রাতের বেলা হঠাৎ দরজায় শব্দ। বুক ধড়ফড় করছে। মনে হচ্ছে, কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে। অথচ একটু পর দেখা গেল—জানালায় বাতাসের ধাক্কা ছাড়া কিছুই নয়।
আবার এমনও হয়, নতুন অফিসে প্রথম দিন ঢোকার আগে একই রকম বুক ধড়ফড়ানি। অচেনা মানুষের সামনে কথা বলার সময় হাত ঘেমে যায়। নতুন কিছু শুরু করার আগে মনে হয়, ‘যদি না পারি?’
দুই ক্ষেত্রেই অনুভূতিটা ভয়। কিন্তু বিপদ কি দুই ক্ষেত্রেই আছে?
মনোবিজ্ঞানী ও চিকিৎসক রান ডি. অ্যানবার বলছেন, ভয় সবসময় আমাদের শত্রু নয়। বরং বিপজ্জনক কিছু থেকে দূরে রাখতে ভয় আমাদের গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা দেয়। বিষাক্ত কিছু খাওয়া, চলন্ত গাড়ির সামনে ছুটে যাওয়া কিংবা বুনো প্রাণীকে আদর করতে এগিয়ে যাওয়া থেকে যে ভয় আমাদের থামায়, সেটি স্বাভাবিক ও প্রয়োজনীয়। সমস্যা তখনই, যখন ভয় এমন সিদ্ধান্ত নিতে শুরু করে, যা আমাদের জীবনের জন্য ভালো নয়।
তাই ভয় পেলেই প্রথম প্রশ্ন হওয়া উচিত—‘আমি যা নিয়ে ভয় পাচ্ছি, সেটি কি সত্যিই বিপজ্জনক, নাকি শুধু ভয় লাগছে?’
একটি পাহাড়ের খাদের কিনারায় অসাবধানভাবে দাঁড়িয়ে থাকা যেমন ভয়ংকর, তেমনি বাস্তব বিপদও। কিন্তু নতুন কর্মস্থলে প্রথম দিন যাওয়ার অনুভূতি ভয়ংকর হলেও সেটি সাধারণত শারীরিক বিপদ নয়। মস্তিষ্ক অনেক সময় এই দুই অভিজ্ঞতাকে একইভাবে অনুভব করাতে পারে। তবে ধীরে ধীরে তাকে পার্থক্যটা শেখানো যায়।
নিজের শক্তির কথা মনে করুন
ভয় সামনে এলে আমরা প্রায়ই ভুলে যাই, এর আগেও কত ভয় পেরিয়ে এসেছি।
সাইকেল চালানো, সাঁতার শেখা, গাড়ি চালানো, নতুন শহরে যাওয়া, নতুন চাকরি শুরু করা—প্রথমবার সবকিছুই অচেনা এবং কিছুটা ভয়ংকর। পরে সেগুলোই স্বাভাবিক হয়ে যায়।
তাই ভয় লাগলে নিজের পুরোনো অভিজ্ঞতার দিকে ফিরে তাকানো যেতে পারে। মনে করুন, এর আগেও আপনি কঠিন পরিস্থিতি সামলেছেন। ভুল করেছেন, শিখেছেন, আবার চেষ্টা করেছেন। প্রয়োজন হলে সাহায্যও চেয়েছেন।
এই আত্মবিশ্বাসটুকু গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ভয় কাটানোর অর্থ এই নয় যে আপনি কখনও ভয় পাবেন না; বরং ভয় পেলেও আপনি পরিস্থিতি সামলাতে পারবেন—এই বিশ্বাস তৈরি করা।
ভয়টা কোথা থেকে এসেছে, খুঁজে দেখুন
অনেক ভয়ই বর্তমানের নয়, অতীতের কোনও ঘটনার উত্তরাধিকার।
ছোটবেলায় একটি কুকুর কামড়েছিল। সেই অভিজ্ঞতার পর হয়তো সব কুকুরকেই ভয় লাগতে পারে। কিন্তু যে মানুষটি আজ কুকুর দেখলে ভয় পাচ্ছেন, তিনি আর সেই ছোট শিশুটি নন। মাঝখানে কেটে গেছে বহু বছর, এসেছে নতুন অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান।
তাই ভয় তৈরি হওয়ার সেই পুরোনো ঘটনাটিকে নতুন করে দেখার চেষ্টা করা যেতে পারে। কল্পনা করুন, আজকের আপনি সেই সময়ের নিজের পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। তাকে বোঝাচ্ছেন—ঘটনাটি ভয়ংকর ছিল, কিন্তু সেটি একটি নির্দিষ্ট ঘটনা; পুরো পৃথিবী এমন নয়।
