দানিউব নদী থেকে ভেসে উঠছে নাৎসি আমলের যুদ্ধজাহাজ

জীবনযাপন ডেস্ক
৩০ আগস্ট ২০২৬, ১৮:১৩আপডেট : ৩০ আগস্ট ২০২৬, ১৮:১৩

নদীর পানি কমছে। আর সেই সঙ্গে দানিউবের বুক থেকে একে একে জেগে উঠছে ইউরোপের রক্তাক্ত অতীত। মরিচা ধরা জাহাজের কাঠামো, ভাঙা মাস্তুল আর পানির ওপর উঁকি দেওয়া যুদ্ধজাহাজের ধ্বংসাবশেষ যেন আট দশক আগের এক ভয়াবহ সময়কে আবারও চোখের সামনে ফিরিয়ে আনছে।

তীব্র দাবদাহ ও খরায় দানিউব নদীর পানির স্তর রেকর্ড পরিমাণ নিচে নেমে যাওয়ায় পূর্ব সার্বিয়ার প্রাহোভোর কাছে অন্তত ২০টি জার্মান যুদ্ধজাহাজের ধ্বংসাবশেষ দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। এগুলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষদিকে ইচ্ছাকৃতভাবে ডুবিয়ে দেওয়া নাৎসি জার্মানির কৃষ্ণসাগরীয় নৌবহরের জাহাজ।

এর আগেও খরার সময় এসব ধ্বংসাবশেষ পানির নিচ থেকে ভেসে উঠেছিল। তবে এবারের তীব্র দাবদাহ ও দীর্ঘস্থায়ী খরায় কয়েক ডজন জাহাজ নতুন করে দৃশ্যমান হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, কিছু জাহাজের ভেতরে এখনও অস্ত্র ও অবিস্ফোরিত গোলাবারুদ রয়েছে।

এই গ্রীষ্মে দানিউব ধরে ভ্রমণকারী পর্যটকদের সামনে তাই উন্মোচিত হচ্ছে এমন এক ভূদৃশ্য ও ইতিহাস, যা সাধারণত নদীর গভীর পানির নিচেই লুকিয়ে থাকে।

দানিউব নদী (ছবি: বিবিসি)

দানিউবের তলায় আট দশকের ইতিহাস

কীভাবে এসব যুদ্ধজাহাজ দানিউবের তলায় গিয়ে ঠাঁই পেলো, সেই গল্পের শুরু আট দশকেরও বেশি আগে।

১৯৪৪ সালে পূর্ব রণাঙ্গনে জার্মান বাহিনী পিছু হটতে শুরু করে। অন্যদিকে সোভিয়েত বাহিনী দ্রুত ওই অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নিতে এগিয়ে আসছিল। সেই সময় প্রায় ২০০টি নাৎসি জার্মানির কৃষ্ণসাগরীয় নৌবহরের জাহাজ এমন এক এলাকায় আটকা পড়ে যায়, যা দ্রুত সোভিয়েত নিয়ন্ত্রণে চলে যাচ্ছিল।

দানিউব তখন তাদের পালিয়ে যাওয়ার সম্ভাব্য পথ। কিন্তু নদীর সরু ও ঐতিহাসিকভাবে বিপজ্জনক অংশ ‘আয়রন গেটস’ হয়ে ওঠে বড় বাধা। রেড আর্মি এগিয়ে আসার মুখে ১৯৪৪ সালের সেপ্টেম্বরে জার্মান রিয়ার অ্যাডমিরাল পল-ভিলি জিব ২০০টিরও বেশি জাহাজ ডুবিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন।

উদ্দেশ্য ছিল স্পষ্ট, জাহাজগুলো যেন শত্রুর হাতে না পড়ে এবং একই সঙ্গে সোভিয়েত বাহিনীর অগ্রযাত্রায় বাধা সৃষ্টি হয়।

