আপনি কি নিজের সাফল্য নিয়ে একটু বেশি গর্ব করেন? অন্য কেউ আপনার চেয়ে এগিয়ে গেলে ভেতরে ভেতরে অস্বস্তি হয়? রাগ উঠলে নিজেকে সামলাতে কষ্ট হয়? কাজ ফেলে রাখতেও কি আপনার জুড়ি নেই?
আবার হয়তো আপনি অন্যের প্রতি সহজেই সহানুভূতিশীল। পাওয়া ছোট ছোট ভালো জিনিসের জন্যও কৃতজ্ঞ থাকেন। ভুল হলে তা স্বীকার করতে পারেন। কঠিন পরিস্থিতিতেও ধৈর্য ধরার চেষ্টা করেন।
অর্থাৎ, আমাদের সবার মধ্যেই ভালো-মন্দের একটা অদ্ভুত মিশেল আছে।
কেউ পুরোপুরি সাধু নন, আবার কেউ সারাক্ষণ নিজের খারাপ দিকগুলো নিয়েও বসে থাকেন না। তবু বহু শতাব্দী ধরে মানুষ নিজেকে বোঝার জন্য ‘সাত মারাত্মক পাপ’ আর তার বিপরীতে ‘সাত গুণের’ ধারণা ব্যবহার করে আসছে।
এবার মনোবিজ্ঞানীরাও সেই পুরোনো ধারণাটিকে একটু অন্যভাবে দেখেছেন—মানুষের ব্যক্তিত্বে পাপ আর গুণের প্রবণতা কি মাপা যায়? আর নিজের সম্পর্কে সেটা জানলে কী লাভ?
সাত পাপ, সাত গুণ
নরওয়ের গবেষক অ্যাড্রিয়ান ফারম্যান ও তার সহকর্মীরা ২০২৬ সালে এ নিয়ে একটি নতুন প্রশ্নমালা তৈরি করেছেন। লক্ষ্য ছিল, মানুষের মধ্যে সাতটি ‘পাপ’ ও সাতটি ‘গুণের’ প্রবণতা কতটা আছে, তা নিজের মূল্যায়নের মাধ্যমে বোঝা।
সাতটি পাপ হলো—অহংকার, লোভ, কামনা, ঈর্ষা, অতিভোগ, ক্রোধ ও আলস্য।
আর বিপরীতে সাতটি গুণ—বিনয়, দয়া বা সহমর্মিতা, সংযম, কৃতজ্ঞতা, পরিমিতিবোধ, ধৈর্য ও অধ্যবসায়।
গবেষকেরা অংশগ্রহণকারীদের প্রতিটি বৈশিষ্ট্যের ক্ষেত্রে ০ থেকে ১০০-এর মধ্যে নিজেদের অবস্থান নির্ধারণ করতে বলেছেন।
শুনতে অনেকটা আত্মস্বীকারোক্তির মতো। কিন্তু আসলে উদ্দেশ্য ছিল নিজেকে দোষী সাব্যস্ত করা নয়; বরং নিজের আচরণ ও প্রবণতার দিকে একটু খেয়াল করা।
নিজের মধ্যে সবচেয়ে বেশি কোন ‘পাপ’ দেখলেন মানুষ?