অ্যানবারের মতে, বারবার এভাবে পুরোনো স্মৃতিকে নতুন প্রেক্ষাপটে দেখার চেষ্টা করলে সেই স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ভয় কিছুটা কমতে পারে।
একবারে নয়, ধীরে ধীরে মুখোমুখি হন
ভয় কাটানোর আরেকটি উপায় হলো যে বিষয়টিকে ভয় পাচ্ছেন, তার সঙ্গে অল্প অল্প করে পরিচিত হওয়া।
ধরা যাক, আপনার সাপের ভয়। প্রথম দিনেই সাপের সামনে দাঁড়ানোর প্রয়োজন নেই। শুরু হতে পারে সাপ নিয়ে কথা বলা দিয়ে। এরপর ছবি দেখা, ভিডিও দেখা, দূর থেকে সাপ দেখা—এভাবে ধাপে ধাপে এগোনো যায়।
মস্তিষ্ক বারবার যখন দেখে, ভয় পাওয়া বিষয়টির সামনে গিয়েও কোনও বিপদ ঘটছে না, তখন তার ভয়-প্রতিক্রিয়াও ধীরে ধীরে কমতে পারে। সাঁতার, গণপরিবহনে ওঠা কিংবা শ্রেণিকক্ষে সবার সামনে কথা বলার ভয়ও এভাবে ধীরে ধীরে সামলানো সম্ভব।
ভয় কাটানোর কোনও নিয়ম নেই যে এক লাফে তার ওপারে যেতে হবে। ছোট ছোট পদক্ষেপও এগিয়ে যাওয়ার পথ।
ভয়টাকে একটু হাস্যকর করে দেখুন
ভয়কে যত বড় করে দেখি, সেটি তত বড় হয়ে ওঠে। তাই কখনও কল্পনায় ভয়টাকেই ছোট করে ফেলার চেষ্টা করা যায়।
ভাবুন, ভয়ংকর জিনিসটির মাথায় একটা হাস্যকর টুপি, নাকে ভাঁড়ের মতো লাল গোল নাক কিংবা অদ্ভুত কোনও গলার স্বর। উদ্দেশ্য ভয়কে অস্বীকার করা নয়; বরং মনের পর্দায় তার ক্ষমতাটাকে একটু কমিয়ে দেওয়া।
হ্যারি পটার-এর গল্পে ‘বগার্ট’ নামের প্রাণীটি মানুষের সবচেয়ে বড় ভয়টির রূপ নেয়। কিন্তু জাদুর মাধ্যমে সেই ভয়ংকর রূপকেই হাস্যকর করে ফেলা হয়। বাস্তব জীবনেও কল্পনার সাহায্যে ভয়কে একটু ছোট করে দেখার চেষ্টা তার ওপর মানসিক নিয়ন্ত্রণ বাড়াতে পারে।
ভয়টা বাস্তব, নাকি মনের তৈরি?
কখনও ভয় লাগলে একটু থামুন। নিজেকেই জিজ্ঞেস করুন—‘আমার কি সত্যিই ভয় পাওয়া উচিত?’
প্রয়োজনে বিশ্বাসযোগ্য বন্ধু, পরিবারের সদস্য, পরামর্শদাতা বা চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলুন। ভয়টির বাস্তব কারণ থাকলে পরিস্থিতিকে নিরাপদ করার ব্যবস্থা করুন। যেমন, বাড়িতে চুরি হওয়ার আশঙ্কা থাকলে দরজা-জানালা ঠিকমতো বন্ধ করা।
আর যদি ভয়টির পেছনে বাস্তব বিপদ না থাকে, শুধু মনের আশঙ্কা থাকে, তখন যুক্তি দিয়ে নিজেকে বোঝানো সবসময় যথেষ্ট নাও হতে পারে। সে ক্ষেত্রে কল্পনার সাহায্যে ভয়কে নিরাপদ ও নিয়ন্ত্রণযোগ্য করে দেখার চেষ্টা করা যেতে পারে।
ভয় যদি জীবন থামিয়ে দেয়, সাহায্য নিন
কিছু ভয় স্বাভাবিক। কিন্তু ভয় যদি আপনার দিনের বড় একটা অংশ দখল করে নেয়, দৈনন্দিন কাজ ব্যাহত করে, বারবার উদ্বিগ্ন করে তোলে কিংবা এমন সব কাজ থেকে দূরে রাখে, যা আপনি করতে চান—তখন একা লড়াই করার প্রয়োজন নেই।
পরামর্শদাতা বা চিকিৎসকের সাহায্য নেওয়া যেতে পারে। পরিস্থিতি অনুযায়ী মনোচিকিৎসা, শিথিল হওয়ার কৌশল, জীবনযাপনে পরিবর্তন, সম্মোহনভিত্তিক পদ্ধতি কিংবা প্রয়োজন হলে ওষুধও বিবেচনা করা যেতে পারে।
ভয় তাই সবসময় মুছে ফেলতে হবে—এমন নয়। কিছু ভয় আমাদের বাঁচায়, কিছু ভয় আমাদের থামায়।
শেষ পর্যন্ত আসল প্রশ্নটা সম্ভবত ভয় পাওয়ার নয়। বরং কোন ভয়কে শুনব আর কোন ভয়কে ধীরে ধীরে পেছনে ফেলে এগিয়ে যাব—সেটি বুঝে নেওয়ার।