ভ্রমণ পরিকল্পনাকারী কেনেথ রিস, যিনি সম্প্রতি দানিউবের নিম্ন অববাহিকায় নদীভ্রমণ করেছেন, তিনি বলেন, “আজ আপনি একটি নদীভ্রমণ জাহাজের ডেকে বসে হাতে এক গ্লাস ওয়াইন নিয়ে চারপাশের সুন্দর দেশগুলোর দৃশ্য উপভোগ করতে পারেন। কিন্তু এই একই ভূদৃশ্য একসময় যুদ্ধ, ফ্যাসিবাদ, নিপীড়ন এবং মানুষের সীমাহীন দুর্ভোগের সাক্ষী ছিল।”

নদীর তলায় লুকিয়ে থাকা বিপদ

সেই সময়ের পর থেকে বেশিরভাগ জাহাজই ডানিউবের পানির নিচে পড়ে আছে। অনেক জাহাজের ভেতরে এখনও অস্ত্র ও অবিস্ফোরিত গোলাবারুদ থাকার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে এগুলো শুধু ইতিহাসের নিদর্শন নয়, নৌযান চলাচলের জন্যও সম্ভাব্য বিপদ।

ধ্বংসাবশেষগুলো সরাতে সার্বিয়া আনুমানিক ৩ কোটি ইউরোর একটি কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। তবে নদীর তলদেশ থেকে এসব জাহাজ নিরাপদে সরিয়ে ফেলা অত্যন্ত জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। এ কারণেই প্রকল্পটির অগ্রগতিও ধীর।

শুধু যুদ্ধজাহাজ নয়, জেগে উঠছে আরও ইতিহাস

দানিউবের পানি কমে যাওয়ায় শুধু নাৎসি আমলের যুদ্ধজাহাজই নয়, আরও নানা ঐতিহাসিক নিদর্শন ও ধ্বংসাবশেষ নদীর বুক থেকে জেগে উঠছে।

চলতি আগস্টে নদীর পানি নেমে যাওয়ায় বুদাপেস্টে জার্মান সেনাবাহিনীর ব্যবহৃত একটি সামরিক মোটরসাইকেলও দৃশ্যমান হয়েছে। স্লোভাকিয়ার ভির্টের কাছে পাওয়া গেছে ১ হাজার ৫৪৩ পাউন্ড ওজনের একটি ব্রিটিশ বোমা, যা পরে নিরাপদে নিষ্ক্রিয় করা হয়।

বুলগেরিয়ার গিগেন এলাকায় পানি কমে যাওয়ায় প্রাচীন কনস্টান্টাইন সেতুর ধ্বংসাবশেষও দৃশ্যমান হয়েছে। আর রিয়াহোভোর কাছে প্রত্নতাত্ত্বিকেরা উদ্ধার করেছেন হাজার হাজার বছর আগের পশমি ম্যামথের দাঁত ও হাড়।

বুলগেরিয়ার প্লেভেন আঞ্চলিক ইতিহাস জাদুঘরের প্রত্নতত্ত্ববিদ ও ইতিহাস গবেষক পাভেল পোপভ বলেন, “প্রত্নতাত্ত্বিকদের জন্য এ ধরনের মুহূর্ত অত্যন্ত মূল্যবান। এটি নিদর্শনগুলোকে তাদের প্রকৃত পরিবেশে পর্যবেক্ষণ, নথিভুক্ত ও গবেষণা করার জন্য আমাদের বিরল একটি সুযোগ করে দেয়।”

অতীতের পাশাপাশি ভবিষ্যতেরও সতর্কবার্তা

দানিউব নদীতে খরা ও পানির স্তরের ওঠানামা নতুন কোনও ঘটনা নয়। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের কোপার্নিকাস জলবায়ু পরিবর্তন পরিষেবার তথ্য অনুযায়ী, ইউরোপ বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত উষ্ণ হয়ে ওঠা মহাদেশ। সেখানে তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা তীব্র দাবদাহ বাড়াচ্ছে এবং বদলে দিচ্ছে বৃষ্টিপাতের ধরন। এর ফলে দানিউব নদীতে বারবার অস্বাভাবিকভাবে পানির স্তর কমে যাওয়ার ঘটনা ঘটছে, যা নদীপথে নৌযান চলাচলেও ব্যাঘাত সৃষ্টি করছে।