গবেষণার প্রথম ধাপে অংশ নেন ৩০০ জন মানুষ। তাদের গড় বয়স ছিল ৪৮ বছর।
ফলটা বেশ মজার।
নিজেদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি যে ‘পাপের’ প্রবণতা তারা খুঁজে পেয়েছেন, সেটি হলো অহংকার।
আর সাতটি গুণের মধ্যে সবচেয়ে বেশি নম্বর পেয়েছে কৃতজ্ঞতা।
অর্থাৎ, মানুষ নিজের মধ্যে একই সঙ্গে এমন দুটি দিক দেখতে পাচ্ছে—একদিকে নিজের গুরুত্ব নিয়ে একটু বেশি সচেতন হওয়ার প্রবণতা, অন্যদিকে পাওয়া ভালো জিনিসের জন্য কৃতজ্ঞ থাকার ক্ষমতা।
তবে একটা কথা মনে রাখা দরকার। এগুলো মানুষের নিজের দেওয়া মূল্যায়ন। একজন মানুষ নিজেকে যেমন ভাবেন, বাস্তবে তিনি সবসময় তেমন আচরণ করবেন—এমন নিশ্চয়তা নেই।
তারপরও নিজের দিকে তাকানোর জন্য প্রশ্নগুলো বেশ আকর্ষণীয়।
রাগ, লোভ, ঈর্ষা—এসব কি আপনাকে ‘খারাপ’ মানুষ বানায়?
ধরুন, আপনি বুঝলেন—আপনার মধ্যে রাগের প্রবণতা একটু বেশি।
তার মানে কি আপনি খারাপ মানুষ?
তা নয়।
হয়তো আপনি দ্রুত রেগে যান, কিন্তু কিছুক্ষণ পর নিজের ভুল বুঝতে পারেন। কেউ কেউ আবার ঈর্ষা অনুভব করেন, কিন্তু সেই অনুভূতি অন্যকে ছোট করার বদলে নিজের জীবন নিয়ে আরও চেষ্টা করার তাগিদ তৈরি করে।
একই অনুভূতি দুই মানুষের ক্ষেত্রে একেবারে আলাদা আচরণ তৈরি করতে পারে।
মনোবিজ্ঞানও মানুষের এই অন্ধকার দিকগুলো নিয়ে অনেক দিন ধরে কাজ করছে। ‘ডার্ক ট্রায়াড’ নামে পরিচিত একটি ধারণায় আত্মমুগ্ধতা, অন্যকে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করার প্রবণতা এবং সহমর্মিতার ঘাটতির মতো বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলোচনা করা হয়। পরে এর সঙ্গে নিষ্ঠুরতাকেও যুক্ত করে ‘ডার্ক টেট্রাড’ ধারণা এসেছে।
তবে গবেষকেরাই সতর্ক করেছেন, মানুষের ব্যক্তিত্বকে এভাবে কয়েকটি বাক্সে ভরে ফেলা খুব সরলীকরণ হয়ে যায়। মানুষ এতটা সোজা-সাপ্টা নয়।
বয়স বাড়লে কি মানুষ একটু ‘ভালো’ হয়ে ওঠে?
গবেষণায় আরও একটি প্রবণতা দেখা গেছে।
বয়সে তুলনামূলক বড় এবং বেশি আশাবাদী মানুষ নিজেদের মধ্যে পাপের প্রবণতা কম, আর গুণের প্রবণতা বেশি বলে জানিয়েছেন।
অন্যদিকে দায়িত্বশীলতা, মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা ও সাহসের ক্ষেত্রে যারা নিজেদের কম নম্বর দিয়েছেন, তারা পাপের দিকটিতে তুলনামূলক বেশি নম্বর দিয়েছেন।
কৌতূহলী মানুষ আবার নিজেদের বেশি গুণসম্পন্ন বলে মনে করেছেন।
তবে এগুলো দেখে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই যে বয়স বাড়লেই মানুষ ভালো হয়ে যায়। এগুলো মূলত বিভিন্ন ব্যক্তিত্বের বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে মানুষের নিজের মূল্যায়নের সম্পর্ক দেখায়।
নিজের সম্পর্কে সত্যি বলতে পারি তো?
