এত সহজ নয়। বিড়ালকে বুদ্ধিমান প্রমাণ করতে গেলেই বিপদ! বিড়ালের বুদ্ধিমত্তা বোঝার জন্য গবেষকেরা নানা ধরনের পরীক্ষা করেছেন। এর মধ্যে একটি পরীক্ষায় দেখা হয়েছিল, খাবারের সঙ্গে দড়ির সম্পর্ক বিড়াল বুঝতে পারে কি না।
দুটি দড়ির মধ্যে একটি খাবারের সঙ্গে যুক্ত ছিল। সঠিক দড়িটি টানলেই খাবার পাওয়ার কথা।
কিন্তু বিড়ালরা সঠিক দড়িটি বেছে নেওয়ার কোনও বিশেষ প্রবণতা দেখায়নি।
শুনে মনে হতে পারে, তারা বুঝতেই পারেনি কোন দড়ির সঙ্গে খাবার যুক্ত। কিন্তু এখানেই গবেষণার আসল মজাটা।
এর মানে যে বিড়াল কারণ-ফল সম্পর্ক বুঝতে পারে না, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। অন্য একটি সম্ভাবনা হলো—খাবার পাওয়ার চেয়ে দড়ি নিয়ে খেলতেই তাদের বেশি আগ্রহ ছিল।
অর্থাৎ, পরীক্ষায় বিড়ালের ব্যর্থতা সবসময় তার জ্ঞানীয় সীমাবদ্ধতার প্রমাণ নয়। কখনও কখনও সেটি শুধু প্রমাণ করে, বিড়ালটি পরীক্ষায় অংশ নিতে আগ্রহী ছিল না।
রহস্যটা এখানেই
কুকুরের তুলনায় বিড়াল নিয়ে গবেষণা এখনও তুলনামূলকভাবে সীমিত। এর একটি কারণ হতে পারে, গবেষণাগারে বিড়ালকে নির্দিষ্ট কাজ করানোই বেশ কঠিন।
তবে যত গবেষণা হচ্ছে, ততই একটি বিষয় স্পষ্ট হচ্ছে—বিড়ালকে শুধু একা থাকতে পছন্দ করা, মানুষের প্রতি উদাসীন কিংবা ‘নিজের জগতে থাকা’ প্রাণী হিসেবে দেখলে তাদের পুরোপুরি বোঝা যায় না।
তারা সামাজিক হতে পারে, মানুষের কণ্ঠ চিনতে পারে, মানুষের দেখানো দিক অনুসরণ করতে পারে এবং নিজেদের মধ্যে জটিল গন্ধ-সংকেত ব্যবহার করে যোগাযোগ করতে পারে।
আবার একইসঙ্গে তারা এমন প্রাণী, যারা গবেষকের সাজানো পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার প্রয়োজনও মনে করতে পারে না!
সম্ভবত বিড়ালকে বোঝার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখানেই। তারা কুকুরের মতো সবসময় নিজেদের সক্ষমতা আমাদের সামনে মেলে ধরে না। কখনও তারা পারে, কখনও চায় না—আর এই দুটির পার্থক্য বোঝাই বিজ্ঞানীদের জন্য সবচেয়ে কঠিন কাজ।
তাই পরেরবার আপনার বিড়াল ডাক শুনেও আপনার দিকে তাকিয়ে চলে গেলে খুব দ্রুত সিদ্ধান্তে যাবেন না যে সে আপনাকে পাত্তা দেয় না। হতে পারে, সে আপনাকে খুব ভালোভাবেই চিনেছে। শুধু উত্তর দেওয়ার প্রয়োজনটা সে দেখছে না।