রিস বলেন, “দানিউব একই সময়ে আমাদের অতীতের সতর্কবার্তাগুলো সামনে নিয়ে আসছিল এবং সম্ভবত আমাদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কেও একটি সতর্কবার্তা দিচ্ছিল।”

পর্যটকদের ভ্রমণেও পড়ছে প্রভাব

পানির স্তর কমে যাওয়ার প্রভাব ইতোমধ্যেই দানিউব অঞ্চলে ভ্রমণকারী পর্যটকদের ওপর পড়তে শুরু করেছে।

এবারের গ্রীষ্মে পানির স্তর অস্বাভাবিকভাবে কমে যাওয়ায় নদীভ্রমণ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে বেশ কিছু যাত্রা বাতিল করতে হয়েছে। কোথাও ভ্রমণপথ পরিবর্তন করা হয়েছে, কোথাও যাত্রীদের এক জাহাজ থেকে অন্য জাহাজে স্থানান্তর করা হয়েছে। আবার নদীর যেসব অংশে নৌযান চলাচল সম্ভব হচ্ছে না, সেসব অংশ এড়িয়ে যেতে যাত্রীদের বাসে করে নিয়ে যেতে হচ্ছে।

তবে নদীর এই পরিবর্তিত রূপ ভ্রমণকারীদের সামনে খুলে দিচ্ছে এক বিরল অভিজ্ঞতার দরজাও।

সম্প্রতি দানিউব পাড়ি দেওয়া সুজানা ফুলটন বলেন, “আমরা কখনও ভাবিনি যে ডুবে যাওয়া জার্মান যুদ্ধজাহাজগুলোর ঠিক ওপর দিয়ে আমাদের জাহাজ চলবে। অভিজ্ঞতাটি ছিল একই সঙ্গে বিনয় জাগানো এবং সত্যি বলতে বেশ রোমাঞ্চকর।”

যে নদী শুধু পথ দেখায় না, ইতিহাসও শোনায়

প্রায় ২ হাজার ৮৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ দানিউব ইউরোপের দ্বিতীয় দীর্ঘতম নদী। ১০টি দেশের মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া এই নদী শুধু এক দেশ থেকে আরেক দেশে যাওয়ার জলপথ নয়, এর দুই তীরে ছড়িয়ে আছে শতাব্দীর পর শতাব্দীর ইতিহাস, সাম্রাজ্যের উত্থান-পতন, যুদ্ধ, রাজনৈতিক পালাবদল, ফ্যাসিবাদ, কমিউনিজম ও স্বৈরশাসনের নানা অধ্যায়।

সম্প্রতি দানিউবের নিম্ন অববাহিকায় ভ্রমণ করেছেন ভ্রমণ পরিকল্পনাকারী কেনেথ রিস বলেন, “আমরা মধ্যযুগের দুর্গগুলো ঘুরে দেখেছি, কমিউনিজম ও স্বৈরশাসনের অধীনে মানুষের জীবনযাপনের গল্প শুনেছি, এই অঞ্চলের ইতিহাসকে বদলে দেওয়া যুদ্ধগুলো সম্পর্কে জেনেছি এবং এমন সব জায়গার মধ্য দিয়ে ভ্রমণ করেছি, যেখানে সেই ইতিহাসের কিছু অংশ এখনও মানুষের স্মৃতিতে জীবন্ত।”

তিনি আরও বলেন, “দানিউবের তলায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার জার্মান যুদ্ধজাহাজের ধ্বংসাবশেষের কথা জানতে পেরে ইতিহাসের সঙ্গে যেন আরও একটি নতুন স্তর যুক্ত হলো। ইতিহাস শুধু জাদুঘর কিংবা স্মৃতিস্তম্ভের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। এর কিছু অংশ যে আক্ষরিক অর্থেই আমাদের পায়ের নিচে লুকিয়ে ছিল।”