এখানেই গবেষণাটার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা।
নিজেকে ০ থেকে ১০০-এর মধ্যে নম্বর দেওয়া সহজ মনে হলেও কাজটা আসলে কঠিন। কারণ নিজের সম্পর্কে আমরা সবসময় নিরপেক্ষ নই।
নিজেকে খুব ভালো দেখাতে চাইতে পারি। আবার উল্টোভাবে নিজের ওপর অকারণে কঠোরও হতে পারি।
বিশেষ করে ‘আমি কতটা অহংকারী?’ বা ‘আমার মধ্যে কতটা নিষিদ্ধ যৌন আকাঙ্ক্ষা আছে?’—এমন প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে মানুষ সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করতে পারে।
তাই গবেষকেরাও বলেছেন, মানুষ নিজের সম্পর্কে যা বলে, তা তার বাস্তব আচরণের সঙ্গে সবসময় মিলে যাবে—এমন নয়।
তাহলে এই পরীক্ষা দিয়ে লাভ কী?
তিন মিনিটেরও কম সময়ে প্রশ্নমালাটি পূরণ করা যায়।
এটাকে কোনও চূড়ান্ত ব্যক্তিত্ব পরীক্ষা হিসেবে দেখার দরকার নেই। বরং নিজের আচরণ নিয়ে একটু থামার সুযোগ হিসেবে দেখা যায়।
নিজেকেই জিজ্ঞেস করতে পারেন—
আমি কি নিজের সাফল্য নিয়ে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি গর্ব করি?
অন্যের ভালো কিছু হলে সত্যিই খুশি হই, নাকি ভেতরে ভেতরে তুলনা শুরু করি?
রাগের সময় কি এমন কিছু বলে ফেলি, যা পরে আফসোস হয়?
কাজ ফেলে রাখাটা কি আমার নিয়মিত অভ্যাস?
আমি কি অন্যের ভালোবাসা, সাহায্য কিংবা ছোট ছোট উপকারের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি?
কেউ বিপদে পড়লে তার জায়গায় নিজেকে বসিয়ে ভাবতে পারি?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর হয়তো আপনার চরিত্রের পুরো ছবি দেবে না। কিন্তু নিজের এমন কিছু দিক সামনে আনতে পারে, যেগুলো নিয়ে আগে খুব একটা ভাবেননি।
নিজের অন্ধকারটুকু দেখাও দরকার
‘পাপ’ শব্দটা শুনলেই আমাদের মাথায় অপরাধ আর শাস্তির কথা আসে। কিন্তু মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে বিষয়টাকে একটু অন্যভাবে দেখা যায়।
আপনার মধ্যে অহংকার আছে—এটা বুঝতে পারা মানে আপনি খারাপ মানুষ, এমন নয়।
আপনি সহজে রেগে যান—এটা জানা মানে নিজেকে দোষী করা নয়।
বরং নিজের যে জায়গাগুলোতে একটু কাজ করা দরকার, সেগুলো দেখতে পাওয়া।
একইভাবে নিজের মধ্যে কৃতজ্ঞতা, ধৈর্য, বিনয় বা সহমর্মিতা আছে—এটাও জানা জরুরি। কারণ ভালো গুণও এমন কিছু নয়, যা একবার অর্জন করলেই সারাজীবন অটুট থাকে। সেগুলোকেও চর্চা করতে হয়।
শেষ পর্যন্ত মানুষের ভেতরে আলো যেমন থাকে, তেমনি কিছু অন্ধকারও থাকে।
তাই প্রশ্নটা হয়তো ‘আমি ভালো মানুষ, নাকি খারাপ?’—এটা নয়। প্রশ্নটা বরং, ‘আমার ভেতরে কোন দিকটা বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠছে?’ আর তার পরের প্রশ্ন—‘আমি কোন দিকটাকে আরও একটু বড় করতে চাই?’
নিজেকে বদলানোর শুরুটা হয়তো অন্যকে বিচার করা থেকে নয়, নিজের দিকে একটু সৎভাবে তাকানো থেকেই।
ভিড় বাড়লে কি বদলে যায় মানুষের আচরণ?
বিছানার নিচের সেই দানবটা কোথায় গেল?
‘ফুড ডিভোর্স’ কি সম্পর্ক বাঁচাতে পারে?