কেউ আপনার সামনে হাই তুললেন। আপনি তাকিয়ে আছেন। কয়েক সেকেন্ড পর টের পেলেন, নিজের মুখটাও অজান্তেই হাঁ হয়ে গেছে!
এমনটা নিশ্চয়ই বহুবার হয়েছে। মজার ব্যাপার হলো, শুধু কাউকে হাই তুলতে দেখলেই নয়—কখনও হাই তোলার কথা পড়লেও, শুনলেও, এমনকি সেটা নিয়ে ভাবলেও নিজের হাই চলে আসতে পারে। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় “সংক্রামক হাই তোলা”।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, হাই কি সত্যিই সংক্রামক? আর কেনই বা অন্য একজনের হাই দেখে আমাদের মস্তিষ্কও একই কাজ করে?
গবেষণা বলছে, এর পেছনে শুধু ঘুম বা ক্লান্তি নয়, সামাজিক ও স্নায়ুবৈজ্ঞানিক কিছু প্রক্রিয়াও কাজ করতে পারে। তবে বিজ্ঞান এখনও এর পুরো রহস্যের সমাধান করতে পারেনি।
হাই আসলে কেন আসে?
হাই তোলাকে আমরা সাধারণত ঘুমের লক্ষণ বা বিরক্তির প্রকাশ হিসেবে দেখি। কিন্তু এর কাজ কী—এই প্রশ্নের উত্তর নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে এখনও পুরোপুরি ঐকমত্য নেই।
একসময় মনে করা হতো, শরীরে অক্সিজেন কমে গেলে হাই আসে। কিন্তু পরীক্ষায় দেখা গেছে, বেশি অক্সিজেন শ্বাস নিলেও হাই কমে না, আবার কার্বন ডাই-অক্সাইডের মাত্রা বাড়ালেও হাইয়ের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে না। এমনকি ব্যায়াম করে শ্বাস-প্রশ্বাসের হার দ্বিগুণ হলেও হাই তোলার হার বদলায়নি। ফলে ‘অক্সিজেনের ঘাটতি পূরণ করতেই হাই’—এই পুরোনো ধারণার পক্ষে শক্ত প্রমাণ নেই।
হাই তোলার সম্ভাব্য কাজ নিয়ে অবশ্য আরও কিছু তত্ত্ব আছে। এর একটি হলো, হাই তোলা মস্তিষ্কের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখতে পারে। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, পরিবেশের তাপমাত্রার সঙ্গে হাই তোলার প্রবণতার সম্পর্ক আছে। তবে এটিও হাইয়ের একমাত্র ও চূড়ান্ত ব্যাখ্যা—এমনটা বলা যাচ্ছে না। হাই কেন আসে, তার পূর্ণাঙ্গ উত্তর এখনও গবেষণার বিষয়।
অন্যের হাই দেখে নিজের হাই কেন?
এখানেই আসে ‘সংক্রামক হাই’। কেউ হাই তুললে আমাদের মস্তিষ্ক তার মুখের সেই আচরণটি লক্ষ্য করে। তারপর কোনও সচেতন সিদ্ধান্ত ছাড়াই নিজের মধ্যেও একই প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে। মানুষের ক্ষেত্রে এই ঘটনা পরীক্ষায় বারবার দেখা গেছে। শুধু তা-ই নয়, শিম্পাঞ্জির মতো অন্য কিছু সামাজিক প্রাণীর মধ্যেও এমন আচরণ পাওয়া গেছে।
এর একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হলো—মানুষের মস্তিষ্ক অন্যের আচরণ দেখে তার সঙ্গে নিজেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সামঞ্জস্য করতে পারে। হাসি দেখলে হাসি আসে, কারও মুখ গোমড়া হলে নিজের মেজাজও খানিকটা বদলে যেতে পারে। সংক্রামক হাইও হয়তো এই সামাজিক অনুকরণেরই একটি অদ্ভুত উদাহরণ।
তবে এখানেই বিজ্ঞান একটু সাবধান হতে বলে।
তাহলে কি বেশি হাই মানে বেশি সহানুভূতি?
এই ধারণাটি বেশ জনপ্রিয়। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষ অপরিচিত ব্যক্তির তুলনায় আত্মীয়, বন্ধু বা পরিচিত মানুষের হাই দেখলে বেশি হাই তুলতে পারে। ২০১১ সালের একটি গবেষণায় সামাজিক ঘনিষ্ঠতাই সংক্রামক হাইয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পূর্বাভাসদাতা হিসেবে উঠে আসে—আত্মীয়দের ক্ষেত্রে প্রতিক্রিয়া বেশি, এরপর বন্ধু, পরিচিত এবং সবশেষে অপরিচিতদের ক্ষেত্রে কম।
এ থেকেই ধারণা তৈরি হয়েছে, অন্যের হাই ‘ধরে ফেলা’র সঙ্গে সহানুভূতি বা আবেগগত সংযোগের সম্পর্ক থাকতে পারে।
কিন্তু বিষয়টা এত সহজ নয়।
২০১৭ সালে প্রকাশিত একটি বিস্তৃত পর্যালোচনায় গবেষকরা দেখেন, সংক্রামক হাই ও সহানুভূতির সম্পর্ক নিয়ে আগের গবেষণার ফল একেবারে একমত নয়। কোথাও সম্পর্কের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, কোথাও আবার তা স্পষ্ট হয়নি। মানুষের মনোযোগ কোথায় ছিল, মুখের দিকে সে কতটা তাকাচ্ছিল, সামাজিক সংকোচের মতো বিষয়ও ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে। তাই , “যে বেশি হাই ধরে, সে বেশি সহানুভূতিশীল”—এমন সরল সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়।
পরিচিত মানুষের হাই কেন বেশি কাজ করতে পারে?