রিসের কাছে দানিউবের এই অভিজ্ঞতার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক ছিল নদীর সৌন্দর্য আর তার তলায় লুকিয়ে থাকা ভয়াবহ ইতিহাসের বৈপরীত্য।

রিস বলেন, “আমার মনে হয়, এ বিষয়টিই আমাকে সবচেয়ে বেশি নাড়া দিয়েছে। দানিউব শুধু আমাদের ইউরোপের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে নিয়ে যাচ্ছিল না, অনেক অর্থেই এটি আমাদের ইউরোপের ইতিহাসের মধ্য দিয়েও ভ্রমণ করাচ্ছিল।”

সূত্র: বিবিসি

/এমএএল/
সম্পর্কিত
পাহাড়ের বুক চিরে বয়ে চলা নদীতে সাঁতারের রোমাঞ্চ
মরা নদীতে একজনকে বাঁচাতে গিয়ে একে একে মারা গেলো ৫ শিশু
নদী দখল করে দুটি হোটেল তৈরি হয়ে গেলো, বিআইডব্লিউটিএ বলছে জানেই না
সর্বশেষ খবর
মার্কিন বাহিনীর ঘাঁটি ব্যবহারের দায় জাপান সরকারের: আরাঘচি
মার্কিন বাহিনীর ঘাঁটি ব্যবহারের দায় জাপান সরকারের: আরাঘচি
গুম প্রতিরোধে স্বাধীন তদন্তসহ কার্যকর আইনের দাবিতে স্পিকারকে স্মারকলিপি
গুম প্রতিরোধে স্বাধীন তদন্তসহ কার্যকর আইনের দাবিতে স্পিকারকে স্মারকলিপি
সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডে নতুন তথ্যের খবরে ট্রাইব্যুনালে মেঘ
সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডে নতুন তথ্যের খবরে ট্রাইব্যুনালে মেঘ
শাহজালালের থার্ড টার্মিনালে অতিরিক্ত ৯০০ কোটি টাকা খরচের ব্যাখ্যা দিলেন মন্ত্রী
শাহজালালের থার্ড টার্মিনালে অতিরিক্ত ৯০০ কোটি টাকা খরচের ব্যাখ্যা দিলেন মন্ত্রী
সর্বাধিক পঠিত
ডিসেম্বরে আওয়ামী লীগ ফেরার হাওয়া দুইটা জায়গায় দেখা যায়: সারজিস আলম
ডিসেম্বরে আওয়ামী লীগ ফেরার হাওয়া দুইটা জায়গায় দেখা যায়: সারজিস আলম
‘এরা আমাকে মেরে ফেলবে’; মৃত্যুর আগে তরুণীর আকুতি, সন্তানসহ মৃত্যু
‘এরা আমাকে মেরে ফেলবে’; মৃত্যুর আগে তরুণীর আকুতি, সন্তানসহ মৃত্যু
কী ঘটেছিল সেদিন রাতে, থানায় এসে বিস্তারিত জানালেন ভাইরাল তরুণী
কী ঘটেছিল সেদিন রাতে, থানায় এসে বিস্তারিত জানালেন ভাইরাল তরুণী
অনুমোদনহীন স্লিপার বাসের বিরুদ্ধে ব্যবস্থার নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর
অনুমোদনহীন স্লিপার বাসের বিরুদ্ধে ব্যবস্থার নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর
‘রাগে-অভিমানে’ ইনস্টাগ্রাম থেকে বাংলাদেশের সব ছবি মুছে ফেললেন কিউবা মিচেল
‘রাগে-অভিমানে’ ইনস্টাগ্রাম থেকে বাংলাদেশের সব ছবি মুছে ফেললেন কিউবা মিচেল