এখানে সামাজিক সম্পর্কের একটা মজার ভূমিকা থাকতে পারে।
২০১১ সালের গবেষণায় দেখা গিয়েছিল, কাছের মানুষের হাই দেখলে সংক্রামক হাইয়ের প্রতিক্রিয়া তুলনামূলক বেশি। অর্থাৎ, আপনার পাশে বসা ঘনিষ্ঠ বন্ধুর হাই হয়তো আপনার মধ্যে দ্রুত প্রতিক্রিয়া তৈরি করবে, কিন্তু বাসে পাশে বসা অচেনা ব্যক্তির হাই একইভাবে কাজ নাও করতে পারে।
শিম্পাঞ্জিদের ওপরও গবেষণায় পরিচিত ও অপরিচিত সদস্যদের মধ্যে এমন পার্থক্যের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তারা পরিচিত সদস্যের হাই দেখলে বেশি হাই তুলেছিল।
তবে অন্য গবেষণায় আবার দেখা গেছে, মানুষের সংক্রামক হাই শুধু সামাজিক ঘনিষ্ঠতার ওপর নির্ভর করে না। এমনকি ভিন্ন প্রাণীর হাই দেখেও মানুষের মধ্যে এই প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে। ফলে বিষয়টি শুধু ‘আমি তোমাকে চিনি, তাই তোমার হাই ধরলাম’—এতটা সরল নয়।
ছোটদের ক্ষেত্রে কী হয়?
সংক্রামক হাই বয়সের সঙ্গে বিকশিত হয় বলেও গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া যায়। এক গবেষণায় ১ থেকে ৬ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে দেখা যায়, প্রায় ৪ বছর বয়সের দিকে অন্যের হাই দেখে হাই তোলার প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে। অর্থাৎ, জন্মের পর থেকেই এই সামাজিক প্রতিক্রিয়াটি পুরোপুরি তৈরি থাকে না; বয়স বাড়ার সঙ্গে এর বিকাশ ঘটে।
অটিজম স্পেকট্রামের শিশুদের নিয়ে হওয়া গবেষণাতেও বিষয়টি আরও জটিল বলে দেখা গেছে। আগের কিছু গবেষণায় তাদের মধ্যে সংক্রামক হাই কম দেখা গেলেও পরবর্তী গবেষণায় দেখা যায়, শিশুরা অন্যের মুখের দিকে কতটা মনোযোগ দিচ্ছে—এটি ফলাফলে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। মুখের দিকে মনোযোগ নিশ্চিত করে পরীক্ষা করলে অটিজম স্পেকট্রামের শিশুরাও হাই দেখলে বেশি হাই তুলেছে।
অর্থাৎ, হাই ‘ধরতে’ না পারা মানেই কারও সহানুভূতি কম—এমন সিদ্ধান্তও বৈজ্ঞানিকভাবে ঠিক নয়।
তাহলে শেষ কথা কী?
কেউ হাই তুললে আপনারও হাই আসা নিছক কাকতালীয় ঘটনা নয়। এটি মানুষের মধ্যে পরীক্ষায় দেখা একটি বাস্তব আচরণ। এর সঙ্গে সামাজিক মনোযোগ, পরিচিতি, আবেগগত সংযোগ এবং মস্তিষ্কের স্বয়ংক্রিয় অনুকরণমূলক প্রক্রিয়ার সম্পর্ক থাকতে পারে।
কিন্তু হাইয়ের রহস্য এখানেই—বিজ্ঞান এখনও নিশ্চিতভাবে বলতে পারেনি, মানুষ কেন হাই তোলে এবং কেন অন্যের হাই দেখে নিজেরও হাই আসে।
তাই পরেরবার কেউ আপনার সামনে হাই তুললে তাকে শুধু ‘ঘুম পাচ্ছে’ বলে পাশ কাটিয়ে যাবেন না। একটু অপেক্ষা করুন।
হয়তো কয়েক সেকেন্ড পর আপনিও মুখ হাঁ করে বসে থাকবেন—আর তখন আপনার মস্তিষ্কই আপনাকে মনে করিয়ে দেবে, মানুষের আচরণ কত অদ্ভুতভাবে একে অন্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।